behind the news
Rehab ad on bangla tribune
Vision Refrigerator ad on bangla Tribune

বিপর্যয় এড়ানো কঠিন মমতার

আনিস আলমগীর১৩:১৪, এপ্রিল ০৫, ২০১৬

Anis Alamgirতৃতীয় বিশ্বে ভারত একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। নেহরু ১৯৪৭ সাল থেকে দীর্ঘ ১৭ বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। গণতন্ত্র ভারতে শিকড় গেড়েছে নেহরু’র সযত্ন জলসিঞ্চনে।নরেন্দ্র মোদি ১২ বছর গুজরাট রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রী ছিলেন। গত দু’বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী। গত ডিসেম্বর মাসে গুজরাট রাজ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়েছে, নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি স্থানীয় নির্বাচনে পূর্বের তুলনায় খারাপ ফল করেছে। যেখানে কংগ্রেস খুবই খারাপ অবস্থায় ছিল, এখন কংগ্রেসের অবস্থা খুবই ভালো। ৩১ জেলা পরিষদের মাঝে কংগ্রেস পেয়েছে ২৪টি, বিজেপি পেয়েছে ৭টি। আর ২৩০টি তালুক পঞ্চায়েতের মাঝে কংগ্রেস পেয়েছে ১৩২টি,বিজেপি পেয়েছে ১০৮টি। ভোটে কোনও কারচুপি হয়নি, ব্যালট বাক্স ছিনতাই হয়নি বা ব্যালটে সিল মারারও কোনও উদ্যোগ কোনও দলের ছিল না। কারও বিরুদ্ধে ভোটে দুর্নীতি করার অভিযোগও নেই।
ভারতে ভোটের এ পবিত্রতা সযত্নে রক্ষা করার চেষ্টা করেছে সব দল। বিজেপি এবং কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন অবস্থায় হউক, আর ক্ষমতার বাইরে হউক কখনও কোনও ভোট কারচুপির অভিযোগ উত্থাপিত হয়নি।এলাহাবাদ হাইকোর্ট একবার ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচন বাতিল করেছিলেন। কারণ, ইন্দিরা গান্ধী সাধারণ নির্বাচনের সময় তার নির্বাচনী কেন্দ্র রায়বেরেলিতে যে জনসভা করেছিলেন, তাতে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েছিলেন সরকারের বিদ্যুৎ খুঁটি থেকে।যার কোনও অনুমতিও নেননি,কোনও বিলও পরিশোধ করেননি। অথচ ইন্দিরা গান্ধী তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
ভারতের গণতন্ত্রকে নিরঙ্কুশ করতে কেউ কারও মুখের দিকে তাকাননি।তারা ছিলেন ওয়াচডগ অব ডেমোক্রেসি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে লক্ষ্য করা গেছে যে,পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭৭ সালে কংগ্রেস সরকারের পতনের পর গণতন্ত্রের চর্চা আর কখনও নিষ্কলুষ ছিলো না।বামজোট দীর্ঘ ৩৩ বছর আর তৃণমূল কংগ্রেস গত পাঁচ বছর শুধু গণতন্ত্রের কফিনে পেরেকের পর পেরেক মেরেছে। গত অক্টোবরে কলকাতা ও সল্ট লেক পৌরসভা নির্বাচনে জোর করে তৃণমূল কংগ্রেসের গুণ্ডাবাহিনী নির্বাচনের নিয়মনীতি না মেনে নির্বাচনের বিজয় তৃণমূলের পক্ষে নিয়েছে।গ্রাম পঞ্চায়েতে তৃণমূলের লোকেরা ক্ষমতায়।বামফ্রন্টের মতো এবারের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল মনে করেছে রাজ্য পুলিশ আর পঞ্চায়েত দিয়ে তারা বিধানসভা নির্বাচনে জোর খাটিয়ে জিতে যাবে। কিন্তু বাধ সেধেছে ভারতের চিফ ইলেকশন কমিশনার জনাব নাসিম জাইদি।

এবার ভারতে পশ্চিমবাংলা, তামিলনাডু, আসাম, কেরালা ও কেন্দ্রশাসিত পন্ডিচেরিতে রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন হচ্ছে। ৪ এপ্রিল ২০১৬ থেকে শুরু হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে। প্রত্যেক রাজ্যে দুই তিন দিনের মাঝে নির্বাচন শেষ হবে। কিন্তু পশ্চিমবাংলায় নির্বাচন হবে ৭ দফায় একমাসব্যাপী, ৫ মে পর্যন্ত। পশ্চিমবাংলায় বিদায়কের সংখ্যা ২৯৪। গত বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস আসন পেয়েছিলো ১৮৪টি আর তার জোট-সঙ্গী কংগ্রেস পেয়েছিল ৪৬টি। মমতার অত্যাচারে কংগ্রেস জোট ত্যাগ করেছিলো বহুদিন আগে। এবার কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করার বহু চেষ্টা মমতা করেছিলেন।সোনিয়া গান্ধীরও দুর্বলতা ছিলো মমতার প্রতি। কিন্তু তৃণমূল থেকে রাজ্যস্তর পর্যন্ত কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের প্রবল বিরোধিতার কারণে মমতার সঙ্গে সোনিয়া জোট করার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সাহসী হননি। কেন্দ্রের সিদ্ধান্ত আসার আগেই তৃণমূল পর্যায়ে কংগ্রেস- বামফ্রন্ট জোট স্বতঃস্ফুর্তভাবে কর্মী লেভেলে গঠিত হয়ে গিয়েছিলো।

বামফ্রন্ট পশ্চিম বাংলায় ৩৩ বছর ক্ষমতায় ছিলো। ৩৩ বছরে বামফ্রন্টের হাতে কংগ্রেস কর্মীরা যে অত্যাচারের সম্মুখীন হয়েছিলন, তার দ্বিগুণ অত্যাচার সইতে হয়েছে নাকি গত ৫ বছর তৃণমূলের হাতে। এ নির্বাচনে কংগ্রেস-বামফ্রন্ট জোট গঠিত হয়েছে। এ জোট তৃণমূলে কংগ্রেসের সঙ্গে অর্থবহ প্রতিদ্বন্ধিতায় অবতীর্ণ হয়েছে।বিজিপিও প্রতিদ্বন্ধিতায় আছে। তবে বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেস কারও সঙ্গে জোট গঠন করেনি। কিন্তু অনেকের ধারণা নরেন্দ্র মোদি'র দুর্বলতা রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতি। উভয়ে কিছু কিছু আসন পেয়ে সম্মিলিত শক্তিতে সরকার গঠনের মতো অবস্থান হলে, তখন তৃণমূল ও বিজেপির ঐক্যবদ্ধ সরকার হবে। সামনের দিনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির আসন মজবুত হবে। নরেন্দ্র মোদি লোকসভায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন নিয়ে সরকার গঠন করলেও রাজ্যসভায় তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকায়, বিরোধীদলের মর্জির উপর নির্ভর করতে হয়। রাজ্যসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের বেশ কয়জন সদস্য রয়েছে। সারদা কেলেংকারী নিয়ে বড় বড় কথা বললেও নরেন্দ্র মোদি মমতার বিরুদ্ধে বেশি সক্রিয় হননি শুধু এ কারণে।

চিফ ইলেকশন কমিশনার নাসিম জাইদি সম্ভবতো দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হয়েছেন, তৃণমূল কংগ্রেস স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনগুলোতে যেভাবে নির্বাচন করেছিলো, তার হাত থেকে এবারের বিধানসভার নির্বাচনকে বাঁচানোর জন্য। বলগাহীনভাবে জোরপূর্বক নির্বাচনে জিতে যাওয়ার যে সংস্কৃতি, পশ্চিমবঙ্গে বিকশিত হয়েছে তার হাত থেকে নির্বাচনকে রক্ষা করতে না পারলে ধীরে ধীরে তা ভারতের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে এবং ভারতীয় গণতন্ত্রের জৌলস ম্লান হয়ে যাবে।

পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ তৃণমূলের দলীয় ক্যাডার হয়ে যাওয়ার বদনাম রটেছে সর্বত্র। তাই নির্বাচন কমিশন কেন্দ্রীয় ফোর্স পাঠিয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। মমতা বলছেন, নির্বাচন কমিশন নাকি পশ্চিমবঙ্গে জরুরি অবস্থা জারি করেছে। অনেকে বলছেন, এটা মমতার প্যানিক রি্এ্যাকশান। তবে প্রথম দফা ভোটের দিন রাজ্য পুলিশ মমতার স্বার্থে কাজ করেছে আর কেন্দ্রের পুলিশ, আইনশৃঙ্খলা কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা ব্যস্ত ছিল কলকাতায় কেনাকাটায়- এমন অভিযোগ আছে। মিডিয়ায় এই নিয়ে চরম হৈচৈ। মূলত তৃণমূলের সঙ্গে আঁতাত হয়েছে বিজেপির- এমন অভিযোগ বিরোধী শিবিরের। তবে এসব ক্ষেত্রে মূলত যে অভিযোগ সামনে আসে- জাল ভোট দেওয়া এবং বৈধ ভোটারদের ভোটকেন্দ্রের আগেই আটকে দেওয়া- তেমনটা খুব দেখা যায়নি। তার মানে এই নয় যে, এমন ঘটনা ঘটেনি। নগদ টাকা বা পানীয় দিয়ে প্রভাবিত করার অভিযোগ যেমন উঠেছে, নীরব সন্ত্রাসের অভিযোগও আছে। সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশন প্রথম দফায় একটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ উপহার দিতে পেরেছে বলে মানছেন শাসক-বিরোধী দু’পক্ষই।

সার্বিকভাবে দেখা যাচ্ছে মমতার তৃণমূল কংগ্রেস গতবারের তুলনায় কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েছে। ক্ষমতায় আসার পর থেকে তার পিছু পিছু হেটেছে সারদা কেলেংকারী। নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে এসে দিল্লীর একটা টিভি চ্যানেল ষ্টিং অপারেশন করে তার দলের সাংসদের ঘুষ নেয়ার ভিডিও প্রকাশ করে, তার নির্বাচনের সমগ্র পরিকল্পনাকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। যে ছয়জন তৃণমূল কংগ্রেসের লোকসভার সদস্য এ কেলেংকারিতে জড়িত তাদের ব্যাপারে তদন্ত করার জন্য লোকসভার স্পিকার বিজেপির বয়োজ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য লাল কৃষ্ণ আদভানীকে দিয়ে একটা এথিক্স কমিটি- (ethics committee) করে দিয়েছেন। এথিক্স কমিটির রিপোর্ট তাদের বিরুদ্ধে গেলে লোকসভার তাদের সদস্যপদ খারিজ হয়ে যাবে। মমতা বলেছিলেন, আইটির উন্নয়নের কারণে অনেক কিছু ক্যামেরায় বন্দী করা যায়। তখন টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক ম্যাথু স্যামুয়েল চ্যালেঞ্জ করে বলেছেন, তার ভিডিওর তোলা ছবি পরীক্ষা করা হউক। হায়দ্রাবাদের ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে ফরেনসিক টেস্ট এরই মাঝে সম্পন্ন করা হয়েছে। রির্পোটে বলা হয়েছে  ছবিগুলো সঠিক।

মমতার উত্থান হয়েছিলো বামফ্রন্টের সিঙ্গুরে জমি-অধিগ্রহণের বিষয়টাকে বিধ্বস্ত করে দেওয়ার কারণে। তখন মমতা ওয়াদা দিয়েছিলেন যে, তিনি ক্ষমতায় গেলে জমি ফেরত দেবেন। কিন্তু গত পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও জমি ফেরত দেওয়া সম্ভব হয়নি। এখন বলছেন জমি ফেরত দেওয়া কোর্টের এখতিয়ার। ফেরত প্রদানের বিষয়টা ৫ বছরও লাগতে পারে আবার পঞ্চাশ বছরও লাগতে পারে। নতুনভাবে অমঙ্গলের পদধ্বনি শুরু হলো নির্বাচন শুরুর ৬ দিন আগে ফ্লাইওভার ভেঙে পড়ে।বহুলোক হতাহত হয়েছে।মমতা যতই বলুন ফ্লাইওভারের কাজ শুরু হয়েছিলো বামফ্রন্টের সময়ে,লোকে জানে বামফ্রন্ট ভিত্তিস্থাপন করেছিলো মাত্র। মূলকাজ আরম্ভ হয়েছে মমতার সময়ে। সুতরাং তৃণমূলের তোলা বাজিতে যে কাজ খারাপ হয়েছে এটা পশ্চিমবাংলার মানুষের মুখে মুখে।

সব মিলিয়ে এবারের বিধানসভার নির্বাচনে মমতার তৃণমূল কংগ্রেসের অবস্থা খুব ভাল নয়। গত বিধানসভা নির্বাচনে বামফ্রন্টের মূখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য নিজ আসনে হেরে গিয়েছিলেন। এবার মমতার একই অবস্থা হলে আশ্চার্য হবার কিছুই থাকবে না। চিফ ইলেকশান কমিশনার যদি নিরপেক্ষ ভোট নিশ্চিত করতে পারেন, তবে তৃণমূলের বিপর্যয় এড়ানো কঠিন হবে। আর ভোটে জোর জবরদস্তি অব্যাহত রাখতে পারলে মমতাই আবার পশ্চিমবঙ্গের মসনদে আসবেন।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

anisalamgir@gmail.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Ifad ad on bangla tribune

লাইভ

Nitol ad on bangla Tribune

কলামিস্ট

টপ