‘দেখানোর’ দরকারে তোলা হয় লাশ!

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১৩:২৮, এপ্রিল ০৩, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩০, এপ্রিল ০৩, ২০১৬

Udisa Islamসংবেদনশীল মামলায় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন গ্রহণযোগ্য না হলে পুনরায় ময়নাতদন্তের জন্য কবর থেকে লাশ তোলা আমাদের দেশে নতুন না। জরুরি ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে চলেছে এটা যখন ‘দেখানোর’ দরকার হয়েছে এবং যখনই কোনও ধর্ষণ বা হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে রাজপথে ঝড় উঠেছে তখনই এই ‘দেখানোটা’ জরুরি হয়ে গেছে। আবার এই একই অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, সংবেদনশীল ঘটনায় যেনতেনভাবে একটা ময়নাতদন্ত করে লাশ দাফনে মনোযোগ থাকে বেশি।
তবে দ্বিতীয়বার লাশ তুলে খুব বেশি কিছু করা যায়নি সে উদাহরণও আমাদের সামনে আছে। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের মামলায় একাধিকবার লাশ তুলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দেখা গেছে। গত চার বছরে এমন কিছু বের হয়ে আসেনি যা উল্লেখ করা যায়। তাহলে কি এবার সোহাগী জাহান তনুর ক্ষেত্রেও এমনটা হবে? তাহলে প্রথম যে প্রশ্নটি আসে- কেবল সংবেদনশীল মামলায়ই কি এমন হয়?
তনু ধর্ষণ ও হত্যা মামলা নিয়ে শুরু থেকেই তোলপাড় চলছে। কুমিল্লা সেনানিবাসের মধ্যে তনুর লাশ পাওয়ার পর কিসের ভিত্তিতে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছে বলা হলো, আর কিসের ভিত্তিতেইবা তাকে ধর্ষণ করা হয়নি সন্দেহ করা হলো, আর কোন বিষয়টা আবিষ্কারের জন্য লাশ আবারও কবর থেকে তোলার অনুমতি চাওয়া হলো এবং তোলা হলো, সেসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের কাছে নেই। পুনরায় লাশ তোলার পরই এসপি সাহেব বলে বসলেন, তনু ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন বলে তার ধারণা। এই ধারণা দিয়ে আমরা কী করবো?
কোনও মামলার যখন সুরাহা সম্ভব হয় না, তখন বারবারই দায়িত্বশীল চেয়ারে বসা মানুষগুলোকে বলতে শুনেছি- পৃথিবীতে এমন কিছু মামলা থাকে যেগুলো সমাধান করা যায় না। না-ই যেতে পারে। কিন্তু অপরাধবিজ্ঞানীরাই মনে করছেন, ময়নাতদন্তের পরপরই আবারও কবর থেকে লাশ তোলা কখনও কখনও প্রয়োজন হলেও আমাদের দেশে এটি কখনও কখনও ‘লোক দেখানো’। যে মামলা সুরাহা করা যাচ্ছে না, বা সুরাহা করতে আগ্রহ নেই কিন্তু একটা জন-আগ্রহ তৈরি হয়েছে, সেইসব মামলার ক্ষেত্রে ‘কাজ চলছে’ বোঝানোর অন্যতম উদ্যোগ হলো লাশ কবর থেকে তোলা। সোহাগী জাহান তনুর বেলাও কি তাই হলো?

মামলার তদন্ত যখন দশ দিনেই এ হাত সে হাত ঘুরছে, তখন মনে প্রশ্ন দানা বাঁধা স্বাভাবিক। পুলিশ-র‌্যাব-ডিবি হয়ে সিআইডি। হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহে কোনও সুরাহা না হওয়ায় তনুর লাশ কবর থেকে তুলে পুনরায় ময়নাতদন্তের নির্দেশ দেন কুমিল্লার আদালত। তনু ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে ময়নাতদন্তকারী কীভাবে তার আলামত ফেলে দিতে পারেন। এবার এই জায়গা থেকে একে একে যে প্রশ্নগুলো আপনার মনে আসছে সেগুলোই করে যাই- কেন কবর থেকে লাশ তোলা হলো? তাহলে কি ধর্ষণের আলামত আগের প্রতিবেদনে মেলেনি? যদি না মিলে থাকে, তাহলে তনুর লাশ পাওয়ার পরই ধর্ষণ ঘটেছে বলে যে নানারকমের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল সেগুলোর সোর্স কী? দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের আগে কেন আগের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে না? আর যদি আগের প্রতিবেদনে ধর্ষণ ঘটার পরও তা উল্লেখ না করা হয়- তাহলে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বিচার হবে না কেন? লাশ বারবার তোলা হলে আলামত কি বদলে যাবে?

ময়নাতদন্ত বিষয়ে পারদর্শী এক চিকিৎসকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) আমাদের দেশে হত্যাকাণ্ডগুলোর সঙ্গে রাজনীতি এমনভাবে জড়িয়ে পড়ে, ফলে সংবেদনশীল মামলায় সবাই মিলে সামলাতে গিয়ে এ ধরনের দৃশ্যমান কাজগুলো জরুরি হয়ে পড়ে। ভাবটা এমন যে জোর দিয়ে তদন্ত চলছে, গুরুত্ব বুঝে আমরা লাশ আবার তুলে ভালো করে ময়নাতদন্ত করবো- এসব দেখানোটাও কোনও কোনও সময় জরুরি। আর সেজন্যই এসব বিষয় সামনে আনা। তা না হলে, এভাবে সেনানিবাস এলাকায় জঙ্গলের মধ্যে পাওয়া একটি মেয়ের লাশের ক্ষেত্রে যা যা বিষয় পরীক্ষার আওতায় আসার কথা তা না আসার কোনও কারণ নেই।

তিনি এও মনে করেন, এই ‘দেখানোর’ বিষয় ঘটাতে গিয়ে সার্বিক যে ক্ষতিটা হয়, মানুষ ময়নাতদন্ত বিষয়টাকেই অবিশ্বাস করতে শুরু করে। এটার নেতিবাচক দিকই বেশি।

তবুও বদলে যেতেই দেখা যায়। দ্বিতীয় দফায় করা ময়না তদন্তে তনুর হাতে, পায়ে, নাকে ও গলার পেছনে আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ভয় হয়, এই কথাও পরে স্বীকার করবেন কিনা তারা। নাকি ভিন্ন কোনও সুর পাওয়া যাবে আগামীতে। তনুর মামলায় সুরতহাল প্রতিবেদন, প্রথম দফা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং দ্বিতীয় দফা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের পুঙ্খানুপুঙ্খ উপস্থাপন এখন জরুরি। জরুরি এইজন্য যে, অনেক তথ্য যাচাই না করেই নানাভাবে হাজির করা হয়েছে, ধর্ষক ও হত্যাকারীদের কুলকিনারা না করতে পেরে দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে উল্টো তনুর পরিবারের সদস্যদেরই। এই বিষয়টির সুরাহা তখনই হবে যখন সামনের পদক্ষেপগুলো স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করা হবে।

বাংলাদেশের অপরাধবিজ্ঞানীরা বলছেন, বনের মধ্যে এক নারীর লাশ পাওয়া গেলে কী কী আলামত সংগ্রহ করা দরকার তা যিনি ময়নাতদন্ত করেন তিনি জানেন, সেটা সংগ্রহ না করার কোনও কারণ নেই। তাকে পুনরায় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রতিবেদন দিতে বললেই হয়। ১০ দিনের ভেতর আবারও লাশ উত্তোলনটা দৃষ্টিকটুও বটে।

তনু হত্যা মামলাটি সর্বশেষ মঙ্গলবার পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি) স্থানান্তর করা হয়েছে। গত শনিবার (২ এপ্রিল) তারাও এই পরিবারকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। আরও একবার যদি তোলা লাগে তনুর নিথর দেহ, সাক্ষ্য দেবে সেই। তবু এই পরিবারকে রক্ষা করুন। মেয়ে হারানোর শোক করার সুযোগও আমরা দিতে পারিনি ওদের।

লেখক: সিনিয়র রিপোর্টার, বাংলা ট্রিবিউন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ