অর্থনীতির দুর্বৃত্তায়ন

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৩:০২, মার্চ ২৩, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩৩, মার্চ ২৩, ২০১৬

কে কাকে করছে? অর্থনীতির দুর্বৃত্তায়ন কি রাজনীতিকে দুর্বৃত্তায়িত করছে, নাকি দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি অর্থনীতির দুর্বৃত্তায়ন সৃষ্টি করছে? নাকি উভয়ই ঘটছে? বলা কঠিন। তবে একথা সন্দেহাতীতভাবে বলা যায় বাংলাদেশে দুর্নীতির প্রকোপ কেবল বাড়ছেই।
অফিস আদালতে ঘুষ, বড় কাজে কমিশন ভাগাভাগি, নির্মাণ কাজের অর্থ লোপাট, জমি বেচাকেনায় চুরি, রাজস্বখাতে দুর্নীতিসহ নানা ফিরিস্তি দিয়ে শেষ হবেনা। তবে আর্থিকখাতের বড় বড় চুরি আর ডাকাতির ঘটনা সবাইকে পরাজিত করেছে বলেই মনে হয়। মার্কিন রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনার পর আবার আলোচনায় হলমার্ক কেলেংকারি, বেসিক ব্যাংক দুর্নীতি, বিসমিল্লাহ গ্রুপের ঋণ কেলেংকারি। কিন্তু আলোচনায় নেই কেমন করে ব্যক্তি বিশেষরা হয়ে উঠছেন একাধিক ব্যাংকের প্রভু।
২০১৪ সালে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির এক অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আবুল বারকাত বলেছিলেন, দেশের অর্থনীতি দুর্বৃত্তায়নের ফাঁদে পড়েছে। তার এই মন্তব্যের তিন বছরের মাথায় এসে ধারণা করছি, ফাঁদে নয়, দুর্বৃত্তায়নের ভেতরেই হাবুডুবু খাচ্ছে অর্থনীতি। দুর্বৃত্তায়ন প্রক্রিয়া তৈরি করে বাজার, প্রশ্রয় দেয় রাষ্ট্র।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ২০০৮-এ বলা হয়েছিল জনগণের রায়ে সরকার গঠন করতে পারলে দলটি ৫টি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সেগুলো হল (১) দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি প্রতিরোধ এবং বিশ্বমন্দার মোকাবিলায় সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, (২) দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা, (৩) বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত উন্নয়ন, (৪) দারিদ্র্য বিমোচন, এবং (৫) সুশাসন প্রতিষ্ঠা।

আর ২০১০ সালে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ১৭তম দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “আমার নিজস্ব একটা উন্নয়ন দর্শন আছে। আর তা হচ্ছে দেশের সিংহভাগ গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের উন্নয়ন। ভূমিহীন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠির উন্নয়ন। আর এজন্য আমি মনে করি, শুধু প্রবৃদ্ধি অর্জন করলেই হবে না, এই প্রবৃদ্ধির ফসল যাতে দরিদ্র মানুষের ঘরে পৌঁছে তার উপায় বের করতে হবে”।

প্রধানমন্ত্রী এখনও এই দর্শনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বলেই বিশ্বাস আছে। কিন্তু  অর্থনীতির দুর্বৃত্তায়নের যে গতি বা চেহারা উন্মোচিত হচ্ছে তাতে দেশ থেকে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও অসমতা দূরীকরণ এক দুরূহ কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অন্যের সম্পদ গ্রহণ, অধিগ্রহণ, হরণ, দখল, বেদখল, আত্মসাতের মাধ্যমে দুর্বৃত্তায়ন হয়। দুর্বৃত্তরা সমাজের মোট সম্পদ শুধু হরণই করেনা, প্রতিষ্ঠানসমূহও ধ্বংসও করে দেয়। এই প্রক্রিয়ায় রাজনীতির সহযোগিতায় ক্ষমতাধররা অধিকতর ক্ষমতাবান হয়, আর ক্ষমতাহীন দরিদ্রের অক্ষমতা কেবলই বাড়তে থাকে। দুর্বৃত্ত-লুটেরাদের সঙ্গে বাজার-অর্থনীতি-রাজনীতি-সরকার এর সমস্বার্থের সম্মিলনই যেন চারদিকে লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

অর্থনীতি এবং রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নে গুটি কয়েক লোক অঢেল বিত্ত সম্পদের মালিক হয়েছে। এমন অবস্থা চলছে যে, তাতে প্রবৃদ্ধি যদি বাড়েও সেই উন্নয়ন মানুষকে কেবল বঞ্চনা দিতে তাকে। উন্নয়নের মানবিকীকরণ চাইলে ফাও-খাওয়া শ্রেণী আর গোষ্ঠীকে রাজনীতি ও সরকার থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হবে। আর এজন্য প্রয়োজন মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, সহমর্মী ও আস্থাশীল সুদূর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্ব। সমাজ থেকেও প্রচণ্ড শব্দে এই দাবি উঠতে হবে।

কোনও কোনও গবেষক বলেন, কালো অর্থনীতির আকার এখন বৈধ অর্থনীতির প্রায় ৭৫ শতাংশেরও বেশি।  আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি, চোরাচালান, কালোবাজারি, মাস্তানি, চাঁদাবাজি, ঠিকাদারির নামে পুঁজি লুণ্ঠন, রাজনৈতিক নেতা-পাতিনেতা-কর্মীদের লুটপাট কিংবা মন্ত্রী-সাংসদদের মার্জিন-শিকার- এগুলোই কালোটাকার প্রধান উৎস, এটা মোটামুটি সবার জানা। জমিজমা, প্লট, অ্যাপার্টমেন্ট, বাড়ি, দোকানপাট ইত্যাদি বেচাকেনায় সঠিক দাম কখনও দেখানো হয়না সরকারের কর ফাঁকি দেওয়ার জন্য। তাই কালোটাকা সৃষ্টি হওয়াটা এখানে লেনদেনের ভেতরকার সংস্কৃতি।

এসব চেনা পথের বাইরে এক ভয়ংকর উপদ্রব আর্থিক খাতে অনিয়ম আর দুর্নীতি। আর্থিক খাতে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রভাবই দুর্নীতির বড় কারণ। ব্যাংক কর্মকর্তারা না চাইলেও অনেক সময় অনিয়মের সঙ্গে আপোষ করতে হয় রাজনৈতিক চাপের কারণে। ঋণ পাওয়ার যোগ্য না হলেও ঋণ দিতে হয় বাধ্য হয় ব্যাংক, বিশেষ করে সরকারি ব্যাংক।

সব সরকারের আমলেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে দলীয় লোকদেরকে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বসানোর কারণে এ ব্যাংকগুলোতে সবসময়ই দুর্নীতির প্রকোপ থাকে বেশি। দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে আর্থিক খাতে সব ধরণের রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধ করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেও অসহায় কোনও কোনও ক্ষেত্রে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অনিয়মে কিছুই করার থাকেনা বাংলাদেশ ব্যাংকের। সেখানে মূল আধিপত্য অর্থমন্ত্রণালয়ে ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের। একজন সচিবের নেতৃত্বে এই বিভাগ হয়ে উঠেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও ব্যাংকিং জগতে সুশাসনের প্রধান অন্তরায়।   

বাজার বিবেচনায় কত বড় আমাদের আর্থিক খাত? অথচ ব্যাংকের সংখ্যা কেবল বাড়ছে। ব্যাংক  মালিকানা কেনার যে হিড়িক পড়েছে, তার সঙ্গে আসলে মানি লন্ডারিং ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে ব্যাংক বর্তমানে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। পুরনো ব্যাংকের সঙ্গে আরো কিছু নতুন ব্যাংক যুক্ত হয়েছে গত কয়েক বছরে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অনিয়ম ও দুর্নীতির যেসব চিত্র উন্মোচিত হয়েছে, এখনও হচ্ছে তাতে করে ব্যাংকগুলোতে আস্থার সংকট সৃষ্টি হতে পারে সহসাই, যা কেউ চায়না।

ব্যাংকিং সেক্টরের বিভিন্ন নিয়মকানুন সঠিকভাবে পরিপালন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনগত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত জরুরী। আর এক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী মানুষেরা অন্তরায়।

আর্থিক খাত এখন যতটা না ‘ব্যবসাবান্ধব’, তার চেয়ে অনেক বেশি দলবান্ধব। আমরা বুঝতে পারছি অর্থনীতি ও প্রশাসনে রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন হয়েছে। আইন বন্দী হয়ে পড়েছে টাকার কাছে। আর্থিক খাতে যে কয়টি কেলেংকারির ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোকে বিশ্লেষণ করে নতুন করে এই জগতে সুশাসনের কথা চিন্তার সুযোগ এসেছে। রিজার্ভ চুরির ঘটনা কেবলই সাইবার নিরাপত্তার দৃষ্টিতে না দেখে দেখতে হবে পুরো জগতটিকে কি করে দুর্বৃত্তদের কবল থেকে বের করে আনা যায় সেই বিবেচনায়।  

লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টেলিভিশন 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ