সম্মান ও জাতীয় পরিচয়

Send
নাদীম কাদির
প্রকাশিত : ০৯:২৭, এপ্রিল ০৮, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ০৯:২৯, এপ্রিল ০৮, ২০১৬

Nadeem Qadirহ্রদ, গ্রানাইট পাহাড় আর অরণ্যে ঘেরা ঐতিহাসিক শহর স্টকহোম ও উপসালা। চমৎকার রঙ-এর বহুবর্ষী ভবন এবং যথাযথ পরিচর্যা ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই সুইডেনের এই দুই শহরকে অনন্য করে তুলেছে।
সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে দীর্ঘ পদচারণায় আমি দেখেছি, সেখানে সবকিছুতেই ইতিহাসের একটা ছাপ রয়েছে। এখানে ধীরস্থিরভাবে পুরাতন ও নতুনের মধ্যে একটা ছোটখাট সমন্বয় তৈরি হয়েছে। ফলে পুরনো সৌন্দর্যকে আক্রান্ত বা প্রভাবিত করা হয়নি। কিন্তু একইসঙ্গে এটি নিজের  সমৃদ্ধ সংস্কৃতি ও  ঐতিহ্য সম্পর্কে জানান দিচ্ছে।
কয়েকটি জাদুঘরে যাওয়ার আগে আমি দ্রুত কিছু স্যুভেনির বা স্মারকগ্রন্থ কিনলাম। এরমধ্যে প্রথমটি ছিল স্যার আলফ্রেড নোবেলের স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গকৃত নোবেল মিউজিয়াম। এখানে একটি পুরনো ভবনে আধুনিক ইন্টেরিয়রে চিত্রিত জীবন এবং আলফ্রেড নোবেলের কীর্তি শোভা পায়। শহরের চারপাশে ছোটবড় আরও অনেক জাদুঘর রয়েছে।
উপসালায় রয়েছে উপসালা ইউনিভার্সিটি। এখানকার বেশিরভাগ শিক্ষার্থী এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। এখানে বেশকিছু জাদুঘর রয়েছে। এগুলোর একটির নাম পিস মিউজিয়াম। এটি জাতিসংঘের দ্বিতীয় মহাসচিব দাগ হ্যামারশোল্ড স্মৃতির উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত। ১৯৬২ সালে আফ্রিকায় এক রহস্যজনক বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হওয়া হ্যামারশোল্ড ছিলেন জাতিসংঘের সবচেয়ে সফল সেক্রেটারি জেনারেল।
জাদুঘরটিতে প্রবেশের সময় আমি রিসিশনে থাকা নারীকে বললাম, ‘শেষ পর্যন্ত আমি এই জাদুঘরে আসলাম।’ তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি এর আগে কেন আসনি?’ আমি উত্তর দিলাম, ১৯৮৪ সালে যখন আমি দাগ হ্যামারশোল্ড-এর নামে ইউএন ফেলোশিপ অর্জন করি তখন থেকেই আমার এখানে আসার ইচ্ছা পোষণ করেছি। তিনি চোখের পলক ফেললেন এবং আমাকে সহাস্যে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন। তিনি মিউজিয়ামের পরিচালক জেসপার ম্যাগনাসনকে ডাকলেন।
সাংবাদিকতায় আমার দাগ হ্যামারশোল্ড-এর নামে ইউএন ফেলোশিপ অর্জনের কথা জানতে পেরে তিনি বললেন, “আপনি এখানে আসায় আমরা সম্মানিত বোধ করছি। এটা শুধু এজন্যই নয় যে, আপনি শুধু তার নামের ওপর করা একটা কোর্সের ফেলো বরং আপনি একজন ভালো মানের সাংবাদিক।”
তিনি আমাকে চারপাশে ঘুরিয়ে দেখালেন। আমি দাগ হ্যামারশোল্ডের দুনিয়াকে অনুসন্ধান করতে লাগলাম। জাদুঘরটি পরিদর্শনের মাত্র দুই দিন আগে আমি জাতিসংঘের বর্তমান মহাসচিব বান কি মুনকে বলেছিলাম, দুনিয়ার এই অশান্ত সময়ে দাগ হ্যামারশোল্ড একজন বৈশ্বিক রাজনীতিবিদে পরিণত হতে পারতেন এবং সুরক্ষিত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন।

জাদুঘর ত্যাগের সময় আমি কিছু স্মারকগ্রন্থ কিনলাম যদিও জেসপার আমাকে দাগ হ্যামারশোল্ডের ওপর একটি সিডি উপহার দিয়েছিলেন। তিনি বললেন, ‘আমাদের জন্য এটা চমৎকার ছিল।’ হ্যামারশোল্ড সম্পর্কে আরও তথ্য জেনে এবং আমাকে যে সম্মান দেওয়া হয়েছে সেটার উষ্ণতা নিয়ে আমি জাদুঘরটি ত্যাগ করি।

হ্যামারশোল্ড সম্পর্কে এতো তথ্য নিয়ে আমি কখনও ঘরে ফিরিনি। অধিকন্তু নিউ ইয়র্ক থেকে ঢাকা ফিরে আমি একটা চাকরির জন্য ঘুরেছি। পেরু, মৌরিতানিয়া এবং বারকিনা ফাসো’র আমার তিন সহকর্মী জাতিসংঘে তাদের অভিজ্ঞতার জন্য নিজ নিজ দেশে হিরোতে পরিণত হন। বড় বড় পত্রিকায় কাভারেজ পান। একইসঙ্গে কর্মস্থলে প্রমোশন বা অধিকতর ভালো চাকরি পান।

এখানে ঢাকায় আমি হতাশ হতে থাকি। আবারও লন্ডনের উদ্দেশ্যে ঢাকা ত্যাগ করি। এটা প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ না দেওয়ায় আবারও দেশে ফেরা। এটা অনুধাবন করলাম যে, আমার কোনও বিকল্প নেই। কিন্তু আমার নিজের শপথ ভেঙ্গে চাকরির জন্য সাহায্য চাওয়া নয়। আমার চমৎকার মা হাসনা হেনাকে বললাম আমাকে সাহায্য করতে। নিউ ইয়র্কের ওয়্যার সার্ভিস রিপোর্টিং-এ পড়াশুনার সুবাদে তিনি আমাকে জাতীয় সংবাদ সংস্থা বাসসে একটা চাকরি নিয়ে দিলেন।

দুঃখিত! আমি এ কাহিনী দিয়ে আপনাদের বিরক্ত করছি। এই বিষয়টিকে আমি যে কারণে ফোকাস করতে চেয়েছি সেটা হচ্ছে এই পার্থক্য বা বিপরীত অবস্থা দেখানো যে, সুইডেনের মতো একটা ক্ষুদ্র দেশ কিভাবে তার মহৎ নাগরিকদের সম্মানিত করে। এই প্রবণতা বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে তাদের একটা সম্মানজনক পরিচিতি এনে দিয়েছে। আমরা একটা জাতি হিসেবে আমাদের মহৎ মানুষদের সম্মান দেখাতে ব্যর্থ হয়েছি।

বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গীকৃত জাদুঘর রাষ্ট্রীয় জাদুঘর নয়। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকালীন নায়ক সৈয়দ নজরুল ইসলাম বা তাজউদ্দিন আহমেদের নামে উল্লেখযোগ্য কোনও জাদুঘর নেই।

শাহবাগের জাতীয় জাদুঘর পর্যাপ্ত নয়। মুক্তিযোদ্ধাদের মতো এ জাতির মহৎ মানুষদের জন্য আমরা সবগুলো জেলায় ছোটখাট জাদুঘর তৈরি করতে পারি। এটা যদি করা যায় তাহলে সেটা আমাদের গর্বের ইতিহাসকে ধারণ করবে। এটা কনিষ্ঠদেরও আমাদের ইতিহাস সম্পর্কে শিক্ষা দেবে। অধিকন্তু তারা যাদেরকে সম্মানিত হওয়া উচিত তাদেরকে সম্মান করার শিক্ষা পাবে।

জাতিসংঘে নিযুক্ত আমাদের শান্তিরক্ষীদের জন্য আমাদের অবশ্যই উন্মুক্ত স্থানে একটা জাদুঘর থাকা আবশ্যক, সীমাবদ্ধ ক্যান্টনমেন্টে নয়। আমাদের নীল টুপিধারীদের কার্যক্রম এবং তাদের আত্মত্যাগ সম্পর্কে ব্যাপক পরিসরে জানতে এর প্রয়োজন রয়েছে।

অন্যদের সম্মান করতে হলে আগে নিজেকে সম্মান করতে হয়।

লেখক: সাংবাদিকতায় জাতিসংঘের ড্যাগ হ্যামারসোল্ড স্কলার এবং লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ