behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

পানি রক্ষায় সর্বাত্মক প্রচেষ্টা জরুরি

আমিনুল ইসলাম সুজন২৩:৫৯, মার্চ ২১, ২০১৬

আমিনুল ইসলাম সুজন২২ মার্চ, বিশ্ব পানি দিবস। প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে দিবসটি উদযাপিত হয়ে আসছে। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রাজধানী রিও-ডি-জেনেরিওতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের পরিবেশ ও উন্নয়ন বিষয়ক সম্মেলনে (ইউএনসিইডি) ‘এজেন্ডা ২১’ শীর্ষক ঘোষণায় ‘বিশ্ব পানি দিবসে’র প্রস্তাব করা হয়। একই বছরের ডিসেম্বর মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ সভায় পানি দিবসের প্রস্তাব গৃহিত হয় এবং ১৯৯৩ সাল থেকে ২২ মার্চ সারা পৃথিবীতে পানি দিবস উদযাপন শুরু হয়। উল্লেখ্য, ‘এজেন্ডা ২১’ অর্থাৎ একবিংশ শতককে বোঝানো হয়েছে এবং এর ১৮ নং অধ্যায়ে বিশুদ্ধ পানি সম্পদকে প্রস্তাবনা অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। ২০০৩ সালে জাতিসংঘ পানির গুরুত্ব বিবেচনা করে স্বতন্ত্র শাখা গঠন করেছে, যা ‘ইউএন ওয়াটার’ নামে পরিচিত।
এ বছর বিশ্ব পানি দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ওয়াটার এন্ড জব’ বা ‘জল ও জীবিকা’। মূলত নিরাপদ পানি ও নিরাপদ কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে (বেটার ওয়াটার, বেটার জব) এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে জাতিসংঘ। পানি ছাড়া মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ, প্রকৃতি ও পরিবেশ, উন্নয়ন ও অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং কর্মসংস্থান- কোনও কিছুই চিন্তা করা যায় না।

পৃথিবীতে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর মধ্যে নিঃসন্দেহে পানি গুরত্বপূর্ণ। শুধু মানুষের বেঁচে থাকার জন্যই নয়, পানি পৃথিবীর সব প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্য অতি জরুরি। এছাড়া কৃষিখাত তথা খাদ্য উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কলকারখানার কাঁচামাল উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণসহ সবক্ষেত্রেই পানি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। 

জাতিসংঘের মতে, পৃথিবীতে ১৫০ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান প্রত্যক্ষভাবে পানি-নির্ভর এবং এর মধ্যে ১০০ কোটি মানুষ শুধু কৃষিজীবী, মৎস্যজীবী ও বনজীবী। এছাড়া অন্যান্য প্রায় সব কর্মসংস্থানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পানির ওপর নির্ভরশীলতা রয়েছে। তবে সেই পানি অবশ্যই নিরাপদ হতে হবে। পানি নিরাপদ হলে জীবন ও জীবিকার ঝুঁকি কমে আসবে। কারণ, দূষিত পানি শুধু জীবিকার জন্যই ক্ষতিকর নয়, জীবনের জন্যও হুমকি। দূষিত পানি ও অস্বাস্থ্যকর স্যানিটেশনের কারণে পৃথিবীতে প্রতিঘণ্টায় ৩৮জন শ্রমিক পানিবাহিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে।

বাংলাদেশেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে পানির প্রভাব সর্বাধিক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৩ সালে পকেট বুক-এর তথ্য অনুযায়ী ২০০২-০৩ থেকে ২০১০ পর্যন্ত ক্রমশ কৃষিনির্ভর কর্মসংস্থান কমেছে। তবু সবশেষ ৪৭ ভাগ কর্মসংস্থান পানি-নির্ভর। সংখ্যার হিসাবে ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান (কৃষিকাজ, মৎস ও বনজ সম্পদ) পানি-নির্ভর। তবে এখানে নৌ যাতায়াতসহ পানির সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যান্য কর্মসংস্থান অন্তর্ভূক্ত করা হলে এ সংখ্যা ৩ কোটি ছাড়িয়ে যাবে।

বাংলাদেশ সৌভাগ্যবান একটি দেশ। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে সুবিশাল বঙ্গোপসাগর এবং অভ্যন্তরে অসংখ্য নদনদী। এছাড়া নদীগুলোকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার খাল রয়েছে।  হাওড়, বাওড়, পুকুর, নালা, ডোবাসহ নানারকমের জলাশয় দেশের অধিকাংশ জায়গায় বিদ্যমান ছিল। এসব জলাশয়ের পানি একদিকে মৎস’র আঁধার, অন্যদিকে কৃষিকাজে পানির যোগান নিশ্চিত করে। কৃষি, মৎস্য ও বনজনির্ভর কর্মসংস্থান ও নৌ যাতায়াত (মালামাল ও যাত্রী পরিবহন) সম্পূর্ণভাবেই পানির ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া পরোক্ষভাবে পশুপালন, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, গার্মেন্টস কারখানাসহ সবরকম শিল্প প্রতিষ্ঠান, পানি-নির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ইত্যাদি পানির ওপর নির্ভরশীল।
কৃষিকাজের মাধ্যমে ধান, গম, শাক-সব্জিসহ যেসব ফসল উৎপাদিত হয়, তার ভোক্তা দেশের ১৬ কোটি মানুষ। অর্থাৎ, দেশের সব মানুষের খাদ্য ও পুষ্টি সম্পূর্ণভাবে পানির ওপর নির্ভরশীল। কৃষিকাজের জন্য প্রয়োজনীয় পানি আছে বলেই আমরা খাদ্য নিরাপত্তায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু বিপুল পরিমাণ এই মানুষের কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা এখন হুমকির মধ্যে আছে।
যেমন: একসময় নৌ যোগাযোগই ছিল বাংলাদেশের প্রধান যাতায়াত মাধ্যম। মংলা ও চট্টগ্রাম সমুন্দ্র বন্দর হয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জে বড় বড় মালবাহী নৌ-জাহাজ আসত। কিন্তু নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, দখলের কারণে সংকুচিত হয়ে পড়া এবং নদীর ওপর সেতু নিচু করে নির্মাণ করায় বড় বড় নৌ জাহাজগুলো চট্টগ্রাম বা মংলা সমুদ্র বন্দর পেরিয়ে আর আসতে পারে না। এতে মালামাল পরিবহনে ব্যয় বেড়েছে, যা সামগ্রিকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি করেছে।

অথচ নদী শাসন ও নদী ড্রেজিং এর নামে প্রতিবছরই হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। যমুনার মতো বিশাল ও বহমান নদীর বুক চিরে এখন স্থায়ী আবাস গড়ে উঠেছে। মূলত, সড়কনির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে গিয়ে নদীগুলোর ওপর এমনভাবে সেতু তৈরি করা হয়েছে, যাতে ক্রমান্বয়ে নদী ধ্বংস হয়েছে। এতে একদিকে শুস্ক মৌসুমে পানি কমে যাওয়ায় অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে নিচু সেতু’র কারণে হওয়ায় বড় বড় জাহাজগুলোর আসতে পারে না। 
রাজধানী ঢাকার সমস্যা ভিন্নরকম। বুড়িগঙ্গা-তুরাগ-বালু ও শীতালক্ষা নদনদী পরিবেষ্টিত ঢাকায় একসময় অসংখ্য খাল-বিল থাকায় ঢাকায় পানির অভাব ছিল না। কিন্তু ঢাকার অধিকাংশ খাল-বিল বেদখল ও ভরাট হওয়ায় ভূগর্ভে পানি যেতে পারছে না। ফলে পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে। দখলের কারণে সংকুচিত হয়ে পড়া ঢাকার চারপাশের নদনদী ও জলাশয়ের পানি মারাত্মকভাবে দূষিত। ঢাকার চারপাশের নদ-নদীসমূহের পানিতে মৎস্য ও জলজ প্রাণী বেঁচে থাকার জন্য জরুরি অক্সিজেনের কোনও অস্তিত্ব নাই বলে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা যায়।

‘পবা’ দীর্ঘদিনযাবত নিয়মিতভাবে পানির মান নীরিক্ষা করছে। সবশেষ তিন সপ্তাহ আগে ঢাকার চারপাশের নদীসমূহ, বুড়িগঙ্গা, শীতালক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদীর দূষণ পরীক্ষা এবং দখল-ভরাট পর্যবেক্ষণ করে। এতে দেখা যায়, ঢাকা মহানগর, সাভার, কেরানীগঞ্জ, টঙ্গী, গাজীপুর, নারায়নগঞ্জ, নরসিংদী এলাকার পয়ঃবর্জ্য ও গৃহস্থালী বর্জ্য, শিল্পকারখানা ও হাসপাতালের কঠিন বর্জ্য (বিশেষত, ট্যানারি ও টেক্সটাইল ডাইয়িং কারখানার বর্জ্য), নৌযান থেকে নির্গত তেল এবং নৌযানের বর্জ্য এসব নদী দূষণের অন্যতম কারণ।

হাজারীবাগের ট্যানারিসমূহ হতে দৈনিক ২২,০০০ কিউবিক মিটার অপরিশোধিত বর্জ্য (ক্রোমিয়াম, লেড, সালফিউরিক এসিডসহ) নদীতে পড়ছে- যা শুধু বুড়িগঙ্গার পানিই দূষিত করছে না, নদীর তলদেশ, উভয় পাড়ের মাটি, বাতাসকেও ভয়াবহভাবে দূষিত করছে। ট্যানারিগুলো সাভার ও কেরানীগঞ্জে চামড়া শিল্প নগরীতে সরানোর কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন না হওয়ায় নদী দূষণ অব্যাহত। টেক্সটাইল কারখানার বর্জ্যসহ বিভিন্ন শিল্পকারখানার ১লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার বর্জ্য নদীতে পড়ছে। অনেক শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিশোধনাগার নেই। যেসব শিল্পকারখানার বর্জ্য পরিশোধনাগার রয়েছে, ব্যয় কমাতে অনেকে তা পরিচালনা করে না। ট্যানারিগুলো স্থানান্তর ও পরিশোধনাগার ব্যতিত শিল্প কলকারখানা অনুমোদন করায় শিল্প মন্ত্রণালয় এবং দূষণ মনিটরিংয়ে পরিবেশ অধিদফতরের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
ঢাকা মহানগরীতে পয়ঃবর্জ্যের পরিমাণ ১৪ লাখ ঘনমিটার। পাগলা পয়ঃবর্জ্য পরিশোধনাগারে ১ লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার পরিশোধন ক্ষমতা থাকলেও মাত্র ৫০ হাজার ঘনমিটার পরিশোধন করা হচ্ছে। বাকি ১৩ লাখ ৫০ হাজার ঘনমিটার অপরিশোধিত অবস্থায় সরাসরি নদীতে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে ঢাকা ওয়াসার ব্যর্থতা অমার্জনীয়। এছাড়া ঢাকা মহানগরী ও আশেপাশের এলাকার গৃহস্থালী বর্জ্য, শিল্পকারখানা ও হাসপাতালের কঠিন বর্জ্যরে ৪০ শতাংশ (প্রায় ৩ হাজার টন) নালা-নর্দমা, খাল, জলাভূমি হয়ে নদীতে পড়ছে। ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন এসব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে।
ঢাকা মহানগরী থেকে বৃহত্তর বরিশালসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চলে যেসব নৌযানের মাধ্যমে যাত্রী ও মালামাল পরিবহন হয়, সেসব নৌযানে বর্জ্য ধারণ করার ব্যবস্থা না থাকায় নৌযানসমূহের বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা হচ্ছে। নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় এসব নৌযানের বর্জ্য নিয়ন্ত্রণ ও মনিটরিংয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসাবে ব্যর্থ।
নদীর দূষিত পানি ব্যবহার অনপুযোগী হওয়ায় নির্বিচারে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করায় পানির স্তর প্রতিবছর ১০ ফুট করে নিচে নেমে যাচ্ছে। অন্য দিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ত পানি উজানে প্রবাহিত হচ্ছে। নদী দূষণমুক্ত ও পানি প্রবাহ বৃদ্ধি করা না হলে এবং বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে আগামি ২০ বছরের মধ্যে পানির অভাবে ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে।
পবা’র বিশেষজ্ঞদের এই হুশিয়ারি আমলে নিয়ে জলাশয় দূষণ ও দখল থেকে রক্ষা করতে সর্বাত্মক পদক্ষেপ জরুরি। আগামী দিনে যেন কোনও জলাশয় দখল বা দূষণের শিকার না হয়, সেজন্য বিদ্যমান আইন ও নীতির কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান আইন বাস্তবায়নের দুর্বলতা দূর করে আইনকে শক্তিশালী করতে হবে। পানি শুধু জীবন ও জীবিকার জন্য জরুরি নয়, পানি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদও। অন্যান্য প্রায় সব সম্পদের উৎপাদনই পানিনির্ভর। তাই নয়, সভ্যতা, উন্নয়ন ও আগামী প্রজন্মের জন্য পানির আধারগুলোকে রক্ষা করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও সদস্য, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)

aisujon@yahoo.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ