বেফাঁস কথা বলা বন্ধ হবে কি?

বেফাঁস কথা বলা বন্ধ হবে কি?

Send
বিভুরঞ্জন সরকার১২:২৯, এপ্রিল ০৫, ২০১৬

বিভুরঞ্জন সরকারআদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন মন্ত্রিসভার দুইজন সদস্য- খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহার নেতৃত্বেধীন আপিল বিভাগের আট বিচারপতির বেঞ্চে গত ২৭ মার্চ দুই মন্ত্রীকে ৫০ হাজার টাকার অর্থদণ্ড অনাদায়ে সাত দিন করে কারাদণ্ডের নির্দেশ দিয়েছেন। দুই মন্ত্রী এর মধ্যেই আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতাল ও লিভার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশে জরিমানার অর্থ জমা দিয়েছেন। কাজেই জেলের বিষয়টি আর থাকছে না।
এই রায় ঘোষণার পর থেকে মন্ত্রিসভায় এ দুইজনের থাকা- না থাকার আইনি এবং নীতি-নৈতিকতার বিষয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক শুরু হয়েছে। আইনে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান না থাকলেও নৈতিকতার প্রশ্নে দুই মন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত বলে আইনঅভিজ্ঞ অনেকেই মনে করেছেন। আদালতে দণ্ডিত হওয়ার পর এই দুই জন আর মন্ত্রিসভায় থাকবেন না, হয় তারা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করবেন, না হয় প্রধানমন্ত্রী তাদের অব্যাহতি দেবেন- এমন ধারণা বিভিন্ন মহল থেকে করা হলেও বাস্তবে- এর কোনওটাই হয়নি। দণ্ডিত দুই মন্ত্রীই জানিয়েছেন, তারা পদত্যাগ করবেন না। আবার প্রধানমন্ত্রী তাদের ব্যাপারে ‘অসন্তুষ্ট’ হলেও এখনই মন্ত্রিসভা থেকে তাদের বাদও দিচ্ছেন না। প্রধানমন্ত্রী হয়তো, আরেকটু সময় নেবেন, দেখতে চাইবেন- পানি কোন দিকে গড়ায় অথবা দুই মন্ত্রীর অতিরিক্ত ও বেফাঁস কথা বলার ‘বদহেবিট’ বদলায় কি-না।
যে কোনও বিবেচনাতেই উচ্চ আদালতের এই রায় যুগান্তকারী এবং নজিরবিহীন। আমাদের দেশে আদালত অবমাননার দায়ে সরকারের দুইজন মন্ত্রীকে দণ্ড দেওয়ার ঘটনা আগে ঘটেনি, যদিও আদালত সম্পর্কে অবমাননাকর কথা বলার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। আমাদের দেশে আদালত এবং বিচারপতিদের সম্পর্কে ‘লুজটক’ করা কারও কারও অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। বিরোধী দল, বিশেষত বিএনপির পক্ষ থেকে এই কাজটি বেশি করা হয়। তবে ইদানিং যারা সরকারে আছেন, তারাও এ ব্যাপারে পিছিয়ে থাকছেন না। সব ক্ষেত্রেই যেমন প্রতিযোগিতা, এ ক্ষেত্রেও তাই। বাক-প্রতিযোগিতায়ও কেউ পিছিয়ে থাকতে চান না। দুই মন্ত্রীকে শাস্তি দেওয়ার পর এবার এক্ষেত্রে সবারই সাবধান হওয়ার পালা। কিন্তু তা হবে কি?
প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা আদালতে বলেছেন, ‘আমরা সব বিচারক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করেছি। জনকণ্ঠের প্রতিবেদনে যাদের নাম এসেছে, তাদের সবাইকে আমরা ইচ্ছা করে প্রসিকিউট করিনি। আমরা আদালত অবমাননা নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে চাই না। শুধু দু’জন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে প্রসিডিংস ড্র করেছি সারা জাতিকে একটা বার্তা দেওয়ার জন্য। ভবিষ্যতে যেন কেউ এ ধরনের অবমাননার পুনরাবৃত্তি না করেন। তারা দেখুক, আমরা কতটা কঠোর হতে পারি।’
আদালতের এ কঠোরতার প্রয়োজন ছিল। বিরোধী দলের কোনও নেতানেত্রীর বিরুদ্ধে প্রথমেই এমন ‘কঠোর’ হলে নানা প্রশ্ন উঠতো। এমনও হয়তো বলা হতো যে, সরকারের ইচ্ছাপূরণের জন্যই বিরোধী দলের ওপর এমন আইনি হামলা! কিন্তু মন্ত্রিসভার দুইজন অত্যন্ত সক্রিয় সদস্যকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে আদালত আবারও প্রমাণ করেছেন তারা স্বাধীন এবং কারও বিরুদ্ধে ন্যায়ানুগ ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করেন না।
উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, গত ৫ মার্চ একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির আদেশ পাওয়া মীর কাসেম আলীর আপিল মামলা পুনঃশুনানির দাবি জানিয়ে ওই শুনানিতে প্রধানবিচারপতি ও অ্যাটর্নি জেনারেলকে অংশ না নেওয়ারও পরামর্শ দেন। একই অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ বিচারকমন্ত্রী মোজাম্মেল হকও প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে বেশ কিছু মন্তব্য করেন। ওই গোলটেবিল আলোচনায় অংশগ্রহণকারী সবার নাম ও তাদের দেওয়া বক্তব্য পরদিন (৬ মার্চ) দৈনিক জনকণ্ঠে বিস্তারিত প্রকাশ পায়। জনকণ্ঠের ওই প্রতিবেদনের সূত্র ধরেই ৮ মার্চ দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল দেন আদালত। দুই মন্ত্রীকে আদালতে হাজির হয়ে বক্তব্য প্রদানের নির্দেশও দেওয়া হয়।
আদালতের এই নির্দেশ চ্যালেঞ্জ না করে প্রথম সুযোগেই দুই মন্ত্রী আদালতের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। মন্ত্রীদের এই বক্তব্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও খুব ভালোভাবে নেননি বলেই জানা যায়। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, কাসেম আলীর মামলার বিষয়ে সুপ্রিমকোর্ট ও প্রধান বিচারপতি সম্পর্কে দুই মন্ত্রী যে উক্তি করেছেন, সেটা তার সরকারের নয়। প্রধানমন্ত্রীর এই মনোভাবই সম্ভবত দুই মন্ত্রীকে এ নিয়ে আর বাড়াবাড়ি না করতে প্রভাবিত করেছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যকর করার ব্যাপারে রাজনৈতিক চাপ রাখার কৌশল সরকার ও সরকারি দলের থাকলেও দুই মন্ত্রীর ভূমিকা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য হয়নি। সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ওবায়দুল কাদের জানিয়েছেন, ‘আমাদের সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিষয়টি ভালোভাবে নেওয়া হয়নি; এটা হলো সত্য কথা। কারণ দেশের প্রধান বিচারপতি একটি প্রতিষ্ঠান। তার ব্যাপারে ঢালাও মন্তব্য করা সঙ্গত নয়, সমীচীনও নয়।’
দুই মন্ত্রীকে দণ্ড দিয়ে আপিল বিভাগ আদেশে বলেছেন, ‘দুই মন্ত্রী নিঃশর্ত ক্ষমা ও অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়ে যে আবেদন করেছেন, তা গ্রহণ করতে আমরা অপারগ। আবেদনকারী মন্ত্রী, সাংবিধানিক পদধারী। তারা সংবিধান রক্ষায় শপথবদ্ধ। প্রধান বিচারপতি ও সর্বোচ্চ আদালতকে অবমাননা করে তারা যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা আমাদের কাছে উদ্দেশ্যমূলক মনে হয়েছে। যদি তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে যেকোনও ব্যক্তি বিচার বিভাগ সম্পর্কে একই রকম অবমাননাকর বক্তব্য দেবেন। এ জন্য তাদের গুরুতর আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হলো। তবে প্রথম সুযোগেই তারা নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ায় সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে উদারতা দেখানো হয়েছে।’
জানা গেছে, আদালত অবমাননার মামলার সর্বোচ্চ শাস্তি এক লাখ টাকা জরিমানা ও এক বছরের কারাদণ্ড।
এখন প্রশ্ন উঠেছে, দণ্ডিত অপরাধী কোনও ব্যক্তির মন্ত্রিসভায় থাকা উচিত কিনা। কেউ বলেছেন, সাজাপ্রাপ্ত কোনও ব্যক্তি মন্ত্রিসভায় থাকতে পারেন না। এ জন্য আইনের প্রয়োজন নেই। বিষয়টি শোভন নয়। শুধু আইন নয়, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি দেখতে হবে। তবে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি মন্ত্রিসভায় থাকতে পারবেন কিনা সে বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেলারেল অ্যাডভোকেট মাহবুব আলম বলেছেন, ‘সংবিধানে এ নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলা আছে বলে আমার মনে হয় না। তবে এর সঙ্গে নৈতিকতার প্রশ্ন জড়িত। মন্ত্রিসভা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।’
সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ মনে করেন, আদালত অবমাননায় সাজাপ্রাপ্ত দুই মন্ত্রীর পদে থাকতে কোনও বাধা নেই। সংবিধানের ৫৮ অনুচ্ছেদ অনুসারে মন্ত্রিত্ব পাওয়ার বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর ওপর নির্ভর করে। ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে একজন সংসদ সদস্য তার পদ হারাবেন যদি তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনও ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। দুই মন্ত্রীর বিষয়ে ৬৬ অনুচ্ছেদ প্রযোজ্য নয়। কারণ তারা নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে দণ্ডিত হননি। এটা নৈতিকতার বিষয় নয়, আদালত অবমাননা।
আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বলেছেন, ‘আদালত নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যে মন্ত্রীদের শপথ ভঙ্গ হয়নি।’ কিন্তু রুলের শুনানির সময় দুই মন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে প্রধানবিচারপতি বলেছেন, ‘সংবিধান লংঘন করেছেন। সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়ে তা ভঙ্গের পরিণতি কী হবে?’ আবার ২৭ মার্চ রায়ের যে সংক্ষিপ্ত আদেশ দেওয়া হয় তাতে এ ব্যাপারে কিছু বলা হয়নি। এখন পূর্ণাঙ্গ রায়ে যদি শপথ ভঙ্গের কথা বলা হয়, তাহলে এই দুই মন্ত্রী কি মন্ত্রিত্ব বজায় রাখতে পারবেন? আইনমন্ত্রী আনিসুল হক অবশ্য এটাও বলেছেন যে, ‘একটি আইনগত, অন্যটি নৈতিক। নৈতিক বিষয়টি যার যার নিজের। এটা নিয়ে কিছু বলার নেই। এটা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিবেচনার ব্যাপার।’
২০১২ সালর এপ্রিল মাসে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানী আদালত অবমাননার দায়ে ৩৭ সেকেন্ডের জন্য আদালত কক্ষে দণ্ড ভোগ করেছিলেন। তার আপিল করার সুযোগ ছিল। তিনি তা করেননি। স্পিকার রুলিং দিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ করার কোনও দরকার নেই। পরে স্পিকারের রুলিং নাকচ করে আদালত রায় দেন, আপিল না করার কারণে আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করার দিনই প্রধানমন্ত্রীর পদ শূন্য হয়ে গেছে। গিলানী পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন।

পাকিস্তান কোনও আদর্শ রাষ্ট্র নয়। তারপরও আদালতের কর্তৃত্ব অস্বীকার করার ক্ষমতা সেখানেও কেউ দেখায় না।    
আমাদের দেশের কোনও মন্ত্রী নিজ বিবেচনা থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেবেন- সেটা আশা করা যায় না। যেখানে পদ পাওয়ার জন্য কামড়া-কামড়ি চলে, সেখানে পদ ছাড়ার প্রশ্ন এলে স্বেচ্ছায় ছাড়তে চাইবেন কে? এবার পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে যে মনোনয়ন বাণিজ্য হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে তা যদি সত্যি হয় তাহলে ভবিষ্যতে কাউকে কোনও পদ থেকে সারাতে গেলে তো খুনোখুনি কাণ্ড বেধে যাবে! আমাদের দুই মন্ত্রী পদত্যাগ করেননি, স্বেচ্ছায় করবেন বলেও মনে হয় না। প্রধানমন্ত্রীও তাদের ব্যাপারে হয়তো মনস্থির করেননি। তবে শোনা যাচ্ছে, দুই মন্ত্রীর ক্ষমতার খুঁটি নড়বড়ে হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রীর অপছন্দের তালিকার তাদের নাম উঠেছে। এখনই কোনও ব্যবস্থা না নিলেও যে কোনও সময় সেটা নেওয়া হতে পারে। তাদের ভাগ্য এখন দড়ির ওপর ঝুলছে।
মন্ত্রিসভার কোনও কোনও সদস্যের বেফাঁস মন্তব্য কিংবা অপ্রয়োজনে অহেতুক বেশি কথা বলার কারণে সরকারকে অনেক সময়ই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। সরকারের সুনাম বৃদ্ধিতে যাদের অবদান নেই, যারা বারবার বিতর্কের জন্ম দেন, মানুষের কাছে সরকারের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ করেন, যাদের কারণে সরকারের জনপ্রিয়তায় টান পড়ে তাদের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকেও নির্মোহ হতে হবে। দুই মন্ত্রীর সাজা হওয়ার পর অন্যদের মধ্যে শুভবুদ্ধির উদয় হয় কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ