বাংলাদেশ ব্যাংকে ডিজিটাল ডাকাতি

আনিস আলমগীর১১:৪৭, মার্চ ১৫, ২০১৬

বাংলাদেশ ব্যাংকের এ ঘটনাটি নিয়ে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও তৎপর হয়েছে। এবং কেউ কেউ বলছে বাংলাদেশ ব্যাংক-এর একটা চক্র এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। নিউইয়র্ক রিজার্ভ ব্যাংকে বিভিন্নদেশের ২৫০ টি একাউন্ট থাকলেও বাংলাদেশের একাউন্টকে কেন হ্যাকাররা হ্যাক করলো। বাংলাদেশ ব্যাংক-এর সিস্টেমটা হ্যাক করা সহজ ছিলো বলে? না সিস্টেমটার পরিচালকদের কাউকেও হ্যাকাররা তাদের দলভুক্ত করতে পেরেছিলো বলে? রিজার্ভ ব্যাংকের কাছে ৩৫ টি আবেদন ছিলো তার মধ্যে ৫টি আবেদন নিস্পত্তি হয়েছিলো তাও ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারি ছুটির দিনে। ৩৫ টি নিস্পত্তি হলে ১০০ কোটি ডলারই চলে যেত। রিজার্ভ ব্যাংকের সন্দেহ এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের  নিস্পত্তি স্থগিত করার অনুরোধেই বিরাট দুর্যোগ থেকে বাংলাদেশ রক্ষা পেল।

বাংলাদেশ ব্যাংক-এর টোটাল ডিজিটাল ব্যবস্থাপনাটা যে দুর্বল ছিলো তা মনে হয় না। এ পর্যন্ত যে সব তথ্য পাওয়া গেছে তাতে বিশ্বাস করার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে যে বাংলাদেশ ব্যাংক-এর আন্তর্জাতিক লেনদেন এর ব্যবস্থায় সুইফট কোড ব্যবহার করেই রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্ককে অর্থ ট্রান্সফারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিলো, সুইফট কোড হচ্ছে এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে টাকা স্থানান্তরের সংকেতলিপি। এই সংকেত লিপিটা খুবই গোপনীয় ব্যাপার এবং এটা সংরক্ষণ করে নিশ্চই কোনও দায়িত্বশীল কর্মকর্তার দল। রিজার্ভ ব্যাংক বলেছে তার একাউন্ট হ্যাক হয়নি। রিজার্ভ ব্যাংক তার কোনও ত্রুটি বিচ্যুতি মানতে নারাজ। আর্ন্তজাতিক লেনদেন এর জন্য ব্যবহৃত ‘সুইফট’ এখনও কোথাও হ্যাক হয়নি। এই পদ্ধতি নানা ধাপে নিরাপত্তার জালে আবদ্ধ। ‘সুইফট’  থেকে যে বার্তা যায় সেটাও অনেক নিরাপদ। বার্তাটা যায় গার্বেজ আকারে। বার্তাটা যেখান থেকে যায় আর যেখানে যাচ্ছে উভয়স্থানে একই সফটওয়ার থাকতে হবে। না হয় বার্তাটার ভাষা উদ্ধার করা সম্ভব হবে না।

তবে পত্রিকার খবরে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে যে, তথ্যপ্রযুক্তির দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘সুইফট’ সিস্টেমে ঢুকে পড়েছিল তৃতীয় পক্ষ। সেই সঙ্গে ছিল কিছু কর্মকর্তার দায়িত্বের ঘাটতি। রিজার্ভের অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত সুইফট-এর বার্তা আদান-প্রদানে যেসব কম্পিউটার নির্দিষ্ট করা, তাতে সুইফট নেটওয়ার্কটি ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্কটিও সংযুক্ত ছিল। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, প্রথমে ইন্টারনেটের কোনও একটি পথ দিয়ে তৃতীয় পক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব নেটওয়ার্ক-ব্যবস্থার প্রতিরোধকগুলো ভেঙে সেখানে ঢুকে যায়। আর সেই নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে সুইফটে ঢুকে পড়ে। তবে শুরুতে কোন পথে তৃতীয় পক্ষটি বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যপ্রযুক্তি সিস্টেমে ঢুকে পড়েছে, সেটি এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এ জন্য সাইবার বিশেষজ্ঞকে দিয়ে ‘ফরেনসিক’ তদন্ত করানো হচ্ছে। এ তদন্ত শেষ হতে আরও দুই সপ্তাহ লেগে যাবে। সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয়, এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনও তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি।

দীর্ঘ ৩৫ দিন নিরবতার পর বাংলাদেশ ব্যাংক গত শুক্রবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, সাইবার আক্রমণে পাঁচটি পরিশোধ নির্দেশের বিপরীতে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কায় চলে যায় হ্যাকাররা। তার মধ্যে শ্রীলঙ্কা থেকে ২ কোটি ডলার উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। ফিলিপাইনে যাওয়া ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার বা প্রায় ৬৫০ কোটি টাকা উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকের ডিজিটাল ডাকাতির ঘটনার পাশাপাশি ঘটনাকে ধামাচাপা দিয়ে রাখার বিষয়টিও এখন বড় ইস্যু।

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, অর্থ চুরির বিষয়টি তাকে সহ অন্যদের না জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ধৃষ্টতা দেখিয়েছেন। তিনি এই নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন, এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে সেটা সাংবাদিকদের জানাবেন। শেষ পর্যন্ত যা আশঙ্কা করা হয়েছে তাই হলো। দায় মাথায় নিয়ে সরে গেলেন গভর্নর আতিউর রহমান। প্রধানমন্ত্রীর কাছে তিনি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন ১৫ মার্চ সকালে। আর আগের রাতে বাসায় গিয়ে দেখা করেছেন অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে।

হ্যাকিং করে রাষ্ট্রের টাকা নিয়ে গেছে, যারা টাকা পাহারা দিচ্ছেন তারা চুপ থাকবে। এটা প্রধানমন্ত্রী জানেন, অর্থমন্ত্রী জানেন না, কেমন কথা! টাকাতো জনগণের। এই টাকা ফেরত আনা হবে কীভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক সেটা জানায়নি। পুরো বিষয়টা নিয়ে সবাইকে কনফিউজড করা, জাতিকে উদ্বিগ্ন করার দায়িত্ব এর প্রধান প্রধান কর্তারা অস্বীকার করতে পারবে না। এটা তাদের ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যদি এই অবস্থা হয়—সিডিউল ব্যাংকের নিরাপত্তা কিভাবে নিশ্চিত করা যাবে!

৮০০ কোটি টাকার মাঝে বিপর্যয়টা সীমাবদ্ধ রইলো। এখানে আত্ম-তৃপ্তির কোনও কারণ নেই। আমরা জানি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে গর্ভনরের সম্পর্ক ভালো নেই। আবার দীর্ঘদিন থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে একটা শক্তিশালী চক্র গড়ে ওঠার কথাও শোনা যায় যারা গভর্নরকে পর্যন্ত তোয়াক্কা করে না।পরিস্থিতি যদি এমন হয়, ধীরে ধীরে এ চক্রটা বাংলাদেশের অর্থনিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাটাকে বিপর্যস্ত করে ফেলতে পারে যদি সরকার কঠিন ব্যবস্থা অবলম্বন না করেন। সরকারি ব্যাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও ধ্বংস হচ্ছে অভ্যন্তরীণ শক্তিশালী চক্রের কারণে। এমডি- চেয়ারম্যান সবাই এ চক্রটার সক্রিয় সদস্য। অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে শৃঙ্খলা না থাকলে জাতি কখনও বড় হতে পারবে না। প্রধানমন্ত্রীর প্রাণান্ত প্রয়াস ব্যর্থ হবে যদি প্রশাসনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা না যায়।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

anisalamgir@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ