পানামা ফাঁস, বাংলাদেশ থেকে অর্থপাচার

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১২:০৫, এপ্রিল ০৬, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:১৮, এপ্রিল ০৬, ২০১৬

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাআলোচনায় 'পানামা ফাঁস'। যা জানা ছিল না, তা জানছে মানুষ। বিস্ময়কর সব নাম উঠে আসছে। রাষ্ট্রনায়ক থেকে চিত্র তারকা কে নেই তালিকায়? বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনেতাসহ ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের অর্থপাচার এবং কর ফাঁকির এ কেলেঙ্কারির ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর এখন বিভিন্ন দেশে তদন্ত শুরু হয়েছে। দুনিয়ার প্রভাবশালী রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং রাঘব-বোয়ালদের আর্থিক কেলেঙ্কারির তথ্য ফাঁস করে সাড়া ফেলেছে এই ‘পানামা পেপারস লিক’। ফাঁস হওয়া এক কোটি ১৫ লাখ নথিতে দেখা গেছে, বিভিন্ন দেশের সাবেক ও বর্তমান ৭২ জন রাষ্ট্রপ্রধান তাদের নিজ দেশের সম্পদ লুণ্ঠনের সঙ্গে জড়িত। এখন পর্যন্ত এটিই বিশ্বের সর্ববৃহৎ নথি ফাঁসের ঘটনা।
বাংলাদেশের কারও নাম আসেনি কিংবা এখনও রিপোর্টটির পুরোটা প্রকাশিত হয়নি। বাংলাদেশের কারও নাম আছে কিনা তা জানতে আমাদের আরও অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে তো নিয়মিতই অর্থপাচারের ঘটনা ঘটছে। গত ডিসেম্বরেই জানা গেলো গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে চার লাখ কোটি টাকারও বেশি পাচার হয়েছে। বিশ্ব পরিসরে অর্থপাচার হয়ে যাচ্ছে এমন ১৫০টি উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে ২৬তম অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। শুধু ২০১৩ সালেই বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৭৭ হাজার কোটি টাকা। যা জাতীয় বাজেটের ১৫ শতাংশ। আর গত এক দশকে পাচার হয়েছে ৪ লাখ ৩ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা। অর্থপাচার নিয়ে জরিপকারী ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির ২০১৩ সালের প্রতিবেদনে আমরা এ তথ্য পেয়েছিলাম।
অফশোর কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তি দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকা পাচার হয়। তবে দেশে বিরাজমান নানা বাস্তবতায় অর্থ বাইরে যায়। আমাদের অর্থনৈতিক নীতিতে ধারাবাহিকতার অভাব ও আর্থিক তদারকি-ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার কারণে টাকা পাচার হয়ে থাকে। কেননা, ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা অনেক সময়ই দ্বিধাগ্রস্ত থাকেন যে হঠাৎ কোনও নীতি পরিবর্তন হলে তাদের কী হবে। ফলে অনেকে অর্জিত মুনাফা বিভিন্নভাবে বাইরে পাঠিয়ে রাখেন।
আবার দেশে যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা বেড়ে যায় বা ক্ষমতার পালাবদলের সময় ঘনিয়ে আসে, তখন বাইরে নিরাপদ স্থানে অর্থসম্পদ সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। টাকা পাচারের এ তথ্য তারই প্রতিফলন। রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক মদদপুষ্ট ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তাহীনতায় থাকেন বলে এ রকমটি হয়।

যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে, তা যদি পাচার না হয়ে এ দেশে থাকত এবং এ দেশে বিনিয়োগ হতো, তাহলে আমাদের প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয় আর কর্মসংস্থান পরিস্থিতি আরও অন্যরকম হতে পারতো।  

প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হচ্ছে, কিন্তু সরকারের দিক থেকে কোনও চেষ্টা নেই কে বা কারা করছে এবং কেনইবা করছে, এই কর্মটি। মূলধন যন্ত্রপাতি আমদানির নামে, রফতানি আয়ের অংশ দেশে না এনে বিদেশে রেখে দেওয়া, আন্ডার ও ওভার ইনভয়সেসের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের অনেকে অর্থ পাচার করে বা অর্থ নিরাপদে সরিয়ে রাখে। দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থও পাচার হয় বিপুলভাবে। তার সঙ্গে জড়িত আছে রাজনীতিক আর আমলাগোষ্ঠীর কেউ কেউ। এদের কারণেই আজ মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম বা কানাডায় বেগমপাড়া গড়ে উঠছে।   

অনেক ব্যবসায়ী পণ্য আমদানির সময় ওভার ইনভয়েসিং করে, অর্থাৎ পণ্যের মূল্য বেশি দেখিয়ে অতিরিক্ত অর্থ বিদেশে পাচার করে। আবার পণ্য রফতানির সময় আন্ডার ইনভয়েসিং করে, অর্থাৎ পণ্যের মূল্য কম দেখিয়ে রফতানি পণ্যের মূল্যের একটি অংশ বিদেশেই রেখে দেয়। এভাবে আমদানি-রফতানির মাধ্যমে অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে এ দেশ থেকে অর্থ পাচার করছে। অনেকেই ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেই ঋণের একটি অংশ বিদেশে পাচার করছে। তারাই আবার ঠিকমতো ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করায়  ঋণখেলাপি বাড়ছে।

দেশ থেকে যে টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে, তা এ দেশের সাধারণ জনগণের টাকা। প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংককেই মূল ব্যবস্থা নিতে হবে, তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে যদি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে বড় ঋণখেলাপিদের কোনওভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না, তাহলেই তা সম্ভব। মালয়েশিয়া এমনকি পাকিস্তানেও ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দেশগুলোর সরকারই উদ্যোগ নিয়েছে।

স্বাধীন বাংলাদেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষ যত বেশি সোচ্চার হচ্ছে, উন্নয়ন ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার যত বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে, তার সঙ্গে সঙ্গে তত বেশি বাড়ছে দুর্নীতি, চোরাচালান ব্যবসা, ঘুষ, অনিয়ম। বাড়ছে বৈষম্য, বাড়ছে ধার্মিকতা ও জঙ্গি মনোভাব। গণতান্ত্রিক বা অগণতান্ত্রিক সব সরকারের আমলেই কালো টাকার জন্ম হয়, সেই টাকা পাচার হয়।

প্রশ্ন হলো টাকা পাচারের তথ্য এবং পাচারকারীদের বিচার করা সম্ভব কিনা? ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন- অর্থ পাচারের ঘটনা পূর্ণ তদন্ত হবে, দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। সম্প্রতি পাকিস্তান সুপ্রিমকোর্ট ৪০ জন রাজনীতিকের বিদেশে সহায়-সম্পদের হিসাব চেয়েছে।

বাংলাদেশ একবার মালয়েশীয় সরকারের কাছে তাদের সেকেন্ড হোম প্রকল্পে কোন কোন বাংলাদেশি বিনিয়োগ করেছে তার হিসাব চেয়েছিল। কিন্তু ওই দেশের সরকার তা দিতে অপারগতা প্রকাশ করে।

এখানে বাধা দুটি। প্রথমত, সংশ্লিষ্ট দেশের কীরকম বোঝাপড়া আছে তা। যদি সমঝোতা চুক্তি থাকে তবে কাজটি সহজ হয়। যেমন হয়েছিল আরাফাত রহমান কোকোর টাকা পাচারের ঘটনায়। বিচার হয়েছে আদালতে। সে কারণে সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাষ্ট্র তথ্য দিয়েছে। অন্য ক্ষেত্রেও যদি তাই হয়, তাহলে সরকারকে নাম ধরে ধরে তথ্য চাইতে হবে।

রাজনৈতিক বিবেচনায় এটা করা হতে পারে। অথবা সমানে মামলা করে দুদককে তা চাইতে হতে পারে। কাজটা কঠিন। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় তথ্য সংগ্রহ করা এবং পাচারকারীদের বিচার এক দুরূহ কাজ। আর এ কাজের একমাত্র উপায় সুশাসন, যা চিরদিনের চাওয়া, কিন্তু অধরা। তবে কিছু কিছু স্থানে কাজটা শুরুও হতে পারে। অর্থনৈতিক সুশাসন জোরদার করা গেলে ও নিয়ন্ত্রণকারী বিভিন্ন সংস্থার দক্ষতা বাড়ানো গেলে টাকা পাচার নিশ্চয়ই রোধ করা যাবে।

লেখক: পরিচালক বার্তা, একাত্তর টিভি

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ