Vision  ad on bangla Tribune

তনু হত্যায় পুলিশের স্বতঃপ্রণোদিত বিজ্ঞপ্তি

আমীন আল রশীদ১২:৪৮, মার্চ ৩১, ২০১৬

আমীন আল রশীদকুমিল্লার কলেজ শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনু হত্যা বিচারের দাবিতে যখন দেশ উত্তাল, তখন পুলিশের তরফ থেকে একটি স্বপ্রণোদিত বিজ্ঞপ্তি এসেছে; যেখানে বলা হয়েছে, তনু হত্যায় জড়িতদের গ্রেফতারে আন্দোলনের প্রয়োজন নেই।
কোনও কিছুর জন্যই আন্দোলন লাগে না যদি রাষ্ট্র ঠিকমতো চলে। যদি দেশে আইনের শাসন থাকে, যদি পুলিশ সরকারের পেটোয়ো বাহিনী না হয়, যদি আমলারা সৎ হন, যদি রাজনীতিবিদরা জনগণমুখী ও দেশপ্রেমিক হন, যদি সেনাবাহিনী সত্যি সত্যি জনগণের আশা-ভরসার প্রতীক হয়, যদি বিচার বিভাগ স্বাধীন হয়, যদি দেশের গণমাধ্যম চাপমুক্ত থাকে- তাহলে কোনও দাবি আদায়ে আন্দোলন লাগে না।
প্রশ্ন হলো, এই দেশে আন্দোলন আর রক্তপাত ছাড়া কবে কোন দাবি আদায় হয়েছে? মাতৃভাষার অধিকার, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারের পতন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার- এসবকিছুর পেছনেই রয়েছে দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাস। সেখানে তনু হত্যার বিচার দাবিতে তার সহপাঠী, বন্ধুসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ যে রাজপথে নেমেছে, তাতে এখন পর্যন্ত কোথাও কোনও সহিংসতা হয়নি। কোনও জ্বালাও-পোড়াও হয়নি। একটি বাসও ভাংচুর হয়নি। তা সত্ত্বেও পুলিশকে কেন এরকম একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হলো?
দ্বিতীয় প্রশ্ন, সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির হত্যার বিচারের দাবিতেও কয়েক বছর ধরে আন্দোলন চলছে। কখনও তো পুলিশকে এরকম বিবৃতিতে বা বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলতে দেখা যায়নি যে, এই ইস্যুতে আন্দোলনের প্রয়োজন নেই, পুলিশ অপরাধীদের ধরে ফেলবে। তাহলে তনু হত্যার বিচার দাবিতে চলমান আন্দোলনে পুলিশের আপত্তি কেন? বিশেষ কারও স্বার্থ রক্ষা বা কাউকে বাঁচানোর জন্য পুলিশের ওপরেই কি কোনও চাপ আছে?
পুলিশের ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশ বদ্ধপরিকর। কিন্তু হত্যাকাণ্ডে জড়িত আসামিদের গ্রেফতারের জন্য কোনও আন্দোলন বা বিক্ষোভের প্রয়োজন নেই। এটা পুলিশের পেশাগত ও নৈতিক দায়িত্ব।
পুলিশ বলছে, আন্দোলনের নামে রাস্তাঘাটে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ে। পুলিশের অপরাধ দমন এবং উদ্ঘাটনের পেশাগত দায়িত্বও বাধাগ্রস্ত হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, তনু হত্যাকাণ্ড প্রকাশ্যে ঘটেনি। তাই সুস্পষ্ট এবং সুনির্দিষ্ট কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সাক্ষী সংগ্রহ করা সময় সাপেক্ষ বিষয়। নানা বস্তুগত সাক্ষ্য, পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সাক্ষ্য সংগ্রহ করা, বিশ্লেষণ এবং মূল্যায়নের মাধ্যমে এ ধরনের ক্লু-লেস অপরাধে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে চিহ্নিত করা হয়। অনুমানের ভিত্তিতে কোনও ব্যক্তিকে গ্রেফতার করলে সে ক্ষেত্রে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তদন্ত ভুল হলে সবার কাছেই তা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এমনকি প্রকৃত দায়ী ব্যক্তি/ব্যক্তিবর্গ সেই ভুলের দিকে আঙুল তুলে নানা সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন। এতে মামলাটির ন্যায়-বিচার ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। সে জন্য সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে প্রকৃত আসামি চিহ্নিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এগুলো খুবই ভালো কথা এবং সঠিক কথা। কিন্তু অতীতের কোনও আন্দোলনে পুলিশ কেন এরকম বিজ্ঞপ্তি বা বিবৃতি দেয়নি? হঠাৎ কেন তনু হত্যার বিচার দাবিতে চলমান আন্দোলন তাদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ালো? এটি তো যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের তুলনায় অনেক ছোট পরিসরে। অথচ গণজাগরণ মঞ্চের ওই আন্দোলনে খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীই সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দিয়েছে। ওই আন্দোলন হয়েছে খোদ রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র শাহবাগে। দিনের পর দিন ওই এলাকার সড়কের একটি বড় অংশ বন্ধ ছিল। তখন তো সড়কের যানজট নিয়ে পুলিশকে এত উদ্বিগ্ন হতে দেখা যায়নি।

২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় সোহাগী জাহান তনু খুন হওয়ার পর খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একাধিক অনুষ্ঠানে বলেছেন, হত্যারহস্য দ্রুত উদ্ঘাটিত হবে তা প্রকাশ করা হবে। এমনকি তিনি এও বলেছেন, সেনানিবাসের মতো সুরক্ষিত এলাকায় কী করে এরকম একটি ঘটনা ঘটলো, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কিন্তু দ্রুততম সময় বলতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসলে কতদিন বুঝিয়েছে, তা পরিস্কার নয়। যেমন সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যার পরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলে, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে রহস্য উদ্ঘাটন এবং অপরাধীদের গ্রেফতার করা হবে। কিন্তু সেই ৪৮ ঘণ্টা এখনও শেষ হয়নি।

সুতরাং তনু হত্যার রহস্য বা প্রকৃত অপরাধীদের কবে ধরা হবে বা আদৌ তারা ধরা পড়বে কি না কিংবা ধরা পড়লেও সে বিষয় নিয়ে লুকোচুরি হবে কি না- তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট কারণ আছে। আছে বলেই মানুষ রাস্তায় নেমেছে। যারা রাস্তায় নেমেছে তারা কেউ কোনও রাজনৈতিক দলের পয়সা খেয়ে নামেনি। যে সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন সকাল হলেই ক্যাম্পাসে আর রাস্তায় ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে মানববন্ধন করে, তারা বাপের পয়সায় চলে। এর বাইরে যেসব সংগঠনের নেতাকর্মীরা এরসঙ্গে একাত্মতা জানিয়েছেন, তাদের মধ্যে দুয়েকটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে সবাই নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায়। অর্থাৎ কোনও কিছু পাওয়ার বিনিময়ে নয়, বরং একটি অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমেছে।

সুতরাং কোনও রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের যেমন দাবি আদায়ে আন্দোলন করার অধিকার রয়েছে, তেমনি সহপাঠীর খুনের বিচার দাবিতেও শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামার অধিকার রয়েছে। এ ধরনের আন্দোলনে কোনও ধরনের নাশকতা হলে সেটি প্রতিহত করা পুলিশের দায়িত্ব এবং এই আন্দোলনকে কেউ যদি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চায়, সেটিও প্রতিহত করা পুলিশের দায়িত্ব। কিন্তু পুলিশ যদি স্বতঃপ্রণোদিত বিজ্ঞপ্তি জারি করে বলে দেয় যে, অপরাধীদের গ্রেফতারের দাবিতে আন্দোলনের প্রয়োজন নেই, তখন অনেকের মনে নানান প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। 

লেখক: সাংবাদিক ও লেখক।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ