behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

নারীর ঘর হয় না, দেশ হয় না

নবনীতা চৌধুরী১৯:২৭, মার্চ ২৩, ২০১৬

নবনীতাসত্য নিষ্ঠুর হলেও সে নাকি আমারে করে না বঞ্চনা। শবনম ফেরদৌসীর ‘জন্মসাথী’ এমন এক ভয়াবহ নিষ্ঠুর সত্যের মুখোমুখি করে আমাদের। কিন্তু এর চেয়েও নিষ্ঠুরভাবে সে আমারে বঞ্চনার কথা বলে। ৪৫ বছর বয়সী এ দেশের এক ভয়ঙ্কর ‘সিস্টেম্যাটিক’ বঞ্চনার সামনে আমাদের দাঁড় করিয়ে দেয়। মঙ্গলবার শবনম ফেরদৌসীর ‘জন্মসাথী’ ছবির প্রিমিয়ার প্রদর্শনীতে প্রথমবারের মতো পর্দায় আমার- আমাদের দেখা হয় সুধীরের সাথে, শামসুন্নাহারের সাথে।
বইয়ের ভাষায় তারা ‘যুদ্ধশিশু’। যে সমাজে তাদের বেড়ে ওঠা সেই সমাজে তারা ‘পাঞ্জাবির ছেলে’ আর ‘জারজ’। জন্মের পর থেকে বেড়ে ওঠার চেয়ে তাদের হত্যা বা মৃত্যুই শ্রেয়- এমন ভাষ্যেই দশজনের উৎসাহ। তবু তারা বেঁচে থাকেন, বেঁচে থাকেন দুঃসহ নির্যাতনের শিকার, সমাজে এখনও অগৃহীত তাদের মায়েরাও। কী অদ্ভূত পাগল মায়ের মন ভাবুন! এই মায়েরাও নাকি নির্মাতার প্রশ্নের উত্তরে বলেন, পাশবিক ধর্ষণের ফল হিসেবে পাওয়া এই সন্তানদের দেখেও নাকি মন একইভাবে মায়ায় ভরে উঠেছিল তাদের- এই পাগলামিকেই কি মায়ের মন বলি আমরা?
কথায় মধু মিশিয়ে এমন তো আরও কত কিছুই বলি আমরা! আমরা বলি, তিরিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে আর আড়াই লাখ নারীর ‘সম্ভ্রমের’ বিনিময়ে নাকি আমরা পেয়েছি এই মহামূল্য স্বাধীনতা। আচ্ছা ‘সম্ভ্রম’ দেয় কীভাবে? প্রাণ দিতে প্রস্তুত হয়ে না হয় বাংলার ‘দামাল ছেলে’রা বেরিয়ে পড়েছিলেন ‘দেশমাতৃকা’কে শত্রুমুক্ত করতে। ‘সম্ভ্রম’ দিতে তো কেউ বেরিয়ে পড়েননি। ৮-১০ বছরের শিশুকন্যা থেকে ৮০ বছরের বৃদ্ধারা নাকি তখন লুকিয়েছিলেন ঘরের কোণে সেই ‘সম্ভ্রম’ রক্ষার তাড়নায়। নারী তো জেনেই বড় হয়েছেন ‘ইজ্জত’ প্রাণের চেয়েও দামি। বাবার আশ্রয়, স্বামীর প্রশ্রয়, ভাইয়ের বীরত্ব- কিছুই নারীকে তখন রক্ষা করতে পারেনি।

যে সমাজ বলে এসেছে, এখনো বলছে, ঘরে নারীর নিরাপত্তা, সংস্কার মেনে চলায় সমাজের উন্নতি, পর্দায় নারীর মর্যাদা- সে সমাজ তখন অসহায়। এমন অবস্থায় ‘জন্মসাথী’র টেপরি বর্মনকে তুলে দেওয়া হয় পাঞ্জাবি মিলিটারির হাতে, যাতে রক্ষা পান তার বাপভাই। তবু ‘জন্মসাথী’ টেপরি বর্মনের কাছে পৌঁছাতে পারে, তার ছেলে সুধীরের খোঁজ পায় কারণ টেপরি বর্মণের বাবা যুদ্ধ শেষে ৬-৭ মাস শত্রুশিবিরে থাকা, গর্ভবতী মেয়েকে বাড়িতে ফেরত নিয়েছিলেন। স্যালুট সেই বাবাকে।!

আমরা স্বাধীন দেশের গর্বিত নাগরিকেরা কোনদিন কি প্রশ্ন করেছি, প্রশ্ন তুলেছি ‘কোথায় গেলেন সেই ‘আড়াই লাখ সম্ভ্রম হারানো নারী’? বীরাঙ্গনা? বঙ্গবন্ধু নাকি বলেছিলেন, আমি তোমাদের বাবা, তোমাদের ঠিকানা ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর- আমরা বঙ্গবন্ধুর অনেক মহানুভবতার গল্পের একটি বলেই তো একে মেনেছি। ভেবেছি কি, তার মানে এটাই যে ‘বীর বাঙালী’ এই আড়াই লাখ নারীকে স্বাধীন দেশে ঠিকানা দেয়নি? তার মানে ফিরতে পারেনি বাবার ঘরে, স্বামীর সংসারে? আমরা ৪৫ বছর ধরে টেলিভিশনে মুক্তিযোদ্ধা দেখলাম, পত্রিকায়- বইয়ে তাদের বীরত্বগাঁথা পড়লাম- কই, আমার আড়াই লাখ ‘সম্ভ্রম’ হারানো নারী গেলেন কই? তারাতো ‘শহীদ’ নন- ‘সম্ভ্রম’ গেলেও প্রাণতো তাদের ছিল। আরও নিষ্ঠুর সত্য তো এই যে- সেই সব প্রাণের অধিকাংশের ভেতরেই নাকি তখন বেড়ে উঠছিল আরেকটি প্রাণ- সেই প্রাণগুলোই বা কোথায় গিয়ে মরলো? কী হল তাদের? কুকুর বেড়াল তো নয়- মানুষের বাচ্চাই তো- ঠিক আপনার আমার মতো!

শবনম ফেরদৌসী সেই মানুষের বাচ্চাদের খুঁজতে শুরু করেন। শবনমের জন্ম ঢাকার হলিফ্যামিলি হাসপাতালে সদ্যস্বাধীন দেশে ৭২ সালের জানুয়ারি মাসে। বাবা মায়ের প্রেম আর আকাঙ্ক্ষার ফসল ৪৩ পেরুনো কন্যার জন্ম নিয়ে বলতে গিয়ে শবনমের বাবার চোখ মুখ এখনও আনন্দে উদ্ভাসিত। স্বাধীন দেশে কত বড় আনন্দ নিয়ে হাজির হয়েছিল তাঁর মেয়ে! এ নাকি ‘বিজয় শিশু’। কিন্তু শবনমের নারী মন, শিল্পী মন, হয়তো আরও বেশি করে তার মায়ের মন খোঁজ শুরু করে ওই একই দিনে একই হাসপাতালে জন্মানো আরো ১২জন শিশুর।

সেই সময় হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে অনেক মা তাদের ‘সম্ভ্রমের বিনিময়ে’ পাওয়া শিশু জন্ম দিতে এসেছিলেন- সেটা লোকমুখে, বইয়ের পাতায় জেনেছেন। শবনম তার সেই ‘জন্মসাথী’দের খোঁজ শুরু করেন। না কোথাও কোনও রেকর্ড নেই। হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেই, আজিমপুর শিশুসদনে নেই, মাদার তেরেসার হোমেও নেই। ওই ‘লজ্জার ইতিহাস’ কেউ বইতে চান না। আড়াই লাখ নারী আর তাদের গর্ভের শিশুদের আমরা মুছে ফেলেছি- বাঙালি শুধু বীরত্বগাঁথাই লিখবে ঠিক করে ফেলেছে, সেই বীরত্বগাঁথায় এসব কালিমা থাকবে না।

মায়েদের তখন নিজেদেরই আশ্রয় নাই, এই দুধের শিশুদের তারা কোথায় নেবেন? মায়েরা শিশু জন্ম দ্যান আর ফেলে রেখে হারিয়ে যান স্বাধীন দেশে। বিলাপরত মায়ের বুক থেকে কেড়ে সমাজ বাস্তবতা মেনে বিশেষ ব্যবস্থায় শিশুদের দত্তক দিয়ে দেওয়া হয়- দেশে, বিদেশে। ফাদার টিম নামের যুদ্ধশিশুদের নিয়ে সেসময় কাজ করা এক বিদেশি মিশনারি বলেন, গ্রামে গ্রামে গর্ভপাত ঘটাতে তখন বিদেশি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নাকি বাংলাদেশে আসে। মায়েরা জড়ো হন, গর্ভের ভ্রুণ ঝেড়ে ফেলে কোনও মতে ভীড়ে হারিয়ে যাওয়ার আশায়। হায়রে মনুষ্যজীবন, হায়রে মানুষের জান! গর্ভপাত ঘটাতে গিয়ে অনেক অবিকশিত অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণ নাকি ঠিক বেরিয়ে আসে- ওরা নাকি তবু বাঁচবে! মাদার তেরেসা এদেরও দায়িত্ব নেন। তবে, কেউ কোনও রেকর্ড রাখেন না। বাংলাদেশ থেকে শিশুদের দল কানাডা, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায়। দত্তকের পাশাপাশি তখন নাকি বিপুল পরিমাণ বাঙালি শিশু কেনাবেচাও হচ্ছিল দেশ, বিদেশে। স্বাধীন দেশ মায়ের কান্না শোনে না, শিশুর আশ্রয় দেয় না। ‘সোনার বাংলা’ গড়তে ব্যস্ত তখন সবাই। সেখানে ‘সম্ভ্রম হারানো’ নারী আর ‘জারজে’র জায়গা কই?

শবনমকে বোধহয় একটা ঘোরে পেয়ে বসেছিল, আমাদেরও তাতেই পায়। প্রায় ১৫-১৬বছর ধরে নাকি তাঁর এই খোঁজ। ৭২-এ জন্ম নেওয়া ‘জন্মসাথী’দের খুঁজতেই থাকেন তিনি। দর্শক হিসেবে ততক্ষণে আমরাও খুঁজতে শুরু করি সেই ‘আড়াই লাখ’কে আর তাদের গর্ভের সেই নিষ্ঠুর সত্যদের। শবনম খোঁজ পান সুধীর আর শামসুন্নাহারের। তারা টিকে যেতে পেরেছেন কারণ দুজনের গর্ভবতী মায়েরই সে সময় নানাবাড়িতে আশ্রয় হয়েছিল। জন্মের সময় গ্রামবাসী ভীড় করে তাদের মেরে ফেলতে উদ্যত হয়েছিল, তাদের মায়েরা একঘরে হয়েছেন, কেউ কখনো তাদের সঙ্গে খেলেনি, মেশেনি, অস্পৃশ্য হয়েই বেড়ে উঠেছেন- তবু বেঁচে আছেন, অদৃশ্য থাকতে চেয়েছেন, তবু এত বছর পরেও মায়েদের ধর্ষিতার কলঙ্ক ঘোঁচেনি, সুধীর - শামসুন্নাহারের কপালে শেষ হয়নি জারজ হওয়ার গঞ্জনা। শামসুন্নাহারের বাবা তার মাকে ফেরত নিয়েছিলেন কিন্তু সে ঘর শামসুন্নাহারের হয়নি, একই মায়ের পেটের ‘অ-জারজ’ ভাই এখনো যখন তখন মেরে ফেলতে চান তাকে। নির্বিকার শামসুন্নাহার যখন বলেন, ওই ঘরে জায়গা নাই, তাই শহর বদলাচ্ছেন, প্রয়োজনে দেশ ছাড়বেন- আমি/আমরা তখন হু হু করে কাঁদি আর ভাবি নারীর কি ঘর হয়, হয় কি তার কোনও দেশ, কোনও আশ্রয়? যে সমাজে মা-ই দেবী, দেশ মানে মা, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত- সেই দেশে নারীর ঘরই কই, কই দেশ আর কই বেহেশত!

সুধীর- শামসুন্নাহারের দুর্দশা দেখে আমরা যখন ভাবতে শুরু করি, ভাগ্যিস একদল শিশুকে সেসময় বিদেশ পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তখন শবনম হাজির করেন মনোয়ারা ক্লার্ককে। বাবা-মায়ের পরিচয় নেই বলে কানাডীয় স্বামী নাকি মেয়েকে কেড়ে নিয়ে মনোয়ারা ক্লার্ককে ঘরছাড়া করেছেন! এত বছর পর দেশে ফিরে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে জন্মসনদের খোঁজ করেন মনোয়ারা। সুধীর-শামসুন্নাহারের তো তবু মা আছেন। হায়রে মনোয়ারা- বাপ মা না থাকার লজ্জা, আর অজানা জন্মভূমির প্রতি ক্রোধ ছাড়া এই বিদেশ পার করে দেওয়া মানুষটির আর কিস্যু নাই। তার বাংলাদেশ নাই, কানাডা নাই, বাপ মা নাই, স্বামী নাই, এমনকী নাই নিজের সন্তানে অধিকার। বাংলাদেশে এখন যারা তাকে জাতিগত পাপ লাঘবে বুকে টেনে নিয়েছেন তাই তাদের কাছেই মনোয়ারার ক্ষোভ- কেন তাকে সেসময় বাংলাদেশ থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল? কেন সে বড় হতে পারলো না তার নিজের দেশে? মনোয়ারা কি রাগ দেখান নাকি অভিশাপ দ্যান স্বাধীন দেশের এই আমাদের?

ত্রিশ লাখ না তিন লাখের বিতর্কে একদিন টকশোতে দেখি এক তরুণ আইনজীবী অনেক ‘গবেষণা’ নাকি ১৯৭১ সালে নিহতের সংখ্যা ৫ হাজারও বলে এমন দাবি করে বসলেন। এদের দয়ায় এ সংখ্যা হয়তো খুব শিগগিরই কয়েকশ’তে গিয়ে ঠেকবে। এরা এখন তালিকা চান, রেকর্ড চান। পৃথিবীর কোন গণহত্যায় কবে নিহতের তালিকা হয়েছে আমি জানি না, জানেন না তারাও। গণহত্যার সব সময়ের একটা বড় অনুসঙ্গ হচ্ছে ব্যাপক নারী ধর্ষণ- যাতে একটি জাতিকে একদিকে প্রাণে মেরে আরেকদিকে সে জাতির নারীর গর্ভে আরেক জাতীয়তার ‘বিষ’ মিশিয়ে তাকে নিঃশেষ করে ফেলা যায়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঠিক সেটাই কিন্তু করেছিল- একদিকে গ্রামকে গ্রাম গুড়িয়ে পুড়িয়ে দেওয়া আরেকদিকে ধর্ষণ আর ধর্ষণ। কিন্তু সমাজ হিসেবে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ইতিহাস মুছতে থাকার, মুক্তিযোদ্ধা-রাজাকার কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমরা ওই ‘আড়াই লাখ’কে হাপিশ করে দিলাম, তাদের অনেকেরই গর্ভস্থ ভ্রুণসহ। ভেবে দেখার বোধহয় সময় এসেছে, সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসেবেই আমাদের সদা গৌরবের তিরিশ লাখকে কয়েক হাজারে নামিয়ে আনার ঘৃণ্য চেষ্টা শুরু হয়েছে কি না!

শবনমের ‘জন্মসাথী’ আমার অনেকদিনের সেই ভাবনাকেও সমর্থন যোগায়। কারণ, আমরা দেখি, শামসুন্নাহারের মা মাজেদা বেগম ৪৩ বছর পর ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে তাকে পাকিস্তানি ধর্ষকদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিচার পান- যুদ্ধের ক’বছর বাদে ৭৮ সালে রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত, ৭৯তে বিএনপি থেকে এমপি নির্বাচিত, এরপরে এরশাদ সরকারের আমলে মন্ত্রীত্ব পাওয়া ৭১-এর মুসলিম লীগার দোর্দণ্ড প্রতাপশালী ‘কায়সার বাহিনী’র প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সারের বিরুদ্ধে। চাল নাই, চুলা নাই, ‘সম্ভ্রম’ নাই, ‘বাপের পরিচয়’ নাই, ভাইয়ের অত্যাচারে বাড়িতে টেকার উপায় নাই, স্বামীর ঘরে ঠাঁই নাই– সেই শামসুন্নাহার যুদ্ধাপরাধ বিচারের ট্রাইব্যুনালে এসে তার মায়ের ওপর নির্যাতনের সাক্ষ্য দিয়ে যান। নাহ! দেশের কাছে তার চাইবার কিছু নাই- শবনম জিজ্ঞেস করেছিলেন তাকে। আর আমি ভাবি, ভাগ্যিস মাজেদার বাবা ধর্ষিতা মেয়েকে আশ্রয় দিয়েছিলেন, তাই ৪৩ বছর বাদে বাংলার মেয়ে তুরিন আফরোজ জিতে আনেন সর্বোচ্চ আদালতের এই সিদ্ধান্ত যে, ধর্ষণের শাস্তিও মৃত্যুদণ্ডই বটে। প্রাণহরণের চেয়ে, ধর্ষণ কোনও কম দোষ নয়। তবে কি প্রাণ দেওয়া আর ‘সম্ভ্রম’ দেওয়া সমান মর্যাদার? তবে কি মাজেদা আর টেপরি মুক্তিযোদ্ধা? নাকি তারা শহীদ?

এসব আবেগের কথা, মার্চ মাসে এসব আরো ভাল শোনায়। রাষ্ট্র দেরিতে, অনেক দেরিতে হলেও বিচার দিতে পারে কিন্তু ঘর দিতে পারে কই? মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্ভাসিত জাতি কি এই মার্চ মাসে ভাববে, সোনার বাংলায় ধর্ষিতাকে আশ্রয় দেওয়ার কথা? যত জোরে খুন আর গুমের বিচার চাই তত জোরে ধর্ষণের বিচার চাওয়ার এখনও কি সাহস রাখে এই সমাজ? ‘পাশবিক’ নির্যাতন হয়েছে বলে মুখ লুকাবো আর কতদিন? কুকুরে কামড়ালে, সাপে কাটলে ঘরে জায়গা হয়, মানুষ হামলে পড়লে নারী এখনও কেন একা? কোথায় তখন ভাইয়ের খবরদারি আর বাপের অপত্য স্নেহ? এ সমাজকে এখন এইসব ভাবতে হবে, অস্ত্র ছুঁড়তে হবে শবনম-তুরিন কিংবা আমরা যারা শিখেছি, পড়েছি, এই নারীবিমুখ সমাজেও সব সুযোগ পেয়ে বড় হওয়ার কপাল করে জন্মেছি সেই নারীদের। অভিনন্দন-অভিবাদন শবনম ফেরদৌসীকে সেই দায়িত্বের কথা মনে করিয়ে দেওয়ায়।

ধন্যবাদ এবং অভিবাদন একাত্তর টেলিভিশনকে এমন একটি প্রযোজনার জন্যে। তিরিশ লাখকে যারা তিনে নামানোর ধান্ধায় আছেন সেই প্রাজ্ঞদের অনেকের মুখেই সবসময় শুনি ‘একাত্তর’ নাকি শুধু মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ করে, রাজাকারের ফাঁসি আর চেতনা ছাড়া কিছু বোঝে না। ‘একাত্তর’ আবার প্রমাণ করলো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বোঝার আমাদের এখনও কত বাকি। ‘জন্মসাথী’ ভুলতে চাওয়া নিষ্ঠুর সত্যের দালিলিক প্রমাণ হয়ে থাকবে আজীবন। যৌথ প্রযোজনায় এগিয়ে আসার জন্যে ধন্যবাদ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকেও।

একাত্তর টেলিভিশন ২৫ মার্চ রাত আটটায় প্রচার করবে শবনম ফেরদৌসীর এই অসাধারণ সৃষ্টি ‘জন্মসাথী’- এটা দেখতেই হবে, ভাবতেও হবে।

একাত্তরের প্রধান সম্পাদক মোজাম্মেল বাবু প্রিমিয়ার প্রদর্শনী শেষে দর্শককে ভাবতে বললেন- ‘সম্ভ্রম/ইজ্জত’ হারানোর প্রচলিত ধারণাটির সম্পর্কে। এ নিয়ে আমরা মেয়েরা অনেকদিন অনেকসময় আলাপ করেছি, পুরুষের মুখে শুনে এবার উদ্বেল হলাম। ভেবেছি কি, সমাজ কী ভীষণ চাপ এই নারীজন্মে আরোপ করেছে? ‘সম্ভ্রম’ নাকি আমাকে ‘রক্ষা’ করতে হবে?’ ইজ্জত’ গেলেই আমি ‘বেইজ্জত’? প্রাণের চেয়েও মহামূল্যবান এই ‘ইজ্জত’ নিয়ে আমি কী করব? আসুন এই মার্চ মাসে আমরা এই বিষয়টি নিয়ে ভাবি। ভাবি ‘পাশবিক’ অত্যাচারে ‘ইজ্জত হারানো’ মা কিংবা মেয়েকে ঘরে ফিরিয়ে নেওয়ার মতো ‘মানুষ’ হতে পারলাম কি না এই ৪৫ বছরে!

সুধীর তবু ঘর গড়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নির্বিকার, জীবন নিয়ে আগ্রহহীন সুধীর মেয়ের নাম রেখেছেন জনতা। জনতা পড়ালেখা করেন, জারজের মেয়ে বলে খোঁটা শুনে বড় হয়েও কী বেহায়া মেয়েরে বাবা, বলে কিনা, আবার যুদ্ধ হলে সেও নাকি দাদীর মত সকল ত্যাগে প্রস্তুত!

আর ভ্যানচালক সুধীর- নুন আনতে পান্তা ফুরোয়- তার মোবাইল ফোনের রিংটোনে বেজে ওঠে- ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে’। তবে কি ‘পাঞ্জাবির ছেলে’ সুধীরের শরীরে মুক্তিযোদ্ধা টেপরি বর্মণের রক্ত কথা কয়? শবনম ফেরদৌসী আবার মনে করিয়ে দিলেন, ‘আমরা তোমাদের ভুলব না’। ৪৫ বছর পরেও আমরা বিচার চাইব, আমরা ভুলে যাওয়া ইতিহাস ঠিক ঠিক খুঁড়ে আনবো, খুঁজে নেবো জন্ম ইতিহাস।

লেখক: সংবাদকর্মী

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

সম্পর্কিত সংবাদ

 
 
 
 
Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ