পৃথিবীর মানুষের অনাগত বিপদ

পৃথিবীর মানুষের অনাগত বিপদ

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী১২:২১, মার্চ ৩১, ২০১৬

Bakhtiar Uddin Chowdhuryগত এক শতাব্দীব্যাপী মানুষের আকাঙ্ক্ষা এতো প্রখর হয়েছে যে মানুষ পৃথিবীটাকে তাদের হাতের মুঠোয় এনে ভোগ করতে চায়। এ কারণে প্রযুক্তির উন্নয়নের প্রয়োজন ছিল, উন্নয়নও হয়েছে লাগামহীনভাবে। এখন উন্নয়নটা মানুষের দুঃশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অস্ত্রের প্রযুক্তির উন্নয়নে এটম বোমা এসেছে। ১৯৪৫ সালে এ এটম বোমাই হিরোসিমা আর নাগাসাকিতে নিক্ষেপ করলো আমেরিকা আর মুহূর্তের মাঝে হাজার হাজার মানুষ মরে সাফ হয়ে গেল। এখনও হিরোসিমা নাগাসাকিতে বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নিচ্ছে।
আইটির উন্নয়ন এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে এসেছে পৌঁছেছে। আর বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় তহবিলের ৮০০ কোটি টাকা আইটির সংঘবদ্ধ ডাকাত দল মুহূর্তের মাঝে ডাকাতি করে নিয়ে গেছে। প্রযুক্তিকে মানুষের উত্তম সেবকের পর্যায়ে রাখতে হবে। একে মানুষের বিপদজনক প্রভুতে পরিণত হওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না। ভোগবাদীরাই প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনে শ্রম, অর্থ, সবই বিনিয়োগ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে অধ্যাপক ভার্দি, যিনি রোবট নিয়ে গবেষণা করে রোবটের চরমতম উৎকর্ষ সাধন করেছেন, তিনি বলেছেন বুদ্ধি মেধা দিয়ে মানুষ যে সব কাজ করতে সক্ষম সে সব কাজ সুনিপুনভাবে রোবটও করতে পারবে। এখন আমেরিকার কারখানাগুলোতে মালিকেরা দুইলক্ষ রোবট কাজে নিয়োগ করেছে। রোবট দাম দিয়ে কিনে এনে কাজে নিয়োগ করা হয়েছে মাসে-মাসে কোনও পারিশ্রমিক পরিশোধ করতে হবে না। অধিক পরিশ্রমের জন্য বাড়তি মজুরিও দাবি করবে না।
ভার্দি বলেছেন- আগামী কয়েক দশকের মধ্যে বিশ্বের অর্ধেক শ্রমিক বেকার হয়ে যাবে কারণ তাদের স্থান অধিকার করে নেবে রোবট। যা মানুষের চেয়ে সুলভ হবে। পৃথিবীর অর্ধেক কর্মক্ষম মানুষ যদি বেকার হয়ে যায় তবে বিশ্বের অর্থনীতি কি বেকারদের চাপের বোঝা বইতে পারবে? বেকার মানুষের অসংলগ্ন আচরণে বিশ্বের শৃংখলা কি বিপর্যস্ত হবে না? পেটের তাড়নায় মানুষতো স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছৃঙ্খল হবে। ভ্যাটিকানের পোপ ফ্রানসিস একখানা বই লিখেছেন পৃথিবীর মানুষের অনাগত বিপদ নিয়ে, যেগুলো মানবজাতিকে বিব্রত করে তুলবে এবং পৃথিবীর মানুষকে দুঃখে কষ্টের মাঝে ঠেলে দেবে। তিনি লিখেছেন, 'যে সমাজে প্রযুক্তিই শ্রমিকের স্থান নিয়ে বহুসংখ্যক মানুষকে জীবিকাচ্যুত করে সে সমাজ ঈশ্বরের অভিপ্রেত নয়।'  তিনি প্রযুক্তির উন্নয়নকে শ্লথগতি করার পরামর্শ দিয়েছেন।
একবার কিছু সংখ্যক গবেষক আমেরিকার প্রেসিডেন্টের কাছে গবেষণার জন্য টাকা চেয়ে একটা প্রকল্প পেশ করেছিলেন। তখন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিল ক্লিনটন। প্রকল্পটা ছিল প্রযুক্তির সাহায্যে মানব ভ্রুণ তৈরি করার প্রকল্প। প্রেসিডেন্ট এই বলে প্রকল্পটা বাতিল করেছিলেন যে, 'ঈশ্বরের কাজে হস্তক্ষেপ করলে ঈশ্বর মানবজাতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন।' ক্লিনটন কাজটা ভালোই করেছিলেন। প্রযুক্তিকে এত বড় বাড়াবাড়িতে টেনে আনা কখনও ভাল হতো না।
ঈশ্বরে অনেকের বিশ্বাস নেই। দার্শনিক রাসেল বলেছেন, তার সাথেতো কখনও দেখা হয়নি। বিশ্বাস করি কীভাবে? কিন্তু জগৎ বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক আইনস্টাইন বলেছেন, লক্ষ্য লক্ষ্য গ্রহ নক্ষত্র যে শৃংঙ্খলার সঙ্গে চলছে সে শৃংঙ্খলাটাকেই তিনি ঈশ্বর বলে ভেবেছেন।
রাসেলের সঙ্গে ঈশ্বরের দেখাও হয়নি বা ঈশ্বরের অস্তিত্ব উপলদ্ধি করার কোনও সুযোগও হয়নি তাই তিনি নাস্তিক আর আইনস্টাইন যে কোনও সুযোগে ঈশ্বরের অস্তিত্ব উপলব্ধি করার সুযোগ পেয়েছেন তাই তিনি আস্তিক।
হিমালয়কে বলা হয় নবীন ভঙ্গিল শ্রেণির পর্বত। হিমালয়ে ভূগঠনের কাজ এখনও শেষ হয়নি। হিমালয় পূর্বে সমুদ্র ছিলো। ভারতীয় প্লেট এবং উত্তর ইউরো- এশিয় প্লেট মুখোমুখি হওয়ায় ও সে কারণে প্রবল চাপের ফলে মধ্যবর্তী শিলাস্তরে ভাজ পড়ে হিমালয়ের জন্ম হয়। হিমালয়ের এখনও কুমারী অবস্থা। উভয় প্লেট এর এডজাস্টমেন্ট চূড়ান্ত হয়নি। ভূতাত্ত্বিকরা বলেন ধীরে ধীরে ভারতীয় পাত ইউরো এশিয়া পাতের নিচে ঢুকছে এবং শিলাস্তরে অসংখ্য বিলমচ্যুতি তৈরি হচ্ছে যে কারণে হিমালয় ভূমিকম্প প্রবল।
ভারতের অরুনাচল রাজ্যে ১২৮টি বে-সরকারিভাবে বাধ নির্মাণ করা হচ্ছে হিমালয়ের কেদারনাথে সব হন্য হয়ে পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য। হিমালয়ের ভূমি, নদী, জলাধার ব্যবহারে কোনও নিয়মনীতি মানা হচ্ছে না। মন্দাকিনী, অলকানন্দা, ভাগীরথি এ নদীগুলোকে নির্বিঘ্ন থাকতে দেয়নি। নদীগুলোকে নিজেদের আয়ত্বে আনতে গিয়ে হিমালয়ের ধসের প্রলয়ে একবার বিধ্বস্ত হয়েছে কেদারনাথ।
আমি হিমালয়ের গঠন প্রণালীর বর্ণনা দিয়েছি। এ বারের ধস কিন্তু বিরাট আকারের হবে এবং প্রলয় হবে মহাযুদ্ধের প্রলয়ের চেয়েও বেশি। যে পর্বত সমুদ্র থেকে উঠেছে সে পর্বত আবার সমুদ্র হতে বাধা কোথায়। ভোগবাদীদের অত্যাচারের রসি টেনে ধরা প্রয়োজন। ভোগের নেশায় উম্মাদ হয়ে আমরা আগামী প্রজন্মের দায়বদ্ধতাকে উপেক্ষা করে চলেছি। প্রকৃতি বিরূপ হলে মানব সভ্যতার দুঃখ কষ্টের সীমা থাকবে না।
জলবায়ু সংকটের কারণে বিশ্ব সবচেয়ে বড় সংকটাপূর্ণ অবস্থার সম্মূখীন হয়েছে, জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে এবং গ্রীন হাউস গ্যাস উৎপাদনের কারণে গরম বাতাস গ্রিনল্যান্ড এবং এন্টারটিকার বরফ গলে যাচ্ছে, এতে সমুদ্রের পানি বেড়ে যাচ্ছে এবং সমুদ্র পৃষ্ঠের উচ্চতাও বেড়ে যাচ্ছে; তাতে করে বিশ্বের এক তৃতীয়াংশ জলমগ্ন হয়ে যাবে। কোটি কোটি মানুষ বাস্তুত্যাগী হয়ে গেলে বিশ্বের অবস্থাটা হবে কী? এই বল্গাহীন লোভ সীমানা ছাড়া উন্নয়ন কারোরই মঙ্গল আসবে না।
বিশ্বনেতৃবৃন্দের উচিৎ বিশ্ববাসীকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য সুচিন্তিত, সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা । লাগামহীনভাবে এরূপ অবস্থা চলতে থাকলে সাধারণ মানুষই হয়ত একদিন সাধারণ মানুষের ত্রাতা হয়ে সব কিছুরই গতিরোধ করে দাঁড়াবে।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ