ফুলবাড়ীয়া কলেজ শিক্ষকদের অভিযোগগভর্নিং বডির স্বেচ্ছাচারিতার জেরেই এই সহিংসতা!

Send
ময়মনসিংহ প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৪:৩২, ডিসেম্বর ০২, ২০১৬ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩২, ডিসেম্বর ০২, ২০১৬

ফুলবাড়ীয়া ডিগ্রি কলেজগভর্নিং বডির নিয়োগ বাণিজ্য, লুটতরাজ আর কলেজ জাতীয়করণ থেকে বাদ পরায় শিক্ষক-কর্মচারী-শিক্ষার্থীদের হতাশাবোধ থেকেই ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া ডিগ্রি কলেজে সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। আর এর সবই ঘটেছে গভর্নিং বডির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোসলেম উদ্দিন এমপির নেতৃত্বে। আন্দোলনকারী ক্ষুব্ধ শিক্ষক-কর্মচারী, ফুলবাড়ীয়ার বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতাসহ স্থানীয় নানা শ্রেণি পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে এরকম অভিযোগই পাওয়া গেছে।

ফুলবাড়ীয়া ডিগ্রি কলেজ জাতীয়করণ দাবি আদায় কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এসএম আবুল হাশেম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই গভর্নিং বডির মেয়াদকালে ২০১১ সালে ব্যবস্থাপনা বিষয়ের মাধ্যমে কলেজে অনার্স কোর্স খোলা হয়।  পরবর্তীতে হিসাববিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বাংলা, ইংরেজি, প্রাণিবিদ্যা ও দর্শনসহ ৭টি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু করা হয়। অনার্সে ২৭ জন শিক্ষক ও ডিগ্রি পর্যায়ে আরও কয়েকজনসহ প্রায় অর্ধশত শিক্ষক ও কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগের সময় প্রত্যেক প্রার্থীর কাছ থেকে আদায় করা হয়েছে ১০ লাখেরও বেশি টাকা। নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে অধ্যক্ষ নাসির উদ্দিন খান ও গভর্নিং বডির সদস্যদের সহায়তায় কলেজ থেকে এসময় কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়! এনিয়ে কলেজের ভেতর- বাইরে কোনও অডিট করতে দেওয়া হয়নি। এছাড়া কলেজ অধ্যক্ষ নাসির উদ্দিন খানের চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হয় পাঁচ দফায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সর্বশেষ কলেজ সরকারিকরণের নামে শিক্ষক কর্মচারীদের কাছ থেকে দুই মাসের বেতনভাতার টাকাও নিয়ে নেন গভর্নিং বডির সভাপতি অ্যাডভোকেট মোসলেম উদ্দিন এমপি।’

গত বছরের ১৫ জুন অনার্স কোর্সের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত কবির উদ্দিন আহমেদ জানান, নিয়োগের পর চাপ সৃষ্টি করে তার কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা নিয়েছেন অ্যাডভোকেট মোসলেম উদ্দিন। 

একই অভিযোগ করেছেন প্রাণীবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক মাহফুজুল হক। তিনি বলেন, ‘নিয়োগের সময় কথা ছিল কলেজ থেকে বিধি অনুযায়ী আমাদের বেতন ভাতা দেওয়া হবে। কিন্তু নিয়মভঙ্গ করে কোনও বেতন ভাতাও দেওয়া হতো না আমাদের।’

কলেজের অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘গভর্নিং বডির সভাপতির আত্মীয় হওয়ায় কলেজ অধ্যক্ষ নাসির উদ্দিন খান শিক্ষকদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে এসেছেন। তিনি কোনও নিয়মের তোয়াক্কা না করে, আয়-ব্যয়ের অভ্যন্তরীণ অডিট করাতেন না। আয়-ব্যয়ের হিসাবের কথা তোলা হলে তিনি এমপির ভয় দেখিয়ে শিক্ষকদের একরকম জিম্মি করে রাখতেন।’

কলেজের সহকারী অধ্যাপক ইমাম উদ্দিন জানান, ‘কলেজ অধ্যক্ষ নাসির উদ্দিন খান স্থানীয় এমপির ছেলে সেলিমের ভায়েরা ভাই হওয়ার সুবাদে গভর্নিং বডির সহযোগী হয়ে কাজ করে লাগামহীন দুর্নীতি করেছেন। তিনি কলেজ থেকে মাসে ৬০ হাজার টাকা বেতন ভাতা, প্রতিটি অনার্স বিভাগের কোর্স ফি থেকে ২ হাজার করে ১৪ হাজার টাকা নিয়েছেন। তিনি ছেলেকে সিবিএমসিবি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করানোর জন্য কলেজ ফান্ড থেকে ১৮ লাখ টাকা নিয়েছেন।’

তিনি আরও জানান, ‘অধ্যক্ষ নিজে অর্থ আত্মসাৎ করলেও শিক্ষক কর্মচারীদের কলেজ থেকে কোনও বেতন ভাতা দেন না।’ 

আন্দোলনরত শিক্ষকরা জানান, সরকারিকরণের তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার খবরে গত অক্টোবর থেকে ফুলবাড়ীয়া ডিগ্রি কলেজ জাতীয়করণ দাবি আদায় কমিটির ব্যানারে আন্দোলনে নামে কলেজের শিক্ষক-কর্মচারী, শিক্ষার্থীরা। হরতাল, অবরোধ, মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ, গণঅনশন, সাংবাদিক সম্মেলন ও স্মারকলিপি দেওয়াসহ দাবি আদায়ে নানা কর্মসূচী পালন করেন আন্দোলনকারীরা। কলেজ সরকারিকরণের এই আন্দোলনে স্থানীয় অভিভাবক, কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী, আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ, মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় নানা শ্রেণি পেশার মানুষ এসব আন্দোলন মিছিল সমাবেশে যোগ দিয়ে সমর্থন জানায়। আন্দোলনের সময় ছুটি নেওয়ার অজুহাতে গা-ঢাকা দেয় কলেজ অধ্যক্ষ নাসির উদ্দিন খান।

অভিযোগ অস্বীকার করে কলেজের অধ্যক্ষ নাসির উদ্দিন খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আন্দোলনকারীরা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিচ্ছে। নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে আমি কখনই জড়িত ছিলাম না।’

ছেলেকে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করার জন্য কলেজ ফান্ড থেকে ১৫ লাখ টাকা নিয়েছেন দাবি করে তিনি বলেন, ‘শিক্ষক-কর্মচারীদের ২৪ মাসের বেতন ভাতা বকেয়া আছে।’ 

সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি ও স্থানীয় এমপি অ্যাডভোকেট মোসলেম উদ্দিন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কলেজে অনার্স কোর্স খোলাসহ শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে।’

অর্থ লেনদেনের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি এবং আমার পরিবারকে হেয় করার জন্যই মিথ্যাচার করছে আন্দোলনরত শিক্ষকরা। সমস্যা সমাধানে শিক্ষকদের সঙ্গে আমি বসতে চেয়েছি কিন্তু তারা বসেননি।’

এদিকে ফুলবাড়িয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক জানান, ‘সময়মত অ্যাডভোকেট মোসলেম উদ্দিন এমপি উদ্যোগ নিলে হয়ত বা এই সহিংসতা এড়ানো যেত।’ শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগসহ কলেজ ফান্ড থেকে লুটপাটের বিষয়টি শুনেছেন বলে তিনি জানান।  

আরও পড়ুন-

নিরাপত্তা ঝুঁকিতে বিটিভি 

সংসদের মূল নকশা এসেছে

/এআর/এফএস/

 

 

 

লাইভ

টপ