behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

স্বাধীনতার লভ্যাংশ

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা১৩:০৬, মার্চ ৩০, ২০১৬

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাস্বাধীনতার ৪৫ বছরে এসে আমরা কতটুকু মূল্য সংযোজন করতে পেরেছি আমাদের সামগ্রিক জীবনে? এই উত্তর খুঁজতে হবে নানা বিশ্লষণে। যদি পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা হয়, তাহলে দেখা যাবে আর্থ-সামাজিক প্রায় প্রতিটি খাতে আমরা পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে। এমনটা কখনওই ছিল না, যখন আমাদের এই বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান নামে পরিচিত ছিল।
বিশ্ব অর্থনীতির বাজারের ব্র্যান্ড ভ্যালু চিন্তা করলে পাকিস্তান কি কোনও ব্র্যান্ড? লন্ডন ভিত্তিক ব্র্যান্ড ফিনান্স বলছে- একশোটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৭, যেখানে পাকিস্তান আছে ৫৪তম অবস্থানে। পরিসংখ্যানের দিক থেকে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড মূল্য ধরা হয়েছে ১৪৪ বিলিয়ন ডলার। পাকিস্তানের ৯৩ বিলিয়ন ডলার।  
কিন্তু জীবনতো শুধু অঙ্কের হিসেব নয়। পরিষ্কারভাবে স্বাধীনতা আমাদের প্রগতি আর স্বস্তি দিয়েছে যা এখন পাকিস্তানে নেই। স্বাধীনতাপূর্ব এই ভূখণ্ডটি ছিল পাকিস্তানের পশ্চিম অংশ থেকে অনেক বেশি বঞ্চিত, দরিদ্র এবং প্রায় শিল্পহীন। আমাদের ছিল লোক সংখ্যা বেশি, তবুও আমরা পাইনি কিছু। আজ পাকিস্তানে জনসংখ্যাও বেশি, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে, যা বুঝিয়ে দেয়, দেশটি চলছে কীভাবে। এর কারণ সামরিক শাসন। বাংলাদেশ আরও সামনের কাতারের থাকতো, যদি না বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশ সামরিক শাসক আর স্বাধীনতা বিরোধীদের কবলে পড়তো। সামরিক শাসনের কবল থেকে বের হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি চার শতাংশের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে ছয় শতাংশ অতিক্রম করছে। ডাবল ডিজিট ঘরেও হয়তো পৌঁছানো সম্ভব হতো, কিন্তু বেশ কিছু বাস্তবতায় তা হয়নি।
অর্থনৈতিক দিক থেকে বাংলাদেশের অনেক কিছু করার ছিল, অনেক কিছু হয়নি। তবে জীবনযাত্রার মানের দিক থেকে আমাদের অগ্রগতি অনেক আলোচিত। পাকিস্তান থেকে তো বটেই, কোনও কোনও সূচকে ভারতের চেয়েও ভালো জীবনযাপন করছে বাংলাদেশের মানুষ। দারিদ্র্য, আয়ের বৈষম্য, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া কমেছে; বেড়েছে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ, নারীর ক্ষমতায়ন। এসবের প্রভাবে বেড়েছে গড় আয়ু।
নব্বই-এর দশকেও বাংলাদেশের ৫৭ ভাগ মানুষ দারিদ্র সীমার নিচে বাস করতো। এখন এ হার ২৫ ভাগেরও কম।  কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিক ছয় শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে চাঙা রেখেছে। বড় অবদান প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ আর পোশাক শিল্পের বিকাশ। কিন্তু জমি কমে গেলেও কৃষিতে আমাদের সৃজনশীলতা দেশকে দিয়েছে স্বয়ং সম্পূর্ণ চেহারা। সামনের দিনগুলোতে অর্থনীতি নতুন অঙ্গিকারে ইঙ্গিত দিচ্ছে, কারণ রানা প্লাজা আর তাজরিনের মর্মান্তিক বিপর্যয়, আর তা থেকে সৃষ্ট প্রতিকূলতা কাটিয়ে তৈরি পোশাক খাত ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
এখন বাংলাদেশের সামনে স্বপ্ন ২০২১ সালের মধ্যে একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়া।  দ্রুতগতিতে অর্থনৈতিক অর্জনের পথে বাংলাদেশের সামনে অবশ্য চ্যালেঞ্জ বা অন্তরায়ও কম নয়। একটি প্রযুক্তিনির্ভর জনকল্যাণকামী দেশ বা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলার স্বপ্নের বাস্তবায়ন করতে সামনে আছে বড় বড় চ্যালেঞ্জ। একটি বড় অন্তরায় ছোট এই দেশে এতো মানুষ। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড-এর কথা মানলেও ১৫ থেকে ৩৫ বছরের পাঁচ ছয় কোটি মানুষকে বৃত্তিমূলকসহ প্রযুক্তি শিক্ষার মাধ্যমে মানবসম্পদে রূপান্তরে একটি কার্যকর শিক্ষানীতি খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। লক্ষ লক্ষ কওমি মাদ্রাসা যেসব শিক্ষার্থী তৈরি করছে তাদের সিলেবাস না বদলালে ভবিষ্যতে এরা হয়ে উঠতে পারে এক একটি পাকিস্তানি তালেবান। সামাজিক খাতের অগ্রগতিও প্রশ্নের মুখে পড়ে যখন তনুদের মরে যেতে হয়, বিচার হয় না বা বিচার নিয়ে সংশয় থাকে।
ছয় শতাংশ প্রবৃদ্ধি আর আমাদের স্বস্তি দেয় না। চাহিদা অনেক বেশি। এই যে ছয় শতাংশের ঘেরাটোপও পেরোতে পারছি না, এর কারণ বিনিয়োগ তেমন বাড়ছে না। অবকাঠামো সৃষ্টি ও সম্প্রসারণে সরকারি বিনিয়োগ বাড়লেও বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ চোখে পড়ছে কম। বিনিয়োগ বোর্ড হযতো নানা অঙ্ক করে দেখাবে যে বিনিয়োগ বাড়ছে, কিন্তু অর্থনীতির স্বার্থে যে কোনও দাবিই নির্মোহ হওয়া শ্রেয়।
দেশের অগ্রগতিতো শুধু অর্থনীতি দিয়ে বিচার করা যায় না। স্বাধীনতার চাওয়া ছিল গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক মুক্তি, সামাজিক ন্যায়বিচার আর উদার-অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। যখন মূল্য সংযোজন কিংবা লভ্যাংশের কথা বলি, তখন এই আসল চাওয়ার দিকে তাকাতে হয়। আমরা কোনওদিন ভাবিনি বাংলাদেশ আবার সামরিক শাসনের কবলে পড়বে, কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দুই দশকের বেশি সময় পাকিস্তান স্টাইলে সামরিক শাসন ছিল এই দেশে, যারা আমাদেরকে পেছনে নিয়ে যেতে রাষ্ট্রধর্ম করেছে, ধর্মভিত্তিক দলকে আস্কারা দিয়েছে, সাম্প্রদায়িক বিধিবিধান করেছে সংবিধানে, রাষ্ট্রপরিচালনায়। ২০০৮-এর নির্বাচনের মাধ্যমে এক নতুন যাত্রা শুরু হয়েছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে, অর্থনৈতিক পথে অগ্রসরমান একটি দেশ এখন বাংলাদেশ। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্তরে থাকা মৌলবাদি ও সাম্প্রদায়িক শক্তি যেন আরও প্রবলভাবে চেপে ধরছে দেশকে। এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একটি বড় উপায় মাদ্রাসা শিক্ষাকে দ্রুততার সঙ্গে মূলধারায় নিয়ে আসা।   
অর্থনৈতিক উন্নয়নের আরেকটি বড় চিন্তার দিক দেশের সম্পদ ক্রমেই কিছুসংখ্যক লোকের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ছে। এতে ধনী-গরিব বৈষম্য বাড়ছে। আয়কর ফাঁকি, প্রাকৃতিক সম্পদ দখল, ঋণ পরিশোধ না করা আর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অর্থ আত্মসাত করে একটি শ্রেণি সম্পদের পাহাড় গড়ছে। দারিদ্র্য নিয়ে ভাবতে হলে এদিকটা ভাবতে হবে। সামষ্টিক অর্থনীতির স্বাস্থ্য দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ের অবস্থা বোঝা যায় না। একদিকে দেশজ উৎপাদন বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে বৈষম্য। শহরে বড় বড় শপিংমল গড়ে উঠেছে। আবার জাকাতের শাড়ি-লুঙ্গি নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ানো লোকের সংখ্যাও বাড়ছে। বাড়ছে ধর্ষণ আর নির্যাতিত নারীর সংখ্যাও।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়নসহ মানব বিকাশী কার্যক্রমে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকে সত্যিকার অর্থে ব্রতী করতে পারলে বাংলাদেশের উন্নয়নের সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। সামাজিক অনাচারের দিকে দৃষ্টি না দিলে শুধু আর্থিক অগ্রগতি কোনওভাবেই স্বাধীনতার লভ্যাংশ হিসেবে বিবেচিত হবে না।  
লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টিভি

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ