behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

সুস্থ জীবনের প্রত্যাশা

আমিনুল ইসলাম সুজন১২:৪৬, এপ্রিল ০৭, ২০১৬

আমিনুল ইসলাম সুজনএকটা সময় ছিল ডায়াবেটিস শুধু বয়স্ক ও ধনীদের রোগ ছিল। উন্নত দেশেই এ রোগের প্রকোপ ছিল বেশি। কিন্তু এখন ধনী-গরীব সবার মধ্যেই ডায়াবেটিস দেখা দিচ্ছে। বরং ধনীদের তুলনায় গরীবদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। শিশু, তরুণদের মধ্যেও ডায়াবেটিস বৃদ্ধির হার আশঙ্কাজনক।
উন্নত দেশের তুলনায় উন্নয়নশীল দেশে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে দ্রুত। পরিসংখ্যানও তাই বলে। যেমন- ইন্টারন্যাশনাল ডায়াবেটিস ফেডারেশনের (আইডিএফ) বৈশ্বিক ডায়াবেটিস এটলাসে (৭ম সংখ্যা, ২০১৫) বলা হয়েছে, প্রতি ১১ জন প্রাপ্তবয়সীর মধ্যে একজন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। এ হিসাবে বিশ্বে ৪১ কোটি ৫ লাখের বেশি মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত- যার ৭৫ ভাগ দরিদ্র, উন্নয়নশীল ও মধ্য আয়ের দেশের অধিবাসী।
শুধু আক্রান্তের দিক থেকে নয়, মৃত্যুর দিক থেকেও ডায়াবেটিস শীর্ষস্থানীয় একটি রোগ। প্রতি ৬ সেকেন্ডে একজন এবং বছরে ৫১ লাখের বেশি মানুষ ডায়াবেটিস রোগে মারা যায়। তাছাড়া এ রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসায় বিপুল অংকের অর্থও ব্যয় হয়। শুধু ২০১৫ সালেই ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের চিকিৎসায় ৬৭৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা) ব্যয় হয়েছে। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, উন্নত দেশগুলোতে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের প্রকোপ কমাতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে ক্রমবর্ধমান হার তারা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেও পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই হার বাড়ছে এবং ২০৪০ সাল নাগাদ ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা ৬৪ কোটি ছাড়িয়ে যাবে।
বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশেও ডায়াবেটিস খুব দ্রুত গতিতে বাড়ছে। ডায়াবেটিক এটলাস তথ্যমতে, ২০১৫ সালে প্রায় ৭২ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। ২০ থেকে ৭৯ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় সাড়ে ৭ ভাগ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং বছরে বাড়ছে লক্ষাধিক। ডায়াবেটিস চিকিৎসায় গড়ে প্রতিজনের খরচ প্রায় চার হাজার টাকা (৫১ ইউএস ডলার)। সে হিসেবে বছরে ২ হাজার ৮ শত ৬৪ কোটি টাকা শুধু ডায়াবেটিস চিকিৎসায় ব্যয় হয়। এছাড়া ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের কর্মঘণ্টা, মৃত্যুজনিত ক্ষতি বিবেচনায় নিলে অনেক অর্থ অপচয় হয়। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ ডায়াবেটিসে মারা যায়।
বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিসের মতো ভয়াবহ, জটিল ও প্রাণঘাতী রোগ নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববাসীকে উৎসাহিত করতে আজ ৭ এপ্রিল উদযাপিত হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ২০১৬। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘হল্ট দি রাইজ: বিট ডায়াবেটিস’। মূলত বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিসের ক্রমবর্ধমান হারকে নিয়ন্ত্রণে আনা ও ডায়াবেটিসকে পরাস্ত করার মাধ্যমে সুস্থ জীবন নিশ্চিত করার বিষয়টি এ বছরের প্রতিপাদ্যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে বিশ্ববাসীকে উদ্বুদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ করতে এ দিবসটির গুরুত্ব অপরিসীম। চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময়েই বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে একটি স্বতন্ত্র সংস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ১৯৪৮ সালের ৭ এপ্রিল গঠনতন্ত্র কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ওই বছরেই অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে বছরে একটি দিন ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস’ হিসেবে উদযাপনের প্রস্তাব গৃহিত হয়, যা ১৯৫০ সাল থেকে কার্যকর হয়।

প্রাসঙ্গিকভাবে, ডায়াবেটিস কোন ধরণের রোগ ও কেন হয়- এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আলোকপাত করা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের (সিডিসি) মতে, আমরা যেসব খাবার খাই, তা পাকস্থলীতে জমা হয়ে গ্লুকোজ তৈরি করে- যা বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রয়োজনীয় শক্তি যোগায়। পাকস্থলীর পাশে অগ্নাশয় (প্যানক্রিয়াস) গ্রন্থি ইনসুলিন নামক হরমোন তৈরি করে। এই হরমোনই গ্লুকোজকে বিভিন্ন কোষে (অঙ্গ-প্রতঙ্গ) সরবরাহ করে। প্রয়োজনীয় ইনসুলিন তৈরি না হলে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ বেড়ে যায়। গ্লুকোজের এই বর্ধিত অবস্থায়ই ডায়াবেটিস।

ডায়াবেটিস তিন প্রকার:- টাইপ-১, টাইপ-২ ও জেস্টশনাল। মুটিয়ে যাওয়া নারীদের গর্ভকালীন সময়ে জেস্টশনাল ডায়াবেটিস হয়- যা অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রসবের পর ভালো হয়ে যায়। জন্ম নেওয়া শিশুর মধ্যে প্রতি ৭টি শিশুর মধ্যে একটি শিশু এ ডায়াবেটিসের কারণে ঝুঁকি নিয়ে জন্মায়। টাইপ-১ ডায়াবেটিসের কারণ নিয়ে বিজ্ঞানীরা এখনও পরিষ্কার নন। তবে বংশগত কারণে বেশি হয় এবং এ রোগে আক্রান্তের হার খুব কম। অন্যদিকে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্তের হার পৃথিবীতে সর্বাধিক। ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের মধ্যে বিশ্বব্যাপী মোট ৯০ শতাংশের বেশি টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগী, যার অধিকাংশই প্রতিরোধযোগ্য।

মূলত, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস (তেল, চর্বি ও চিনিযুক্ত খাবারের আধিক্যের পাশাপাশি তাজা ফলমূল ও শাকসব্জি কম খাওয়া) ও নেতিবাচক জীবনাচার (ধূমপান ও তামাক সেবন, মাদক সেবন, অলসতা/শারীরিক পরিশ্রম না করা), স্থুলতা বা মুটিয়ে যাওয়া এবং বংশগত ইত্যাদি কারণে টাইপ-২ ডায়বেটিস হয়ে থাকে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভাস্যের মধ্যে ফাস্টফুড, চিপসসহ বিভিন্ন মোড়কজাত জাঙ্কফুড, কোমলপানীয়-এনার্জি ড্রিংকস-মোড়কজাত জুস ইত্যাদি ক্ষতিকর পানীয় সেবনের অভ্যাস অন্যতম। যুক্তরাষ্ট্রে ৯০ হাজার মানুষের মধ্যে ৮ বছর ধরে পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যারা প্রতিদিন কোমল পানীয় পান করেন, তাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৮৩ শতাংশ বেশি। এছাড়া উচ্চরক্তচাপে আক্রান্ত ও ৪০ বছরের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।

ডায়বেটিস অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল, দীর্ঘমেয়াদী রোগ। একবার দেখা দিলে আর কখনও ভালো হয় না এবং প্রাণঘাতী অন্যান্য আরও অনেক রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। যুক্তরাষ্ট্রের সার্জন জেনারেল প্রতিবেদন ২০১৪-এ বলা হয়, অধূমপায়ীর তুলনায় ধূমপায়ীর ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি ৩০ থেকে ৪০ শাতংশ বেশি। ডায়াবেটিস থাকা অবস্থায় ধূমপান বা তামাক সেবন করলে ইনসুলিন ব্যবহারকে অকেজো করে তা মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে। এছাড়া ডায়াবেটিস থাকা অবস্থায় ধূমপান, মদ্যপান, কোমল পানীয় ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ করলে হৃদরোগ ও স্ট্রোক, কিডনি বিকল, শরীরের বিভিন্ন অংশ অচল হওয়া, অন্ধত্ব, পায়ের পচন রোগ ও পায়ের নল সরু হওয়ার মতো বিপজ্জনক ঝুঁকি বৃদ্ধি করে।

যেহেতু চিকিৎসার মাধ্যমে ডায়াবেটিসের মতো প্রাণঘাতী রোগ নির্মূল করা সম্ভব নয়, তাই প্রতিরোধই উত্তম। উন্নত দেশগুলো ডায়াবেটিস প্রতিরোধে নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। যেমন- নির্দিষ্ট খাদ্য ও পুষ্টিমান নিশ্চিত করে না- এমন সব খাদ্য ও পানীয়ের বিজ্ঞাপন ও বিপণন ২০১৩ সালে নিষিদ্ধ করেছে উরুগুয়ে। একই বছর পেরু চর্বি-চিনি ও লবণাক্ত খাবারের প্রচারে স্বাস্থ্য সতর্কবাণী প্রচার বাধ্যতামূলক করেছে। ২০০৪ সাল থেকেই ইরানে কোমল পানীয়ের বিজ্ঞাপন প্রচার নিষিদ্ধ। ইকুয়েডর, চিলিতে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর প্রচলন করা হয়েছে।

২০১৩ মেক্সিকো সুগার-সুইটেন্ড বেভারেজের (কোমল পানীয়, সোডা ইত্যাদি) ওপর অতিরিক্ত ১ পেসো (৮ সেন্টস- ইউএস ডলার) কর বৃদ্ধি করেছে, ফলে প্রথম তিন মাসে ১০ শতাংশ এবং বছরে ৬ শতাংশ পানীয় পানের হার কমেছে। তবে দরিদ্রদের মধ্যে কোমল পানীয় গ্রহণের হার কমেছে ১৭ শতাংশ, অর্থাৎ কর ও মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব দরিদ্রদের ওপর বেশি পড়েছে। সম্প্রতি ইংল্যান্ডও এসব ক্ষতিকর পানীয়ের ওপর কর বৃদ্ধি করেছে। কোমল পানীয়, মোড়কজাত কেমিক্যাল জুস ও এনার্জি ড্রিংকসের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোড়কে মুদ্রণ এবং করবৃদ্ধি, বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা নিষিদ্ধ করার মতো কঠোর সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকেও গ্রহণ করতে হবে।

পাশাপাশি মানুষের জন্য শহুরে জীবনে হাঁটা ও খেলাধুলার জন্য জন্য প্রশস্ত ফুটপাত, পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ও পার্ক, উন্মুক্ত স্থানের ব্যবস্থা করা দরকার। বিশেষ করে, শহরের ৭৫ ভাগ দূরত্ব ৫ কিলোমিটারের মধ্যে- এ দূরত্ব যদি হাঁটার প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তবে একদিকে যানজট ও দূষণ যেমন কমবে, তেমনি মানুষ সুস্থ থাকবে, কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে, ডায়াবেটিসসহ রোগব্যাধির ঝুঁকি কমবে। এজন্য হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার দরকার নেই। প্রয়োজন শুধু নীতি-নির্ধারকদের আন্তরিকতা।

শুধু সরকারি নীতির আশায় থাকলে হবে না। ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রত্যেককেই ডায়াবেটিসসহ অসংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকি কমিয়ে স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে হবে। মানুষের জীবনে, জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত স্বাস্থ্যকর জীবন সর্বাধিক প্রত্যাশিত ও গুরুত্বপূর্ণ। ভালো স্বাস্থ্য ছাড়া অর্থ-বিত্ত, শিক্ষা- কোনওটাই সঠিকভাবে ব্যবহার কিংবা উপভোগ করা সম্ভব হয় না।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে যেসব ক্ষতিকর অভ্যাস বাদ দিতে হবে, তার মধ্যে ধূমপান ও তামাক সেবন, ফাস্টফুড ও জাঙ্কফুড এবং সবরকম কোমলপানীয়- এনার্জি ড্রিংকস- মোড়কজাত জুস উল্লেখযোগ্য। যেসব খাবার কমিয়ে আনতে হবে, সেগুলো হচ্ছে চর্বিযুক্ত ও মিষ্টি জাতীয় খাবার। পাশাপাশি শরীরের ওজন বেশি হলে কমাতে হবে। অন্যদিকে যেসব অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে, তার মধ্যে নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং তাজা শাকসবজি ও ফলমূল খাওয়া।

স্বাস্থ্য অমূল্য সম্পদ। এ সম্পদ একবার ক্ষতিগ্রস্ত হলে ফিরে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। তাই স্বাস্থ্য রক্ষায় প্রত্যেকেরই যার যার অবস্থান থেকে সচেতন হওয়া জরুরি। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসে সবার সুস্বাস্থ্য প্রত্যাশা করি।

লেখক: সাংবাদিক ও সদস্য, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা)

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ