behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

নারী দিবসের বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এটা কী বললেন!

চিররঞ্জন সরকার১১:৩৯, মার্চ ২০, ২০১৬

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, ‘মেয়েরা যে দুর্নীতিতে কম জড়ান তা মেনে নেওয়াই ভালো। মেয়েদের চেয়ে দুর্নীতিতে ছেলেরা অনেক বেশি জড়ায়।’ প্রধানমন্ত্রীর এই ভাবনা ও পরিকল্পনা অভিনন্দনযোগ্য নিঃসন্দেহে। কিন্তু লক্ষণীয়, শেখ হাসিনা তাঁর নারীমুক্তির সামগ্রিক ভাষ্যটি খাড়া করেছেন পুরুষতান্ত্রিকতারই ভাষায়। সম্পত্তির অধিকারকে স্বীকৃতি দিতে গিয়ে ইসলামের দোহাই দিতে হয়েছে তাঁকে। ফুটে উঠেছে ‘ফেমিনাইন’ বা নারীসুলভ মনোভাব। নারীরা নারী হওয়ার কারণেই যত্নশীল, নিপুণ। তাই তারা দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কর্ম সম্পাদন করেন, যেমনটা করেন গৃহে, তেমন ভাবেই কর্মক্ষেত্রে। ‘ফেমিনাইন’কে স্বীকৃতি দিয়ে তিনি এটিকে রাষ্ট্রের কাজে ব্যবহারের কথা বলেছেন। এত দিন এই ‘নারীসুলভ গুণগুলো’ রাষ্ট্রেরই ক্ষুদ্রতম একক ‘পরিবার’-এর কল্যাণে লাগছিল, এ বার বৃহত্তর কর্মযজ্ঞে তার ডাক এলো, যদিও ক্ষুদ্র ঘেরাটোপ থেকেও মুক্তি মিলল না! ‘নারীসুলভ’ মনোভাবের কারণে একটি মহৎ বক্তব্য শেষ পর্যন্ত উপযুক্ত মর্যাদা হারালো!

দুর্নীতির প্রসঙ্গেও হাসিনার বক্তব্য একরৈখিক, যদিও আপাত ভাবে পরিসংখ্যান তার বক্তব্যের স্বপক্ষেই যুক্তি দেবে। দুর্নীতিপরায়ণতা বা অপরাধ প্রবণতার খতিয়ানে পুরুষ নারীর চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারে। কিন্তু এই প্রবণতা পুরুষের ক্ষেত্রে ও এই প্রবণতার অভাব নারীর ক্ষেত্রে কতটা স্বতস্ফূর্ত তা তর্কসাপেক্ষ। জেন্ডারচর্চা আমাদের বলে ‘পুরুষসুলভ’ আর ‘নারীসুলভ’ আচরণের তালিম আমাদের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে আ-শৈশব আ-কৈশোর এমন ভাবে চলে যে মেয়েরা ‘ভালো মেয়ে’ হতে ভারি তৎপর থাকে। আর ভালোত্বের অন্যতম মাপকাঠি গৃহমুখিতা, ক্যারিয়ার-উদাসীনতা। ফলে দুর্নীতি আর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সুযোগও যে মেয়েদের কম ঘটে, আর প্রয়োজনও পড়ে কম, তা বলাই বাহুল্য। বিভিন্ন গবেষণায় জেন্ডার ও ক্রাইমের সম্পর্ক খতিয়ে তাই দেখা গেছে, নারী অপরাধীরা সংখ্যায় সত্যি কম, একমাত্র প্রস্টিটিউশনেই (যা পৃথিবীর অনেক দেশেই অপরাধ) তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি খানিক বেশি। কিন্তু এ সমীকরণ স্বভাবজাত বা জিনগত নয়, তাই তার ব্যতিক্রমও থাকবে, আছে, এবং ভারি মারাত্মক সে সব ব্যতিক্রম। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধাপে পর্যায়ক্রমে প্রধানমন্ত্রীর পদটি দখলে রেখেছেন। বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা উভয়েই রাজনীতির ঘুঁটি সাজিয়েছেন একে অন্যের দুর্নীতিকে ইস্যু করে। আবার ২০০৭-’০৮-এর সেনা নিয়ন্ত্রিত শাসনকালে উভয়েই কিন্তু ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ দ্বারা অভিযুক্ত হয়েছেন, গ্রেফতার হয়েছেন দুর্নীতিরই অভিযোগে। ‘লৌহ মানবী’ হিসেবে খ্যাত সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার সৌদি আরবের সঙ্গে গোপন অর্থ দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েছিলেন, অভিযোগ আছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধেও ছিল একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ— সত্য-মিথ্যা যাই হোক না কেন। আবার ২০১০ সালে ভারতীয় কূটনীতিক মাধুরি গুপ্তের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগগুলোও আমলে নেওয়া যেতে পারে। ৫৩ বছরের মাধুরি ভারতীয় ফরেন সার্ভিসেস-এর প্রতিনিধি হিসেবে ইসলামাবাদ হাইকমিশনে কর্মরত ছিলেন। অভিযোগ ছিল প্রতিরক্ষার গোপন তথ্যাবলী বেচে দেওয়ার।

উল্লিখিত সব ক’টি ক্ষেত্রেই নারীদের অপরাধ-প্রবণতার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা, প্রতিপত্তি বা সম্পদের লালসা কাজ করেছে, ঠিক যেমন করে পুরুষ-অপরাধীর ক্ষেত্রে। কিন্তু সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি, বলা বাহুল্য, দু’জনের ক্ষেত্রে ভিন্ন। পুরুষটি শুধু অপরাধী, নারীটি ‘মেয়ে হয়েও’ অপরাধী। মেয়েটি দু’টি মাপকাঠিতে ব্যর্থ। সামাজিক নীতির মাপকাঠিতে আর নারীত্বের মাপকাঠিতেও।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ