behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

খোলা চিঠি সুন্দরের কাছে

আহসান কবির১৬:৫৯, মার্চ ১৮, ২০১৬

চার. ফিলিপাইনের রিজাল ব্যাংকে ৫টি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছিল ২০১৫ সালের ১৫ মে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ এর টাকা যেটা কিনা ছিল ফেডারেল ব্যাংক অব নিউইয়র্কে, সেই লোপাটের টাকা দিয়ে এই অ্যাকাউন্টগুলোয় প্রথম টাকা লেনদেন হয় ২০১৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। তাহলে কি অন্তত এক বছর ধরে এই টাকা লোপাটের পরিকল্পনা করা হয়েছিল? ফিলিপাইনের ডেইলি ইনকোয়ার পত্রিকা প্রথম রিপোর্ট না করলে বাংলাদেশ তথা পৃথিবীর মানুষ হয়তো এই ঘটনা সহজে জানতে পারত না। ডলারগুলো জমা হয় ফিলিপাইনের মাকাতি শহরের রিজাল ব্যাংকের জুপিটার স্ট্রিট শাখায়। রিজাল ব্যাংকের ওই শাখার ম্যানেজার মায়া সান্তোসকে দেওয়ার জন্যও নাকি প্রচুর ডলার নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। খুব দ্রুত এই ডলার ক্যাসিনোতে চলে যায় এবং সেখান থেকে চলে যায় হংকংয়ে। আপনি কি জানতেন না এসব? যদি নাই জানেন তাহলে ১৬ ফেব্রুয়ারি কেন পিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (ব্যাংকো সেন্ট্রাল)-এর গভর্নর আমানডো টেটাংকোর কাছে কেন চিঠি লিখে সহায়তা চেয়েছিলেন?

পাঁচ. বাংলাদেশ ব্যাংকের অফিস অব দ্য ডিলিং রুমেই এই ঘটনা ঘটেছিল। ৫ ফেব্রুয়ারির পর ৬ বা ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬-তে যখন দেখা গেল এই রুমের ১১টা কম্পিউটার ও প্রিন্টার নষ্ট, ভিডিও ফুটেজও নষ্ট করে ফেলা হয়েছে তখন আপনি কি এসব জানতে পেরেছিলেন? জানলে ব্যবস্থা নেননি কেন? কোনও কিছু আড়াল করতেই কি সব কিছু গোপন রাখা?

পদত্যাগ করার সময় যে বক্তৃতা আপনি দিয়েছেন, তাতে আপনি বলেছেন আপনি পুলিশ ও র‌্যাবকে জানিয়েছেন, প্রধান মন্ত্রীকেও চিঠি লিখে জানিয়েছেন। ফলাফল কি এই যে, কেউ মারা গেলে  চল্লিশ দিন পরে যেমন চেহলাম হয়, তেমনি বাংলাদেশ ব্যাংকের আটশ কোটি টাকা লোপাটের চল্লিশ দিন পরে মামলা করা হয়েছে মতিঝিল থানায়। আসামি অজ্ঞাত!

ছয়. একটি প্রতিবেদনে মিডলসেক্স ইউনিভার্সিটির শিক্ষক সায়েদুর রহমানকে উদ্ধৃত করে বিবিসি বলেছে বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কম্পিউটার সিস্টেমে ম্যালওয়ার বসিয়ে সম্ভবত এমন ঘটনা ঘটানো হয়েছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনেও এমন বলা হয়েছে। রয়টার্স ও বিবিসির মূল্যায়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটার সিস্টেমের কেউ কেউ, পরিচালনা পর্ষদ কিংবা তার চেয়েও ক্ষমতাধর কারও সাহায্য ছাড়া এই ঘটনা ঘটানো সম্ভব ছিল না।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রেই জানা গিয়েছিল, বেশ কয়েকজন নজরদারিতে আছেন। যাদের সন্দেহ করা হচ্ছে, তাদের মধ্যে নাকি যুগ্ম-পরিচালক জোবায়ের বিন হুদা ও মিজানুর রহমানও রয়েছেন। গভর্নর সাহেবের পদত্যাগের পর জানা গেল যে দুজনকে অপসারণ করা হয়েছে তারা এই দুজন নন। আসলে কারা  আছেন, এই চুরি বা হ্যাকিংয়ের সঙ্গে? শ্রদ্ধেয় ড. আতিউর রহমান, আপনি নিজে কি তাদের শনাক্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নিতে পারতেন না? আপনার নীরব থাকার মানে কি এই যে, যারা এসব করেছে তাদের সেইফ জোনে চলে যেতে সাহায্য করা হয়েছে?

সাত. শ্রদ্ধেয় ড. আতিউর রহমান আপনি এসেছিলেন ডিজিটাল সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য। সারা পৃথিবীতে টাকা তোলার জন্য ম্যাগনেটিক পদ্ধতি ক্রমশ বাদ দেওয়া হচ্ছে। টাকা তোলার আধুনিক পদ্ধতি এখন চিপস পদ্ধতি। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাস উদ্দিন আহমেদ প্রশ্ন তুলেছেন চিপস পদ্ধতি না এনে সারাদেশে কেন এটিএম বুথের নামে ম্যাগনেটিক পদ্ধতিটাকেই ছড়িয়ে দেওয়া হলো? কার স্বার্থে এটা করা হয়েছিল? এটিএম বুথ থেকে টাকা লোপাটের ঘটনাও ঘটেছে শ্রদ্ধেয় ড. আতিউর রহমান, আপনার আমলে!

আট. আপনি আপনার বক্তৃতায় জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিকভাবে তদন্ত করার জন্য ফায়ার আইকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে! রাকেশ আস্তানার সঙ্গেও নাকি কথা হয়েছে। কে এই রাকেশ আস্তানা? পরিচয়ে জানা যাচ্ছে তিনি নাকি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক পরামর্শক। কতটা যাচাই করা হয়েছে তাকে? ওয়ার্ল্ড ইনফরমেটিক্সের প্রধান নির্বাহী এই ভদ্রলোক এক সময়ে বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ক সাবেক উপ-প্রধান ছিলেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং এফবিআই ৮০৮ কোটি টাকা লোপাটের ব্যাপারটা নিয়ে তদন্তে বাংলাদেশকে সাহায্য করতে চেয়েছিল। শ্রদ্ধেয় ড. আতিউর রহমান বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাচ্ছি, এফবিআইকে মানা করে ফায়ার আই বা রাকেশ আস্তানাকে জড়ানো হয়েছে কার স্বার্থে? কোনও কিছু লুকোনোর জন্য? ফায়ার আই এর তদন্তের ব্যাপারে কারও কি কোনও ধারণা আছে? নাকি যারা নিয়োগ দেন, ফায়ার আই তাদের স্বার্থেই কাজ করে দেয়? আপনার আবেগী বক্তৃতা, বিদায় বেলার কান্নার চেয়ে দেশের স্বার্থে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা খুব জরুরি!

না কি বর্তমানের আওয়ামী লীগের নেতা নূহ-উল-আলম লেনিন তার ফেসবুকে যা লিখেছেন, সেটারও সত্যতা আছে? জনাব লেলিন লিখেছেন, আতিউর রহমান বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বার্থের চেয়ে নিজের স্বার্থ নিয়ে বেশি ব্যস্ত ছিলেন। দেশ বিদেশের পুরস্কার ও পদক পাওয়ার জন্য তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে প্রভাব খাটিয়েছেন! বেসরকারি ব্যাংকের অর্থেরও অপচয় করেছেন। তদন্ত করে এর সত্যতা পাওয়া গেলে, তাকে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে!

শ্রদ্ধেয় আতিউর রহমান, আমি এখনও মনে করি, আপনি সুন্দরের পক্ষেই থাকবেন। আশা করি দেশবাসী একদিন এই সব প্রশ্নের জবাব পাবে। আপনি আপনার সর্বোচ্চ দিয়ে সহায়তা করবেন। জানি না সাগর-রুনীর হত্যাকারীদের মতো বাংলাদেশ ব্যাংকের এই টাকা লোপাটের ঘটনার হোতারাও আজীবন অধরাই থেকে যাবেন কিনা!

আপনার সর্বাঙ্গীন মঙ্গল কামনায়

আহসান কবির

 লেখক: রম্যলেখক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ