behind the news
IPDC  ad on bangla Tribune
Vision  ad on bangla Tribune

নারী দিবসের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এটা কী বললেন!

চিররঞ্জন সরকার১১:৩৯, মার্চ ২০, ২০১৬

চিররঞ্জন সরকারআন্তর্জাতিক নারী দিবসে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে মেয়েদের ভূমিকা নিয়ে অনেক কিছু বলেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একটি পশ্চৎপদ সমাজের একজন নারী প্রধানমন্ত্রী যখন নারীদের নিয়ে কথা বলেন, তখন তা আলাদা গুরুত্ব পায়। আন্তর্জাতিক নারীদিবসে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক কনফারেন্স সেন্টারে নারীমুক্তি ও লিঙ্গসাম্য-বিষয়ক সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি ও পরিকল্পনার কথা বলেছেন। এই অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা স্পষ্ট জানিয়েছেন, জনসংখ্যার এক বৃহদাংশকে বঞ্চিত রেখে সামগ্রিক উন্নয়ন অসম্ভব। বলেছেন, নারী কর্তৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকার ইসলাম স্বীকৃত। তিনি ধর্মকে নারীপুরুষ সমতা প্রতিষ্ঠার বিপরীতে দাঁড় করানোর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেও বলেছেন। নারীর জন্য আরও সুযোগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দেশের প্রশাসন থেকে বিচারব্যবস্থায়, শিক্ষা থেকে প্রতিরক্ষায় মেয়েদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, ‘মেয়েদের হাতে কাজ দিলে তারা তা অত্যন্ত সুনিপুণ ভাবে করেন’ কারণ, ‘মেয়েরা সব পারেন। কথায় আছে, যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে।’ এখানে এসেই প্রধানমন্ত্রী গোল বাধালেন!
‘যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে’-এই বাক্যটি মোটেও নারীর পক্ষে যায় না। এটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চোখে নারী নির্মাণ। আমাদের প্রচলিত ধ্যানধারণা অনুযায়ী নারীর একটি বিশেষ পরিচয় ‘গৃহিণী’। প্রত্যেক বিবাহিত নারী, যদি সে চাকরিজীবী (বা কর্মজীবী) না হয়, তাহলে তার একমাত্র পরিচয়, গৃহিণী, ইংরেজিতে যাদের ‘হাউসওয়াইফ’ বলা হয়। তার অন্য কাজ থাকলেও তাকে গৃহের কাজ কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার আগে এবং কাজ থেকে ফিরে এসে করতে হয়। শুধু ঘরের রান্নাবান্না করা নয়, সন্তান ধারণ ও লালন-পালনের কাজ থেকে সবকিছু তাকে করতে হয়। নারী যখন বেশি সংখ্যায় ঘরের বাইরের কাজে এলো, তখন থেকেই দাবি উঠেছে মাতৃত্বকালীন ছুটি, শিশুদের দিবা-যত্ন কেন্দ্রের। পুরুষ নিজেও সংসার করে, সে বিবাহিত, তারও সন্তান আছে, কিন্তু কোনও কর্মজীবী পুরুষের ক্ষেত্রে এ দাবি কখনও ওঠেনি। কারণ তাকে সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব সেভাবে নিতে হয় না। শুধু টাকাটা দিলেই হয়। স্ত্রী ও মা হিসেবে এ কাজ নারী নিজেই করে। নারী কাজে নেমে তার অর্থনৈতিক স্বাধীনতা যেমন এসেছে, তেমনি তাকে অনেক অর্থনৈতিক দায়িত্বের বোঝা কাঁধে নিতে হয়েছে। আগে পারিবারিক কাজে পুরুষের নির্দিষ্ট ভূমিকা, যেমন বাজার করা, ছেলেমেয়েদের স্কুলে নেওয়া, বিদ্যুৎ ও পানির বিল দেওয়া ইত্যাদি ছিল। এখন এসব কাজ বেশিরভাগ নারীকেই করতে হয়।
‘যে রাধে সে চুলও বাধে’-এই আপ্তবাক্যটি আউড়ে নারীর ওপর দুইগুণ তিনগুণ বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়। নারীকে তা মানতে মোটিভেশনও দেওয়া হয়। এ যেন অর্থনৈতিক স্বাধীকারের শাস্তি! এতে নারীর ওপর বাড়তি বা ডাবল কাজের বোঝা এসে পড়ে। নারীবাদী ভাষায় ডাবল বার্ডেন। নারীর গৃহস্থালি কাজের অর্থনৈতিক মূল্যায়নের দাবি উঠেছে এবং ডব্লিউবিবি ট্রাস্টের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, নারী দিনে কমপক্ষে ১৬ ঘণ্টা সময় ঘরের কাজে ব্যয় করে, জাতীয় অর্থনীতিতে যার কোনও আর্থিক মূল্য ধরা হয় না। বাংলাদেশ শ্রমশক্তির জরিপে দেখানো হয়েছে, ১ কোটি ৭২ লাখ নারী অর্থনৈতিক কাজে জড়িত আর ১ কোটি ৬২ লাখ কর্মজীবী নারী রয়েছে। কিন্তু বাকি ৩ কোটি ৫০ লাখ নারী, যাদের বয়স ১৫ থেকে ৬৪ বছর এবং যারা সংসারের কাজে জড়িত, তাদের কোনও উল্লেখ নেই। এর অর্থ হচ্ছে, তারা ঘরের কাজে যে শ্রম দিচ্ছে তার কোনও আর্থিক মূল্যায়ন হচ্ছে না। অন্যদিকে শ্রমজীবী নারী হিসেবে যারা গার্হস্থ্য  শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন, তাদের অবদানও ধরা হয় না, কারণ তারা ‘ঘরের কাজ’ করছেন। কাজেই প্রধানমন্ত্রী যখন ‘যে রাঁধে সে চুলও বাঁধে’- এই আপ্তবাক্যটি বলেন তখন নারীর ওপর অগোচরেই বাড়তি দায়িত্বের বোঝা বহনের দায়টি চাপিয়ে দেন।
জাতীয় অর্থনীতিতে নারীর কাজের মূল্যায়ন হোক বা না হোক, সেটা সরকারকেই হিসাব কষতে হবে। অর্থনৈতিক ভূমিকার ইতিবাচক ও নেতিবাচক অনেক প্রভাব আছে। নারীর হাতে অর্থ এসেছে, কিন্তু সেটা ব্যবহার করার সামাজিক স্বীকৃতি এখনও মেলেনি। নারী এখনও সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাই একপর্যায়ে এসে তাকে থেমে যেতে হয়। নারী ব্যবসা করতে পারে, ব্যবসার জন্য ঋণ নেওয়ারও পথ করে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যখনই সম্পদ বন্ধক রাখতে হয়, তখন সম্পত্তিতে তার অধিকার কতখানি আছে, তা পরিষ্কার হয়ে যায়। তাই তাকে এসএমই বা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার আওতায় স্বল্প সুদের ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়। বৃহৎ শিল্পের জন্য আবেদন করতে গেলে তাকে সেই সম্পদ দেখাতে হবে, যা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। নারী উদ্যোক্তাদের ঋণের পরিমাণ ৫০ হাজার থেকে ৫০ লাখ টাকা দেওয়ার নিয়ম আছে। কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার মতো আস্থা এখনও ব্যাংকগুলো পায়নি। কারণ নারীর কোনও সম্পদ নেই, যা দিয়ে তাকে বেঁধে ফেলা যায়। কাজেই উদ্যোক্তা হিসেবে নারী লাখোপতি হতে পারবে, কোটিপতি হতে পারবে না। এই সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায়, সেটা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে দিকনির্দশনা থাকা উচিত ছিল। থাকা উচিত ছিল পুরুষতন্ত্রকে পুরোপুরি মোকাবেলা করার কৌশল। কারণ নারী এখন পুরুষতন্ত্র ও পুঁজিতন্ত্রের যৌথ শিকার।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

IPDC  ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ