behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

ট্রাই টু ফরগেট দ্য পেইন

শুভ কিবরিয়া১১:৫৫, মার্চ ২৯, ২০১৬

Shuvo Kibria১৯৭১ সালের শেষদিক। যুদ্ধ তখন জোরেসোরে চলছে। অক্টোবর মাসের ২২ তারিখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা রণাঙ্গনে মারাত্মকভাবে আহত হলেন মুক্তিযোদ্ধা মেজর খালেদ মোশাররফ। আর্টিলারি শেলের টুকরো আঘাত করেছে মাথায়। মাথার খুলির অনেকটা উড়ে গেছে। আহত খালেদ মোশাররফকে আনা হলো ভারতের লক্ষ্ণৌ হাসপাতালে। কোমায় তখন খালেদ মোশাররফ। তার বড় অপারেশন দরকার। ভারতীয় চিকিৎসকেরা বোর্ড বসালেন। কিন্তু তার অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নিতে সবাই ভয় পাচ্ছিলেন। চিকিৎসকদের অনেকের আশঙ্কা অপারেশন টেবিলেই মারা যাবেন তিনি। ইতোমধ্যে লন্ডন প্রবাসী সিলেটিরা তার সুচিকিৎসার জন্য লন্ডনে যাওয়ার টিকেট পাঠিয়েছেন। এই অবস্থায় রোগী লন্ডন পর্যন্ত জীবিত থাকবেন কিনা সেটাও একটা সংশয়। দ্বিধাগ্রস্থ ডাক্তারদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে জুনিয়র সেই ক্যাপ্টেন মাদান শেষাবধি সাহস দেখালেন। তিনিই অপারেশনটা করার দায়িত্ব নিলেন। সিনিয়ররা তাকে সহায়তা করতে রাজি হলেন।
অপারেশন তো হবে। কিন্তু অপারেশনের জন্য নিকটজনদের কাউতে তো নির্দিষ্ট ফরমে স্বাক্ষর করতে হবে। কোনও স্বজন তো নেই তখন হাসপাতালে। সিদ্ধান্ত হলো প্রবাসী সরকারের প্রতিনিধির স্বাক্ষর হলেও চলবে। এতো অল্প সময়ে সেটারও জোগাড় হবে কেমন করে?
অবশেষে হাসপাতালে পাওয়া গেলো আহত আরেক মুক্তিযোদ্ধা ক্যাপ্টেন আমীন আহম্মেদ চৌধুরীকে। তিনিও তখন ওই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে মারাত্মক আহত হয়ে একই হাসপাতালে তার বাস। ডান হাত তার তখন অকেজো। বাম হাতেই সেই ফরমে স্বাক্ষর করলেন আমীন আহম্মেদ চৌধুরী।
অপারেশন থিয়েটারে যাওয়ার আগে জ্ঞান ফিরেছে মেজর খালেদ মোশাররফের। ডাক্তারদের একজন তাকে বললেন, ‘ ট্রাই টু ফরগেট দ্য পেইন।’ উত্তরে খালেদ মোশাররফ বললেন, ‘ডক্টর, ইউ আর আসকিং প্রেগনেন্ট ডটার টু ফরগেট হার লেবার পেইন’। সন্তান প্রসবা কন্যাকে প্রসব বেদনা ভুলতে বলছো ডাক্তার!
এই অবস্থাতেও খালেদ মোশাররফের সেন্স অফ হিউমার দেখে ডাক্তারদের একজন বললেন , ‘এই কঠিন সময়ে যিনি এরকম রসিকতা করতে পারেন তিনি অবশ্যই সুস্থ হয়ে উঠবেন। ডাক্তারদের টানা আট ঘণ্টার এক জটিল অপারেশন শেষে খালেদ মোশাররফকে বাঁচানোর চেষ্টা আলোর মুখ দেখে। পরবর্তীতে ওই হাসপাতালের নার্সদের আন্তরিক সেবায় সুস্থ হয়ে ওঠেন মুক্তিযোদ্ধা মেজর খালেদ মোশাররফ।
দুই.
ওই হাসপাতালে বাংলাদেশের যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা  দিতেন দক্ষিণ ভারতীয় যেসব নার্স তাদের একজনের নাম রাণী। লক্ষ্ণৌ হাসপাতালে রাণীর পরিচর্যা পেয়েছেন যেমন মেজর খালেদ মোশাররফ তেমনি ক্যাপ্টেন আমীন আহম্মেদ চৌধুরীও। বহুবছর পর ২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় এক অনুষ্ঠানে রাণীর সঙ্গে দেখা হয় আমীন আহম্মেদ চৌধুরীর। রাণী তার পরিচয় দিয়ে ১৯৭১ সালের স্মৃতিচারণ করেন। তার কর্মকালীন সময়ের কথা স্মরণে এনে এক পর্যায়ে বলেন, ‘আমরা সেসময় খালেদ মোশাররফকে নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলাম। ডাক্তাররা সেসময় অনেক কষ্ট করে তাকে বাঁচিয়েছিলেন। তোমরা কী করে তাকে মেরে ফেললে!’
এইসব কথা আমীন আহম্মেদ চৌধুরী লিখে গেছেন তার বইয়ে। বইটির নাম, ‘১৯৭১ ও আমার সামরিক জীবন’।
তিন.
এইসব মুক্তিযোদ্ধার মতো নাম জানা না জানা অনেক মানুষের রক্ত-ঘামে জন্ম নিয়েছে বাংলাদেশ। সেই রাষ্ট্রটির বয়স সাড়ে চার দশক। অথচ এই রাষ্ট্রটিকে আমরা একটা ন্যূনতম ন্যায্য রাষ্ট্রের পথে দাঁড় করাতে পারলাম না। পদে পদে এখানে বিপত্তি। যারা যখন ক্ষমতায় এসেছে তারাই নিরঙ্কুশ ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চেয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে যে সরকার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিয়ে দেশ শাসন করতে গেছে সেই কর্তৃত্ববাদি হয়ে উঠেছে। সেই জনগণের চাওয়াকে অগ্রাহ্য করতে শুরু করেছে। তারপরই বাংলাদেশের রাজনৈতিক জীবনে একটা করে বড় বিপদ এসে দেশকে ভয়ঙ্করভাবে পিছিয়ে দিয়েছে। আজও আমরা সেই নিরঙ্কুশ ক্ষমতার বিপদজনকপথেই হেঁটেছি। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো মুক্তিযুদ্ধের সেই গভীরতর জন্মবেদনার হাত ধরে একটা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষম রাষ্ট্র বানানোর স্বপ্ন আজ হারিয়ে ফেলেছি বিভাজন আর দলীয় আনুগত্যের চোরাবালিতে।
মুক্তিযুদ্ধের রক্তরাঙা স্বপ্ন ছিল যে, সাম্য ও ন্যায্যতা , তা আজও বাংলাদেশে পথ খুঁজে পায়নি। সমাজ ও রাষ্ট্রে পদে পদে এখন বৈষম্য, বিভাজন আর অনায্যতা বিদ্যমান আছে। এর সঙ্গে হালে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তাহীনতার বোধ। সামরিক শাসন, হত্যা-ক্যু, গণতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের পথ ধরে বাংলাদেশ এখন এসে দাঁড়িয়েছে জঙ্গিবাদের খাদে। জনগণতান্ত্রিক না হয়ে রাষ্ট্র এসব অশুভ শক্তির মোকাবিলায় দিন দিন হয়ে উঠছে সমরনির্ভর রাষ্ট্র। নিরাপত্তা নিশ্চিতের খোঁজে যতই আমরা সামরিকীকরণের দিকে এগুচ্ছি ততই যেন অনিরাপত্তা আমাদের ঘিরে ধরছে।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনুর নির্মম হত্যাকাণ্ড তার বড় প্রমাণ। আমরা দেখছি স্বাধীন দেশে ব্যক্তি যেমন অনিরাপদ, রাষ্ট্রের বড় বড় প্রতিষ্ঠানও তেমনি অরক্ষিত। হালে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রিজার্ভ চুরির ঘটনা তার বড় নিদর্শন।
চার.
তাহলে কি সবই বৃথা! এই আত্মত্যাগ, এই বিপুল শ্রম, এই বিপুলতর ভালবাসা, সবই কি ফলহীন! বছরের পর বছর ধরে স্বপ্ন দেখানো, স্বপ্ন তাড়ানো আদর্শের বুলি সবই কি ফাঁপা।
যে বিশাল আত্মত্যাগ আর আত্মোৎসর্গের পথে হেঁটে মানুষ নেমেছে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষায়, তার পরিণতি কি তাহলে এই? মার্চ মাস যখন যাই-যাই করছে তখন এসব প্রশ্ন মাথায় আসছে।
পাঁচ.
কবি লিখেছিলেন, বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক! মিলিত মানুষ ও প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব বিপ্লব’। মুক্তিযুদ্ধ থেকে উঠে আসা সেই আশাজাগানিয়া বিপ্লবের রঙ ফ্যাকাসে হয়ে উঠছে। বাংলাদেশে এখন মিলিত মানুষের রাষ্ট্রের চাইতে ক্ষমতাবান মানুষের যে কোনও মূল্যে প্রতিষ্ঠার পথ বড় হয়ে উঠছে। আমরা সমষ্টির কল্যাণ ভুলছি, ব্যক্তির প্রাপ্তিকেই বড় করে তুলছি। ব্যক্তির প্রাপ্তি কোনও হীন জিনিস নয়, যদি তা সমষ্টির ন্যায্য প্রাপ্তিকে অনায্যভাবে দলিত মথিত না করে। কিন্তু শক্তির নীতিতে, ক্ষমতার জোরে, শক্তির ভরে আর্থিক-সামাজিক প্রতিষ্ঠার চলমান নীতি সব ন্যায্যতাকে ধুলোয় লুটিয়ে দিচ্ছে। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে একটা নির্বাচন কেন্দ্রের ভোট জালিয়াতি জায়েজ করতে আমরা কয়েক গণ্ডা বুলেট খরচ করছি। হত্যা করছি হালির ওপরে মানুষ। আহত করছি শতাধিক মানুষ। আর এই অন্যায্য, বিবেকহীন, দায়িত্বহীন মানুষ হত্যার ওপরে দাঁড়িয়ে মামলা দিচ্ছি অজ্ঞাতনামা ১৩০০ জনের  বিরুদ্ধে। এলাকা ছাড়া করছি নিরীহ জনগণকে। এই হচ্ছে বিচার, এই হচ্ছে রাষ্ট্র!

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ