এক রাখাল বালকের কান্না

Send
হারুন উর রশীদ
প্রকাশিত : ১৭:৪৪, মার্চ ১৫, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৩৮, মার্চ ১৫, ২০১৬

৫ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের টাকা  নিয়ে নেন হ্যাকাররা। টাকা ছাড় হয় ফিলিপাইনের একটি ব্যাংক থেকে। আর হ্যাকাররা বাংলাদেশ ব্যাংকের সুইফট কোড ব্যবহার করে ৪ ফেব্রুয়ারি টাকা স্থানান্তরের এডভাইজ পাঠান। এ পর্যন্ত তদন্তে জানা গেছে, ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে ফিলিপাইনের ব্যাংকে টাকা স্থানান্তরের সঙ্গে-সঙ্গেই বাংলাদেশ ব্যাংক স্বয়ংক্রিয় সংকেত পায়। ২৪ ঘণ্টা দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের কর্মকর্তারাও সেই সংকেত পান। এরপরও টাকা আটকানোর কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক যখন সন্দেহ করে, তখন তারা  বাকি পেমেন্ট আটকে দিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে জানায়।  তখনও কি ড. আতিউর রহমানেরর ঘুম ভাঙেনি? না তিনি জেগেই ঘুমাচ্ছিলেন? আসলেই তিনি জেগে ঘুমাচ্ছিলেন। কারণ এরপর তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের একটি দলকে ফিলিপাইন পাঠান। ভেতরে-ভেতরে বিষয়টি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ ভাবে একমাস কাটিয়ে দেন। যদি ফিলিপাইনের সংবাদমাধ্যম ঘটনাটি প্রকাশ না করত, তাহলে তো বাংলাদেশ সরকারও বিষয়টি জানতে পারত না। অর্থমন্ত্রীও অন্ধকারে থাকতেন।

একমাস অন্ধকারে থাকার পর অর্থমন্ত্রী যখন জানলেন, তখন না বুঝেই ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিলেন, বললেন,  ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনও দোষ নাই।’ অবশ্য পরে বিস্তারিত জেনে বাংলাদেশ ব্যাংকের  ‘ঔদ্ধত্যে’ ক্ষুব্ধ হলেন।

ড. আতিউর রহমান কার স্বার্থে, কী কারণে রিজার্ভ ডাকাতির কথা গোপন রেখেছিলেন, তা এখনও তদন্তের বিষয়। সংবাদমাধ্যমে রিজার্ভ ডাকাতির খবর প্রকাশিত হওয়ার পরও তিনি নিশ্চিন্তে হাসিমুখে কেন ভারত গেলেন, তা ভাবার বিষয়। আর ভারত থেকে ফিরে পদত্যাগের আগে সংবাদ মাধ্যমের সামনে কেন কাঁদলেন, তা বোঝার বিষয়।

তবে ঘটনা প্রবাহে এটা নিশ্চিত হয় যে, তিনি রিজার্ভ চুরির পর যা-যা করেছেন, তা পরিকল্পনা মাফিকই করেছেন। তবে পরিকল্পনা কাজে আসেনি। তাকে বিদায় নিতে হয়েছে। আর এই প্রথম মঙ্গলবার তিনি বাধ্য হয়ে পদত্যাগের পর সংবাদ সম্মেলন ডেকে রিজার্ভ ডাকাতির  ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করলেন। আর সংবাদ সম্মেলনেও তিনি অনেক তথ্য গোপন করেছেন। নিজের সাফল্যের সাফাই গেয়েছেন। বলেছেন, ‘আমি পরাজিত সৈনিক নই। আমি একটি খোলা বই। আমার কাছে গোপন কিছু নেই।’  এত বড় রিজার্ভ কেলেঙ্কারি গোপন করার পরও ড. আতিউর রহমান যদি বলেন, ‘আমার কাছে গোপন কিছু নেই’, তাহলে বলতে হয়, ‘বৃক্ষ তোমার নাম কী, ফলে পরিচয়।’

কিন্তু এখন ব্যখ্যা দিয়ে কী হবে? যখন বলার, তখন তিনি বলেননি। যখন প্রকাশ করার দরকার ছিল, তখন তিনি তা গোপন করেছেন। তিনি সরকারের সঙ্গে, দেশের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গের কাজ করেছেন। তিনি তার পদের যোগ্যতা হারিয়ে পদে টিকে থাকার নানা ফন্দি করেছেন। যুক্তি হারিয়ে কেঁদে পার পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। পদত্যাগ তো সাধারণ ঘটনা, দেশের মানুষের টাকা চোরের হাতে দেওয়ার, চুরি করার বিচার তো এখনও বাকি। আমরা জানতে চাই, দেখতে চাই, বাংলাদেশ ব্যাংক-এর চোরদের। কারণ, এরইমধ্যে এই তথ্য নিশ্চিত যে, হ্যাকারদের সহযোগী হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা কাজ করেছেন। আর সেই চোরদের যিনি রাখাল বালক, তিনি যতই কাঁদুন, তাকে তো আর পদত্যাগেই মাফ করে দেওয়া যায় না!

ক্ষমা করবেন আতিউর স্যার। আপনার কাছে অনেক গিয়েছি। সাংবাদিক হিসেবে যত, তার চেয়ে বেশি আপনার ছাত্র হিসেবে। আপনার রবীন্দ্রভাবনা। আপনার কৃষিভাবনা। আপনার জল-জলার কথা আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুনেছি। আপনি আমাকে তুই বলে সম্বোধন করেন। আপনার প্রতিষ্ঠান ‘সমুন্বয়’-এর অফিসে বসেই আমি জাতীয় বাজেট বুঝেছি। আমাকে আলোড়িত করেছে আপনার চিন্তা। কিন্তু আপনার কান্না আমাকে আলোড়িত করেনি। আমার মনে হয়েছে, এক বেচারার কান্না।

কিন্তু আমি আলোড়িত হতাম যদি আপনি রিজার্ভ চুরির পরই কাঁদতেন, সরকারকে জানাতেন, জাতিকে জানাতেন। বলতেন জনগণের টাকা আমি রক্ষা করতে পারিনি। আমাকে ক্ষমা করো। তাহলে আমি আবারও আপনার প্রতি শ্রদ্ধায় আনত হতাম।

স্যার, আপনি মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আপনাকে সাহসী বলেছেন, আপনার পদত্যাগকে সাহসী সিদ্ধান্ত বলেছেনে।’ প্রধানমন্ত্রী উদারতা দেখিয়েছেন। রাষ্ট্রনায়কের মতো কথা বলেছেন। এত কিছুর পরও আপনাকে সম্মান দিয়েছেন। এর জবাবে আপনার কী করা উচিত? দয়া করে ডাকাতদের ধরিয়ে দিয়ে আপনিও প্রধানমন্ত্রীকে সম্মান জানান। দেশের মানুষকে সম্মান জানান।

লেখক: সাংবাদিক

ইমেইল: swapansg@yahoo.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ