হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার দখলে শেখ ফজিলাতুন্নেছা চক্ষু হাসপাতাল!

Send
মনোজ সাহা, গোপালগঞ্জ
প্রকাশিত : ২৩:২৮, নভেম্বর ১২, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪৭, নভেম্বর ১৩, ২০১৬

শেখ ফজিলাতুন্নেসা চক্ষু হাসপাতালের হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির

গোপালগঞ্জের শেখ ফজিলাতুন্নেছা চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা পদে থেকেও প্রতিষ্ঠানটির সব শাখায় দাপট দেখানোর অভিযোগ উঠেছে মো. হুমায়ূন কবিরের বিরুদ্ধে। ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ ওঠা এই কর্মকর্তাকে ত্রাস হিসেবে দেখছেন প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।

হুমায়ূন কবির চক্ষু হাসপাতালে একাধারে হিসাবরক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও স্টোর ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করছেন। এর সুযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি ওই হাসপাতালের ৫ম তলার ৪টি কেবিন দখল করে সপরিবারে সেখানে বসবাস শুরু করেছেন এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে । শতাধিক নার্সের বেতন নির্ধারণের কথা বলে তাদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন কিন্তু এ বিষয়ে কোনও উদ্যোগ নেননি। এমনকি প্রতিষ্ঠানটির সহকারী পরিচালকের (এডি) এসি রুম দখলে রাখার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

প্রতিষ্ঠানটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী বলেছেন, হুমায়ূন কবির চক্ষু হাসপাতালে একাধারে হিসাবরক্ষক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও স্টোর ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করছেন। হাসপাতালের ৪র্থ, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলায় কর্মচারীদের থাকতে দিয়ে ভাড়া আদায় করছেন। একইসঙ্গে তিনি হাসপাতালে চোখ অপারেশনের পর রোগীদের কাছে কালো চশমা বিক্রির ব্যবসাও করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বেতন নির্ধারণের কথা বলে ১০৪ জন নার্সের কাছ থেকে আড়াই হাজার টাকা করে নিয়েছেন। তবে ক্ষমতাবান হওয়ায় ভয়ে তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই হাসাপাতালের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘হুমায়ূন কবিরের বাড়ি কুমিল্লার দাউদকান্দিতে। তিনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়াশোনা করেছেন। ছাত্রজীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে শুনেছি। পড়াশোনা শেষ করার পর বিএনপির-জামায়াত সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী খোন্দকার মোশারফ হোসেন তাকে চাকরি দিয়েছে বলেও শুনেছি। কর্ম জীবনের শুরুতে প্রথমে তিনি ছিলেন বগুড়া জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে বদলি হয়ে যান ঢাকা ক্যান্সার হাসপাতালে। ওই হাসপাতালে তিনি হিসাবরক্ষকের কাজ করতেন। পরে গোপালগঞ্জ শেখ ফজিলাতুন্নেছা চক্ষু  হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প পরিচালকের পিএ হিসেবে যোগদান করেন। এখন তিনি ভারপ্রাপ্ত হিসাব রক্ষণ অফিসার হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি হুমায়ূন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও স্টোর ইনচার্জের দায়িত্ব পেয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক নার্স বলেন, ‘শতাধিক নার্সের বেতন ফিক্সেশন (নির্ধারণ) করার কথা বলে হুমায়ূন কবির প্রত্যেকের কাছ থেকে আড়াই হাজার টাকা করে আদায় করেছেন। কিন্তু এখনও আমাদের কাজ করে দেননি।’

ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামের আবুল কালাম বলেন, ‘চোখ অপারেশনের পর হাসপাতালের বেডে বসেই ১০০ টাকা দিয়ে কালো চশমা কিনেছি। বাইরে এ চশমা ৩০ টাকায় বিক্রি হয়। কিন্তু, হাসপাতালে আমাকে বেশি দামে চশমা কিনতে বাধ্য করা হয়েছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই হাসাপাতালের এক কর্মী বলেন, ‘হুমায়ূন কবির হাসপাতালের পঞ্চম তলার ৪টি কেবিন দখল করে স্ত্রী ও পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। এছাড়া ৪, ৫ ও ৬ তলায় নিম্ন পদস্থ কর্মচারীদের রেখে ভাড়া আদায় করেন।’

কেবিনে সংসার পেতেছেন হুমায়ুর কবির

ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে গণপূর্ত বিভাগের কন্টিজেন্সির ৩৫ লাখ টাকা তুলে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ প্রসঙ্গে গোপালগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের কোষাধ্যক্ষ একে ফজলুল হক বলেন, ‘হাসপাতাল ভবনের কন্টিজেন্সির ৬০ লাখ টাকা আমাদের কাছে ছিল। এর মধ্যে ৩১-৩৫ লাখ টাকা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ভাউচার দিয়ে নিয়ে গেছে।’

হাসপাতালের হিসাব বিভাগের এক কর্মী জানান, হুমায়ূন কবির ভুয়া ভাউচার করে কন্সিজেন্সির টাকা আত্মসাৎ করেছেন। কাগজ-কলম ও গাড়ির যন্ত্রাংশ ক্রয়ের জন্য ভাউচার করা হয়েছে। ভাউচারে এসব জিনিসপত্রের দাম দ্বিগুণ লিখে সরকারি অর্থ অপচয় করেছে।

এ প্রসঙ্গে হুমায়ূন বলেন, ‘গণপূর্তের কন্টিজেন্সির টাকা খরচ করার এখতিয়ার আমাদের আছে। তাই বিধি অনুযায়ী টাকা তুলে কাগজ-কলম ও গাড়ির যন্ত্রাংশ কিনেছি।’

হাসপাতালের কেবিন দখল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্ত্রী ও পরিবারের লোকজন হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে এসেছে। তাই তারা ৩টি কেবিনে রয়েছে। অস্থায়ীভাবে একটি কেবিনকে রান্নাঘর হিসেবে ব্যবহার করতেন বলেও স্বীকার করেছেন তিনি। তবে বাকি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক বিমল চন্দ্র গাইন বলেন, ‘আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। কন্টিজেন্সির টাকা সম্পর্কে আমি জানি না। হাসপাতাল ভবন এখনও আমরা গণপূর্তের কাছ থেকে বুঝে পাইনি। তাই এডি, ডিডির রুম নির্ধারণ করা হয়নি। অস্থায়ীভাবে যে যেখানে পারছে সেখানে বসছে।’ এসি রুমে হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তার বসার বিয়ষটি তিনি এড়িয়ে যান। অন্যান্য বিষয় তিনি খতিয়ে দেখবেন বলে জানান।

/এসটি/টিএন/

লাইভ

টপ