রসরাজের আড়াই মাসের জেলজীবন

Send
উজ্জল চক্রবর্তী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশিত : ১৬:০৪, জানুয়ারি ১৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১২, জানুয়ারি ১৭, ২০১৭

কারামুক্ত হলেন রসরাজ

জেলের ভেতরেও সেলবন্দি ছিলেন রসরাজ দাস (২৭)। অন্য আসামিরা কারাগারের ভেতরে এদিক সেদিক হাঁটাচলা করতে পারলেও ২৪ ঘণ্টা ধরেই একটি কক্ষে বন্দি অবস্থায় থাকতে হয়েছে তাকে। অবশেষে দুই মাস ১৯ দিন পর আজ মঙ্গলবার জামিনে ছাড়া পেয়ে সাংবাদিকদের এ অভিজ্ঞতার কথা জানান তিনি। রসরাজ জানিয়েছেন, যাই ঘটুক নিজ গ্রামে ফিরে যাবেন তিনি। আর তার মামা ইন্দ্রজিত জানিয়েছেন, গ্রামের মুরুব্বিদের হাতে তুলে দেওয়া হবে তাকে। তারাই ঠিক করবেন এরপর সে কী করবে।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গত ৩০ অক্টোবর গ্রেফতার করা হয়েছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার হরিণবেড় গ্রামের রসরাজ দাসকে (২৭)। আজ  মঙ্গলবার দুপুর পৌনে ১টায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগার থেকে তিনি বেরিয়ে আসেন। কারামুক্ত হওয়ার পর কারাফটকে মামা ইন্দ্রজিত দাস তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর রসরাজ সেই দিনকার ঘটনা সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরেন। তিনি জানান, ‘ফেসবুকে কী হয়েছে এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানতেন না। তখন তিনি বিলে মাছ ধরছিলেন। হঠাৎ করে একদল লোক এসে তাকে মারধর শুরু করে ধরে নিয়ে যায়। পরে তাকে আহত  অবস্থায় পুলিশের কাছে তুলে দেওয়া হয়।’

রসরাজ জানান, ‘ফেসবুকে ছবি দেখার জন্য চাচাতো ভাইকে বলেছিলেন একটি আইডি খুলে দিতে। এর বেশি তিনি কিছু জানতেন না।’

কারাগার থেকে বের হয়ে রসরাজ বললেন, ‘এখন বাড়ি ফিরে মা-বাবার কাছে যাব। সেখানে আগের পেশা মাছ ধরার কাজে থাকব। মা-বাবাকে রোজগার করে খাওয়াতে পারলেই খুশি হবো।’

জেল থেকে বের হওয়ার পর রসরাজ

কারাবন্দি জীবনের দিনগুলোর কথা তুলে ধরে রসরাজ বলেন,‘আমাকে গ্রেফতারের পর দেখতে পেলাম আমাদের এলাকার অনেকেই জেলখানায় বন্দি। জেলখানার ভেতরে তারা ঘুরে ফিরে বেড়ায়। আর আমাকে আলাদা একটি সেলের মধ্যে বন্দি অবস্থায় রাখা হয়েছিল। কারো সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হতো না। ২৪ ঘণ্টা একটি সেলের মধ্যে রাখা হতো।’

আলাদা রাখার ব্যাপারে রসরাজ জেল সুপারের কাছে জানতে চাইলে তিনি রসরাজকে জানান, ‘নিরাপত্তার কথা ভেবেই তাকে আলাদা সেলে রাখা হয়েছে।’

মুক্তি পাওয়ার পর নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ প্রকাশ করে রসরাজ বলেন, ‘অপরাধ করিনি। এলাকায় যাব। কপালে যা হবার হবে।’  

জেল গেইটে রসরাজের মামা ইন্দ্রজিত দাস জানান, ‘ভাগ্নেকে নিয়ে তার গ্রামে যাবো। এলাকার মুরব্বিদের কাছে তাকে তুলে দেবো। এর বেশি কিবা (কিইবা) করার আছে।’

রসরাজের বোনের জামাতা নেপাল দাস বলেন, ‘আমিও এখন রসরাজের সঙ্গে হরিপুর যাব। তাকে সেখানেই রেখে আসব। তবে সে আমার এখানে থাকতে চাইলে আমি সেই ব্যবস্থা করবো।’

কারাফটকে রসরাজের আইনজীবী মো. নাসির মিয়া জানান, সোমবার সকালে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আসামি রসরাজ দাসের উপস্থিতিতে তার জামিনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে জেলা ও দায়রা জজ মো. ইসমাইল হোসেন পরবর্তী পুলিশ প্রতিবেদন না দেওয়া পর্যন্ত রসরাজের জামিন মঞ্জুর করেন।

এরপর আইনজীবীদের সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা হন রসরাজ। এর আগে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রসরাজ দাসের জামিননামার ছাড়পত্র আদালত থেকে জেলা কারাগারে এসে পৌঁছায়।

উল্লেখ্য, গত ২৯ অক্টোবর ফেসবুকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর গ্রামের রসরাজ দাসকে এলাকার একদল লোক মারধর করে পুলিশের কাছে তুলে দেয়। এ ঘটনার পরের দিন ৩০ অক্টোবর নাসিরনগর থানায় তথ্য প্রযুক্তি আইনে একটি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। 

সেদিনই নাসিরনগর উপজেলা সদরে একদল লোক দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের ১০ মন্দিরসহ শতাধিক বাড়িঘর ভাঙচুর করে। এ ঘটনার পর নাসিরনগর থানায় মোট আটটি মামলা হয়। এসব মামলায় কয়েক হাজার লোককে আসামি করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ এখন পর্যন্ত ১০৭ জনকে গ্রেফতার করে জেলা হাজতে পাঠিয়েছে।

 

/বিটি/টিএন/

আরও পড়ুন: জেল থেকে ছাড়া পেলেন রসরাজ

লাইভ

টপ