শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভে অশান্ত আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল এলাকা

Send
নাদিম হোসেন, সাভার২৩:৪৫, ডিসেম্বর ২০, ২০১৬

শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের চাপা ক্ষোভ, মজুরি বৃদ্ধি, বিনা কারণে তাদের ওপর নির্যাতনসহ বিভিন্ন কারণে অশান্ত হয়ে উঠেছে আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল এলাকা। টানা নয় দিন শ্রমিক অসন্তোষের মুখে বন্ধ হয়ে গেছে শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলো। বাধ্য হয়ে অর্ধশতাধিক কারখানায় ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। এর সত্যতা নিশ্চিত করেছে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এর ফলে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় মারাত্মক ক্ষতির আশঙ্কা করছে মালিকপক্ষ।আশুলিয়ায় শ্রমিকদের বিক্ষোভ


উইন্ডো গার্মেন্টেসের শ্রমিক রিপন হাসান, বান্দো ডিজাইনের হালিমা বেগমসহ একাধিক শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিন কারখানা কর্তৃপক্ষ তাদের বিভিন্ন ভাতা ও সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে আসছে। প্রতিনিয়ত তারা মালিকপক্ষের নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে। আবার অনেক সময় মালিকপক্ষের নিষ্ঠুর নির্যাতনের কারণে অনেক শ্রমিকের জীবন দিতে হয়েছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদ জানালেও কোনও বিচার হয়নি। আবার অনেক কারখানায় অনিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তারা কাজ করে আসছে। কাজ করতে গিয়ে কোনও শ্রমিক নিহত হলে তার পাওনা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় না। এসব কারণে দীর্ঘদিন ধরে তাদের মধ্যে চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১২ নভেম্বর আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার উইন্ডি অ্যাপারেলসসহ আশপাশের আরও ৪/৫টি পোশাক কারখানায় শ্রমিকরা কর্মবিরতি শুরু করে। টানা তিন দিন কর্ম বিরতি পালন করার পরও মালিকপক্ষের কোনও সাড়া পাওয়া যায়নি। এরপর থেকেই তাদের আন্দোলন ছড়িয়ে যেতে শুরু করে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৫ নভেম্বর বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমানের মালিকানাধীন স্টার্লিং ক্রিয়েশন, সেড ফ্যাশন, উইন্ডি গ্রুপ, জেবিএস, ডিজাইনার জিন্স, বান্দো ডিজাইন, সেতারা অ্যাপারেলস, দি রোজ ড্রেসেস, এএম ডিজাইনসহ ১০টি কারখানার শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আন্দোলন শুরু করে দেয়। এর পরের দিন তাদের সঙ্গে পাশের আরও ১০টি কারখানার শ্রমিকরা যোগ দিলে মোট ২০টি কারখানায় এ কর্মবিরতি ছড়িয়ে পরে। এভাবে ২০ নভেম্বর পর্যন্ত আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল এলাকার প্রায় অর্ধশতাধিক কারখানার শ্রমিকরা মজুরি বৃদ্ধিসহ ১৬দফা দাবিতে বিক্ষোভ শুরু করে। এক পর্যায়ে তারা মঙ্গলবার সড়ক ও মহাসড়কে অবরোধ করলে পুলিশ টিয়ারশেল ও লাঠিচার্য করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
শ্রমিকরা অভিযোগ করে বলেন, আমরা আমাদের কর্মস্থলে প্রতিনিয়ত মালিকপক্ষের কাছে নির্যাতিত হই। অথচ এর প্রতিবাদ করলে কর্তৃপক্ষ যখন ইচ্ছে শ্রমিকদের ছাটাই করে দেয়। এছাড়াও মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করছি।
শ্রমিকদের আন্দোলনের বিষয়ে আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার একাধিক কারখানার মালিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা এ বিষয়ে কোনও কথা বলতে রাজি হননি।
তবে আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকার এস ২১ অ্যাপারেলস কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক উৎপল জানান, গত কয়েকদিন শ্রমিকদের অব্যাহত আন্দোলনের কারণে পোশাক শিল্প হুমকির মুখে পড়ে যাচ্ছে। শ্রমিকরা হঠাৎ করেই অন্যায়ভাবে তাদের আন্দোলন শুরু করায় বন্ধ হয়ে গেছে তাদের উৎপাদন ব্যবস্থা। এতে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে তাদের। খুব শিগগিরই এই আন্দোলন বন্ধ না হলে পোশাক শিল্প হুমকির মধ্যে পড়ে যাবে।
কিছু শ্রমিকের হঠাৎ এমন আন্দোলনে নামাকে সমর্থন করছে না শ্রমিকদেরই আরেকটি সংগঠন বাংলাদেশ রেডিমেট গার্মেন্টস ওয়ার্কার ফেডারেশন। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সুমি আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কিছু শ্রমিক হঠাৎ করেই কাউকে কিছু না জানিয়ে অন্যায়ভাবে আন্দোলন শুরু করেছে। মজুরি বৃদ্ধির আইন ও সময় আছে। কিন্তু ওরা কেন হঠাৎ করেই এভাবে আন্দোলন শুরু করে দিয়েছে বিষয়টি তাদের জানা নেই।’ তিনি আরও বলেন, শ্রমিক অসন্তোষের এক সপ্তাহর বেশি সময় পার হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনও লিখিত দাবি তারা কেন জানায়নি সেটাও রহস্যজনক।
তবে বর্তমান বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বৃদ্ধি ও মালিকপক্ষের নির্যাতনসহ বিভিন্ন কারণে শ্রমিকদের মধ্যে চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এসব কারণে তারা হয়তো হঠাৎ করেই এ আন্দোলন শুরু করে দিয়েছে বলে ধারণা করেন তিনি।
এ ব্যাপারে আশুলিয়া শিল্প পুলিশের পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অব্যাহত শ্রমিক অসন্তোষের মুখে আশুলিয়ার অর্ধশতাধিক কারখানা ছুটি ঘোষণা করে রাখা হয়েছে। তবে যেকোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে রাখা হয়েছে।
/এআর/টিএন/

লাইভ

টপ