behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

হত্যার আগে ধর্ষণ বনাম তদন্তের ৩০ গজ

হারুন উর রশীদ১৭:০৯, এপ্রিল ০১, ২০১৬

হারুন উর রশীদশিরোনামে পুরো বাক্যটি লিখতে পারিনি। বাক্যটি হবে হত্যার আগে ধর্ষণ অথবা ক্যান্টনমেন্টের বাইরে হত্যার গবেষণা বনাম ৩০ গজের মধ্যে সহজ তদন্ত। বুঝতেই পারছেন সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ড নিয়েই কথা বলছি। আমি বলতে চাইছি, তাকে হত্যার আগে ধর্ষণ, না শুধুই হত্যা করা হয়েছে? তাকে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়ই হত্যা করা হয়েছে, না বাইরে হত্যা করে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় লাশ ফেলে রাখা হয়েছে? এ সব বিতর্কে আমরা কাটিয়ে দিলাম প্রায় দুই সপ্তাহ।
এরই মধ্যে দুবার তদন্তকারী সংস্থা পরিবর্তন করা হয়েছে। কবর থেকে লাশ তুলে আরও একদফা ময়নাতদন্ত হয়েছে। আরও অনেক কিছু হয়তো হবে। অনেক কাজের ফিরিস্তি হবে। কিন্তু যে কাজটি করা প্রয়োজন, সেই অপরাধী শনাক্তের ব্যাপারে লবডঙ্কা। আর আমি ৩০ গজের যে তদন্তের কথা বলছি, আপনাদের কাছে স্পষ্ট করব।
৩০ গজের তদন্ত স্পষ্ট করার আগে বলি, এরপরও আরও যা আপনারা দেখবেন, তাহলো ডিএনএ পরীক্ষা, রাসায়নিক পরীক্ষা, হাতের ছাপ পরীক্ষা, ইত্যাদি। আর এই ডিএনএ সাগর-রুনির মতো পরীক্ষা হতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। তার রিপোর্ট আসতে লাগতে পারে দুই থেকে তিনবছর। এরপর কেউ আদালতে রিট করতে পারেন। নতুনভাবে আরেক দক্ষ সংস্থাকে তদন্ত দেওয়া হতে পারে তদন্তের দায়িত্ব। তদন্তযজ্ঞে কোনও ঘাটতি থাকবে না—এটা আমি নিশ্চিত। কিন্তু তনুর ঘাতকরা আইনের আওতায় আসবেন কিনা—এ নিয়ে আমার সন্দেহ দিনে-দিনে প্রবল হচ্ছে। কারণ মর্নিং শোজ দ্য ডে।
আমি কেন এ রকম কথা বলছি—এই প্রশ্ন হয়তো অনেকেই করতে পারেন। তার জবাবে বলতে চাই, আমি মনে করি তনু হত্যার পর প্রাথমিক তদন্তে যা প্রয়োজন, তা-ই পুলিশ এখন পর্যন্ত করেনি। আর এই প্রাথমিক তদন্ত করা হলে এরইমধ্যে অপরাধীরা চিহ্নিত হতেন বলে আমার ধারণা। কিভাবে তা ব্যাখ্যা করছি।
১.তনু ২০ এপ্রিল  বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে বের হন ছাত্র পড়াতে। তার দুটি বাসায় পড়ানোর কথা এবং দুটি বাসায়ই পড়িয়েছেন।  দুটি বাসাই ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে।

২. তনু প্রথমে সৈনিক জাহিদুর রহমানের বাসায় প্রাইভেট পড়ান। এরপর পাশের  সার্জেন্ট জাহিদ হোসেনের বাসায় পড়াতে যান। সেখান থেকে বের হন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে।

৩. তনুর লাশ পওয়া যায় রাত সাড়ে ১০টার দিকে। ক্যান্টনমেন্টের মধ্যে পাওয়ার হাউস এলাকায় ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের তিনশ' থেকে চারশ' গজ দক্ষিণে টাঙ্কিসংলগ্ন রাস্তার কালভার্টের পশ্চিম দিকে ২০ থেকে ৩০ গজ দূরে জঙ্গল বা ঝোপে। আর স্যান্ডেল পাওয়া যায় ব্রিজের নিচে।

৪. তনুর বাসা, টিউশনির বাসা এবং মৃতদেহ যেখানে পাওয়া গেছে—এই স্পটগুলো এক বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে।

এই তথ্য দিয়ে কী পাওয়া সম্ভব, তার ব্যাখ্যা দিচ্ছি এবার।

তনু সর্বশেষ টিউশনির বাসা থেকে বের হন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়। আর মৃতদেহ পাওয়া যায় রাত সাড়ে ১০টায়। এর মাঝখানে মোট সময় তিন ঘণ্টা। তবে ঘটনার সময় আরও কম হতে পারে। কারণ তনুকে হত্যার পরপরইতো আর লাশ পাওয়া যায়নি।

ক্যান্টমমেন্ট এলাকায় চেকপোস্ট আছে। আর প্রতিটি চেকেপোস্টেই নিয়ম অনুযায়ী নিরাপত্তা ডিউটি থাকার কথা। ষেখানে নিরাপত্তা টহলেরও ব্যবস্থা আছে। অবস্থানগত কারণে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ভেতর দিয়ে কয়েকটি গ্রামের লোক চলাচলের সুযোগ পান। তবে তার জন্য বিশেষ অনুমতির ব্যবস্থা আছে। এরসঙ্গে সৈনিক জাহিদুর রহমান এবং সার্জেন্ট জাহিদ হোসেনের বাসার লোকজনকেও বিবেচনায় নেওয়া যাক।

পুলিশের প্রথম কাজ হলো সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা থেকে শুরু করে রাত ১০টা পর্যন্ত কুমিল্লা ক্যান্টমেন্টের চেকপোস্ট এবং টহল দলের ডিউটি রোস্টার হাতে নেওয়া। আর সেই রোস্টার ধরে প্রয়োজন অনুযায়ী তথ্যের জন্য দায়িত্বরতদের সঙ্গে কথা বলা। তাহলে ওই তিনঘণ্টায় ক্যান্টনমেন্টে কারা ঢুকেছেন বা বের হয়েছেন তার একটা তালিকা পাওয়া যাবে। আবার এই তালিকা এন্ট্রি-এক্সিট রেজিস্ট্রারেও থাকার কথা। আর তনুও যদি ক্যান্টমেন্টের বাইরে গিয়ে থাকেন, গেটে তার রেকর্ড থাকার কথা। অথবা গেটে  যারা দায়িত্বে ছিলেন তারাও বলতে পারবেন।

তনুর লাশ যেখানে পাওয়া যায়, তার পাশেই  দুটি চারতলা ভবন আছে। তনুর বাবা ইয়ার হোসেন বলেছেন, তিনি ভবনের পাশ থেকে তিনজনকে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখেছেন। তনুর বাবার ভাষ্যমতে একজন জওয়ান তাকে তখন বলেছেন, ওই তিনজন এখানকারই।

ওপরের পদ্ধতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের জবানবন্দি নিলে ওই তিনজনকে অথবা অপরাধীদের শনাক্ত করা খুবই সহজ।

অপরাধ বিজ্ঞান মনে করে, ঘটনাস্থলের আশেপাশেই কমপক্ষে ৭০ ভাগ আলামত, সাক্ষ্য পাওয়া যায়। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, তনুর লাশ যেখানে পাওয়া যায়, সেটা হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল কি না? সেই প্রশ্ন তোলার আগে একটি কথা সহজেই বলা যায় যে, এটা নিয়ে তো কোনও সন্দেহ নেই যে, লাশ পাওয়ার ঘটনাস্থল ওই জায়গাটিই। আর তাই যদি হয় এই জায়গাটিকে ঘটনাস্থল ধরেই তদন্ত এগিয়ে নেওয়া তদন্তের সাধারণ নিয়ম। কিন্তু তা করা হচ্ছে না। এরপরও কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে আমার মনে হয়, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া যায়।

প্রশ্ন-১: যদি ধরে নেই যে, বাইরে হত্যাকাণ্ড হয়েছে অথবা বাইরের লোক ঘটিয়েছেন, তাহলে অপরাধারীরা ক্যান্টনমেন্টের মতো সংরক্ষিত এলাকায় কেন বাইরে থেকে লাশ আনার ঝুঁকি নেবেন?

প্রশ্ন-২ বাইরে থেকে ক্যান্টমেন্টে লাশ নিয়ে আসা কি সহজ? আর লাশতো হেঁটে আসে না, কয়েকজন মিলে নিয়ে আসবেন। প্রশ্ন হলো তাহলে লাশ কি গাড়িতে করে আনা হয়েছে না কাঁধে করে?  লাশ ফেলে রাখার জন্য এতবড় ঝুঁকি কি কোনও অপরাধী নেবেন?

প্রশ্ন-৩: সাধারণত লাশ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নেওয়া হয় গুম করার জন্য। কিন্তু তনুর লাশ গুমের কোনও আলামত কি আছে?

প্রশ্ন-৪: যদি গুমের কোনও অভিপ্রায় অপরাধীর না থাকে, তাহলে এক জয়গা থেকে আরেক জায়গায় লাশ নেওয়ার যে সময়, সেই সময় লাশের সঙ্গে থাকার ঝুঁকি কোনও অপরাধী কেন নেবেন?

এবার আরও কিছু তথ্য বিশ্লেষণ করি।

তনুর লাশের সঙ্গে যেসব আলামত পাওয়া গেছে তার মধ্যে আছে বাম পায়ের জুতা, যার একটি ফিতা ছেঁড়া ছিল। দুটি মোবাইল হ্যান্ডসেট, যার একটি সিম্ফনি ভি-৬০ মডেল এবং অন্যটি ওয়ালটন ব্র্যান্ডের মডেল এমএইচ-৯। মেয়েদের ব্যবহৃত একটি ছোট হাতব্যাগ, মাথার এক গোছা চুল ও দুই টুকরো খাকি হলুদ রঙের রানিং টেপ, যার আনুমানিক দৈর্ঘ্য ৫ ও ১০ ফুট। কুমিল্লা সেনানিবাসের ৪ এমপি ইউনিটের সার্জেন্ট মো. মহসীন লাশের সঙ্গে থাকা এই মালপত্র তালিকাসহ পুলিশকে দিয়েছেন।

আলামতের এই জব্দ তালিকা অনেক প্রশ্নেরই জবাব দিচ্ছে। সেই জবাব আর ওপরের প্রশ্নের জবাব মেলালে তনু হত্যার ঘটনাস্থল এবং বাইরের না ভেতরের লোক সে ব্যাপারে  নিশ্চিত হওয়া যায়। আমি আরও কয়েকটি প্রশ্নের মাধ্যমে তার ইঙ্গিত দিচ্ছি।

এক. আলামতের মধ্যে তনুর ফোন, ব্যাগ, স্যান্ডেল আছে। আছে তার চুল। বাইরে ঘটনা ঘটিয়ে লাশের সঙ্গে এ সব আলামত কি অপরাধীরা এখানে নিয়ে আসবেন? না যত দ্রুত সম্ভব লাশটি নিয়ে আসবেন? আর এগুলো নিয়ে আসলে অপরাধীদের কী লাভ?

দুই. হত্যাকাণ্ডের পর লাশ নিয়ে এলে এত নিখুঁতভাবে আলামতও কি নিয়ে আসা সম্ভব? আর লাশ বাইরে থেকে আনলে তা তো কোনও বস্তা বা কাপড়ে মুড়ে  আনা সহজ। অপরাধীরা সে কাজটি কেন করলেন না?

তিন. অপরাধীদের এই আসা যাওয়া কি এতই সহজ ক্যন্টনমেন্ট এলাকায়?

তাহলে এটা কি আমরা বলতে পারি, পরবর্তী কোনও প্রমাণ না পওয়া পর্যন্ত ক্যান্টনমেন্টর যেখানে তনুর লাশ পাওয়া গেছে, সেটিই হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল? তনুর বাবা ইয়ার আহমেদ কিন্তু তাই মনে করেন। তিনি বলেছেন,  ‘আমার মেয়েকে ওই জায়গাই হত্যা করা হয়েছে।’ আরও বলেছেন, ‘বাইরে থেকে লোক আসবে কিভাবে? যা ঘটেছে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায়ই ঘটেছে।’

একটি কথা বলা হচ্ছে, যেখানে তনুর লাশ পাওয়া যায়, তার ১০ গজ দুরেই ক্যান্টনমেন্টের শেষ সীমনা। আর সেখানে সীমানা প্রাচীর নেই। তবে সেখানে এখন কাঁটাতারের বেড়া তৈরি হচ্ছে। কিন্তু ওই জায়গায় কোনও রাস্তও নেই যে, সহজেই অপরাধীরা সেখানে যাবেন। তারাই ওই জায়গাকে বেছে নেওয়ার কথা, যাদের ওই জায়গাটি সম্পর্কে ভালো ধারণা আছে। যারা ওই জায়গাটি সম্পর্কে ভালো জানেন। ওই জায়গাটি বেশ ঘন ঝোপঝাড়ে পরিপূর্ণ। এমন জায়গা সম্পর্কে কাদের ভালো ধারণা থাকবে, বাইরের লোকের? ওই এলাকায় যে সিসি ক্যামেরা ছিল না, তাও কি বাইরের লোকের জানার কথা?

ঘটনাস্থল পরিদর্শনকারী তিনজন সাংবাদিক আমাকে জানিয়েছেন, ‘ওই জায়গায় হত্যাকাণ্ড বা ধর্ষণের মতো অপরাধ বেশ সহজ। কারণ, ঘনবনের কারণে আশপাশ থেকে দেখা যায় না। আর তনুর একটি স্যান্ডেল তার বাবা প্রথম যে কালভার্টের নিচে পান, সেখান থেকে ওই জঙ্গলের দূরত্ব ৩০ গজের মতো। ৩০ গজ দূরেই চলাচলের রাস্তা।’

কালভার্ট থেকে জঙ্গল । রাস্তা থেকে ঝোপ। ৩০ গজের দূরত্ব। তনুর একটি স্যান্ডেল ওই রাস্তার কালভার্টের নিচে। আর লাশ ৩০ গজ দূরে জঙ্গলে। সবকিছু পাওয়া যায় এই ৩০ গজের মধ্যে। কিন্তু অপরাধী পাওয়া যায় না। কেন?  কারণ তদন্ত ৩০ গজ থেকে বেরিয়ে দূরে আরও বহু দূরে চলে যাচ্ছে। ৩০ গজ জায়গাকে বলতে গেলে তদন্তের বাইরে রাখা হয়েছে।

এরইমধ্যে তনুর লাশ যেখানে পাওয়া গেছে সেই জায়গার ঘাস-গাছ কেটে পরিষ্কার করা হয়েছে। যা আলামত নষ্টের মতো কাজ বলে জানিয়েছেন মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান। আর শুরুতেই সুরতহাল রিপোর্ট এবং ময়নাতদন্ত ছিল ত্রটিপূর্ণ। তদন্তের ৩০ গজের মধ্যে না আসলে ত্রুটি  অবহেলা আরও বাড়বে। অনেক কথা হবে। দেশ বিদেশ হবে। ডিএনএ হবে। কিন্তু তাতে একটি সহজ তদন্ত আরও জটিল হবে। একদিন হয়তো জটিল ও কঠিন মামলা হিসেবে হিমাগারে চলে যাবে।

লেখক: সাংবাদিক

ইমেইল: swapansg@yahoo.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ