behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

প্রসঙ্গ রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা

গোলাম মোর্তোজা১৩:৫২, মার্চ ২৩, ২০১৬

গোলাম মোর্তোজাআমরা এমন একটা সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করছি, যেখানে কোনও প্রশ্ন তোলাকে নিরুৎসাহিত করা হয়। প্রশ্ন তুলতেই আপনার দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হবে। রাজনৈতিকভাবে আপনি যে মতের মানুষই হোন না কেন, পরিচয় হয়ে যাবে যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে, জামায়াত-শিবির। যুক্তি-তথ্য বলছে কাজটি করলে ভয়ঙ্কর ক্ষতি হবে, প্রশ্ন তুললে বলা হবে আপনি উন্নয়নবিরোধী। ‘বিশ্বাস’ রাখতে হবে, প্রশ্ন বা সন্দেহ করা যাবে না। যদি এমন হতো যে বিশ্বাস ভঙ্গের কোনও ঘটনা ঘটছে না, তাও না হয় কথা ছিল! তা তো নয়। প্রতিনিয়ত বিশ্বাস ভাঙছে। তারপরও বিশ্বাসই রাখতে হবে, যেন বিশ্বাস রাখাটাই আপনার একমাত্র কাজ। ক্ষমতাসীনদের চাওয়াটা এমনই। এমন চাওয়া প্রতিষ্ঠা করতে পারলে জবাবদিহিতা বলে কোনও বিষয় ক্ষমতাসীনদের মনে রাখতে হবে না। যা করবে সেটাই সঠিক। সক্ষমতা বা সক্ষম হয়ে ওঠা বা বৃদ্ধির কোনও বিষয়ও তখন থাকবে না। সবকিছুর পক্ষে যুক্তি একটাই ‘দেশের কোনও ক্ষতি হোক তিনি তা করবেন না। যা করছেন দেশের ভালোর জন্যেই করছেন।’
এমন একটা অবস্থায় বড়ভাবে কিছু বিষয় সামনে এসেছে। সেখানে ‘বিশ্বাস’ ‘বিচ্যুতি’ ‘সক্ষমতা’ বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বা আন্তরিকতার প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। কিছু ঘটনার প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা।
১. বিমানবন্দরের নিরাপত্তা, কার্গো ব্যবস্থাপনা নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে আলোচনা হচ্ছে। মূলত বিদেশিরা প্রশ্ন তুলছে। প্রথমাবস্থায় পাত্তা দিতে চাইনি। অস্ট্রেলিয়া কার্গো যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। সরাসরি ফ্লাইট না থাকায়, আমরা খুব একটা গুরুত্ব দেইনি। ব্রিটেনে বন্ধ করে দেওয়ায় কান্নাকাটির অবস্থা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ, আমাদের স্ক্যান করার দক্ষ লোকবল নেই, স্ক্যানার নষ্ট ইত্যাদি। দক্ষ লোকবল তৈরি করার কোনও উদ্যোগ আমরা নেইনি। স্ক্যানার সচল রাখার উদ্যোগও নেইনি। কার্গো বন্ধ করে দেওয়ার পর তড়িঘড়ি করে ব্রিটিশ দুই কোম্পানি ডেকে এনে কাজ দিয়েছি বিমানবন্দর নিরাপত্তার। আমাদের রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা এত কম যে, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছি না। বিদেশিদের ডেকে আনতে হচ্ছে। অথচ আমাদের সামরিক বাহিনী যুদ্ধবিধ্বস্ত বহু দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে।
নিজেদের উন্নতির উদ্যোগ না নিয়ে আমাদের এই বিদেশ নির্ভরতা কেন? প্রায় ৭৪ কোটি টাকা দিতে হচ্ছে ব্রিটিশ কোম্পানিকে। তাদের থাকা-খাওয়া-নিরাপত্তার পেছনে নিশ্চয়ই আরও অনেক টাকা খরচ হবে। স্ক্যানার দক্ষ লোকবল তৈরির পেছনে কেন আমরা এই অর্থ গত এক বছরে খরচ করলাম না?

২. বাংলাদেশ ব্যাংকে বিদেশিদের নিয়ে নিরাপত্তা ‘নিশ্চিত’ করতে চাইছি। দেশিয় বিশেষজ্ঞের সন্ধানও করে দেখিনি। একজন দেশিয় বিশেষজ্ঞ জোহা তো গুম-অপহরণ বা নিখোঁজ হয়ে নাটকীয়ভাবে আবার ফিরে এলেন। বাংলাদেশের রিজার্ভ ২৮ বিলিয়ন, চুরি ৮০০ কোটি টাকা- এসব নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। খুব একটা কথা হয়নি গত বছর বাংলাদেশ ব্যাংক লোকসান দিয়েছে ৪,১৫১ কোটি টাকা। এর মধ্যে নিট লোকসান ২,৬২২ কোটি টাকা।

ডলারসহ অন্যান্য মুদ্রার মূল্যমান কমে যাওয়াসহ বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক যুক্তি দিতে পারবে। তার কিছু হয়ত সঠিকও। তবে শুধু অফিস সময়ে ট্রেড করা, অন্যান্য সময়ে (বন্ধের দিনসহ) ট্রেড না করা এই লোকসানের একটা বড় কারণ।

এখানেও মূল প্রশ্ন আন্তরিকতা এবং সক্ষমতার।

৩. গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে এত আলোচনা হয়েছে যে, নতুন করে বলতে ইচ্ছে হয় না। গ্রামীণ ব্যাংক, ড. ইউনূসকে পছন্দ বা অপছন্দ করার স্বাধীনতা সবারই আছে। তার কাজ নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হবে, সেটাও অস্বাভাবিক নয়। ড. ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়ম নিয়ে প্রতিদিন অভিযোগ করা হয়েছে। সরকারের তদন্ত কমিটি কয়েক বছরে, কয়েক কোটি টাকা খরচ করে করা তদন্তে কোনও অনিয়ম বা দুর্নীতির সন্ধান পায়নি। ড. ইউনূস না থাকলে গ্রামীণ ব্যাংক ভালো চলবে, তাও আমরা শুনেছি। ড. ইউনূসের অবর্তমানে কেমন চলছে গ্রামীণ ব্যাংক? ড. ইউনূসের কঠোর সমালোচকরা এ বিষয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চুপ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে কিছু তথ্য উল্লেখ করছি। ২০১৩ সালে গ্রামীণ ব্যাংক লাভ করেছিল ১৩৩ কোটি ২৯ লাখ টাকা। ২০১৪ সালে লাভ করেছে ৪৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এক বছরে নিট লাভ কমেছে ৮৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। বিদেশি তহবিল কমেছে। জালিয়াতির পরিমাণ বেড়েছে। এক বছরে ২৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকার অনিয়ম হয়েছে। কূ-ঋণের পরিমাণ ৩৭৫ কোটি টাকা। যে চিত্র অতীতে কখনওই এমন ছিল না। আরও অনেক অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তথ্য আছে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া প্রতিবেদনে।

এই হলো আমাদের রাষ্ট্রের সক্ষমতা।

রাষ্ট্রের নিজের নিয়ন্ত্রণের ব্যাংক, বীমা কোনও কিছুই ঠিকমতো চালাতে পারে না। ভালো চলা প্রতিষ্ঠানও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নামে ধ্বংস করে দিতে চায়।

৪. পদ্মাসেতুকে কেন্দ্র করে রেললাইন নির্মাণ করছি। রেলখাত প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার উপরে লোকসান দেয়। সেই রেলওয়ে নতুন লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করছে বিত্তশালী জমিদারি উপায়ে। গাড়ি কিনছে এক দেড়শ। উপদেষ্টাসহ খরচের ছড়াছড়ি। এই অর্থের বেশিরভাগ কিন্তু কঠিন শর্তে চীনের থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এই ঋণ শোধ করতে হবে।

৫. মালয়েশিয়ায় পাম বাগানে কাজ করা প্রবাসী কর্মী, সৌদি আরবের মরুভূমিতে নির্মাণকাজ করা কর্মীরা অমানবিক শ্রমে আয় করে অর্থ পাঠান। রিজার্ভ ২৮ বিলিয়ন ডলার হয়। চুরি ঠেকাতে না পারা বা সহযোগী ড. আতিউররা গর্ব করে। যাতে তাদের কোনও অবদান নেই। এই অর্থ থেকে ৮০০ কোটি টাকা চুরির সঙ্গে সঙ্গে গত বছর পাচার হয়ে গেছে কমপক্ষে ৭৬ হাজার কোটি টাকা। পাচার নিয়ে, পাচার ঠেকাতে না পারা নিয়ে, কোনও কথা নেই সরকারের কর্তাদের।

সাধারণ প্রবাসী, রফতানিকারকরা অর্থ আনে, চোররা পাচার করে- বাংলাদেশ ব্যাংক, সরকার দেখে।

৬. পরিবেশ উন্নয়নে কোথাও কোনো কাজ নেই। বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগসহ নদীগুলো ধ্বংস করে ফেলেছি। এখন সুন্দরবন ধ্বংসের প্রক্রিয়া চলছে। পরিবেশ ঠিক রাখার সব কিছু নাকি সেখানে মেনে চলা হবে। যে দেশে কোথাও এমন কিছু মেনে চলার দৃষ্টান্ত নেই, সেখানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে সব মেনে চলা হবে। ‘গাঁজার নৌকা তো আকাশ দিয়ে চলতেই পারে’- সমস্যা কি!

৭. ৪৪ বছরের বাংলাদেশে ১৯৯১ সালের আগে পর্যন্ত জাতীয় নির্বাচনগুলো ছিল প্রহসন। সামরিক সরকারের সময়েও স্থানীয় সরকার নির্বাচন, ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনগুলো মোটামুটি সুষ্ঠু হতো। ‘ভোট না দেওয়ার’ মতো ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অতীতে কোনও দিন হয়নি, এবার হচ্ছে। পুরো নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। নির্বাচন কমিশন ‘জোকারে’র ভূমিকা পালন করছে।

৮. রাষ্ট্রের সক্ষমতার জন্যে কিছু শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান থাকতে হয়। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই তা থাকে, আমাদেরও ছিল। আমাদের সেসব প্রতিষ্ঠানের ধ্বংস প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছি। ফলে সরকারের ‘সক্ষমতা’ বলতে কিছু আর অবশিষ্ট থাকছে না। সরকারের দায়িত্বে যা ছিল, তা পালন করতে পারছে না। নতুন করে দায়িত্ব নিয়ে ‘সক্ষম’ প্রতিষ্ঠানগুলোকে ‘অক্ষম’ করে দিচ্ছে।

পদ্মাসেতু নিজেদের টাকায় করছি বলে গর্ব করছি, আর ভয়াবহ আকারে বিদেশ নির্ভরতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। আর্থিক নিরাপত্তার স্পর্শকাতর জায়গাগুলো ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে বিদেশিদের ওপর।
আমাদের মন্ত্রীদের চেয়ে দক্ষ মন্ত্রী পৃথিবীর অনেক দেশে আছে। নিশ্চয়ই তাদেরকে আমরা ভাড়া করে আনার মানসিকতা পোষণ করবো না। কিন্তু মন্ত্রী নিরাপত্তার জন্যে বিদেশিদের ভাড়া করে আনছেন। আমাদের কাজের মধ্যে ‘প্রো-অ্যাকটিভ’ বলে কোনও বিষয় নেই। সবকিছু করি ‘রি-অ্যাকটিভ’ নিয়মে করছি। তাও অত্যন্ত অযোগ্যতা, অদক্ষতার সঙ্গে। মাননীয় দেশ পরিচালনাকারীরা, নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ না নিয়ে, দেশের লোকবল সক্ষম না করে- আপনারা বিদেশি ভাড়া করে আনার মানসিকতা পোষণ করছেন কেন?

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ