ইমামতি না ছাড়াই কাল হলো ফজলুলের!

Send
ইব্রাহিম রনি, চাঁদপুর
প্রকাশিত : ০৯:৫০, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:০৮, ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৭

চাঁদপুরচাঁদপুরের মতলবে মসজিদের ইমামতি না ছাড়াই কাল হলো মাওলানা ফজলুল হকের। তাকে ইমামতি ছেড়ে দিতে স্থানীয় মসজিদ কমিটির কয়েকজন চাপ দিচ্ছিল। এছাড়া ধারণা করা হচ্ছে, ঘাতক ইয়াকুব খান বিপ্লব মসজিদের দানবাক্স থেকে চুরি করার বিষয়টি ইমাম জানতেন। এ কারণে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
এদিকে ঘটনার রহস্য উদঘাটন করতে বিপ্লবকে রিমান্ডে নেওয়ার আদেশ দিয়েছেন আদালত।
তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই রফিকুল ইসলাম জানান, মসজিদের ইমাম মাওলানা ফজলুল হক হত্যার রহস্য উদঘাটনে হত্যা মামলার আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতের কাছে ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করলে আদালত ২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, আদালতের আদেশ হাতে পেয়েছি, শনিবার তাকে রিমান্ডে নেওয়া হবে।
স্থানীয় সূত্র ও স্বজনরা জানান, ১৯৯৩ সালে মতলব গার্লস স্কুল থেকে অবসরের পর মতলব পৌরসভার দাসপাড়া এলাকার কাশেম পাগলাবাড়ি জামে মসজিদের ইমামতি শুরু করেন ফজলুল হক। প্রায় ১৫ বছর আগে বাড়ির পাশে ওই মসজিদ উদ্বোধনকালে তাকে ইমাম হিসেবে নিয়োগ দেন ঢাকায় বসবাসরত শফিকুল আনোয়ার। সে সময় তিনি বলেন, যতদিন তার (ফজলুল হক) জ্ঞান-বুদ্ধি এবং বেঁচে থাকবেন, ততোদিন তিনি ইমামতি করবেন। মসজিদ উদ্বোধনের পর মসজিদ কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু এই কমিটির পক্ষ থেকে কখনোই বেতন-ভাতা দেওয়া হতো না। ঢাকা থেকে শফিকুল আনোয়ার প্রতিমাসে ১ হাজার টাকা করে পাঠাতেন।
স্বজনরা জানান, কিছুদিন ধরে মসজিদ কমিটির লোকজন ফজলুলকে ইমামতি ছাড়ার জন্য অনুরোধ করেন। তারা নতুন একজন ইমামকে নিয়োগ দিতে চায়। তখন ইমাম জবাবে বলেন, যিনি আমাকে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি বললে আমি ইমামতি করবো না।
এরমধ্যে গত কয়েক মাস ধরে পাশের বাড়ির মাদকাসক্ত যুবক বিপ্লব মসজিদে নামাজ পড়া শুরু করে। মাঝে মধ্যে সে আযানও দিতো। হঠাৎ একদিন সে মসজিদের দানবাক্সের তালা ভেঙে টাকা চুরি করে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে ধারণা করে মসজিদের ইমাম তার চুরির কথা জানতে পেরেছে। এরপর থেকে মসজিদ কমিটির পাশাপাশি বিপ্লবও মসজিদে না আসার জন্য ফজলুলকে বলে।
স্বজনরা আরও জানান, কিছুদিন আগে ফজলুল অসুস্থ হয়ে পড়লে তারা তাকে বাড়িতে নিয়ে আসে। এ সুযোগে মসজিদ কমিটির লোকজন তাকে আবারও ইমামতি না করার জন্য অনুরোধ করে। কিন্তু ফজলুল বলেন, তিনি সুস্থ হয়ে যাবেন। কিন্তু কমিটি তা না শুনে তাদের পক্ষ থেকে নতুন ইমাম এনে মসজিদে জুমার নামাজ পড়ায়।
নিহত ইমামের মেয়ে নাছিমা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, নতুন ইমাম আনার পর বাবার বেডিং-পত্র সেখান থেকে নিয়ে আসি। পরে আমরা মসজিদ কমিটির অন্যতম সদস্য মোস্তফার কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি বলেন- হুজুরই (ফজলুল) নামাজ পড়াবেন। এর পরদিন বৃহস্পতিবার (৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুর একটায় আযান দেওয়ার পরপরই বিপ্লব মসজিদে ঢুকে আমার বাবাকে লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। পরে আমরা খবর পেয়ে তাকে উদ্ধার করে মতলব দক্ষিণ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করাই। কর্তব্যরত চিকিৎসক তার অবস্থা খারাপ দেখে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে রেফার করে। সেখানে যাওয়ার পরপরই বাবা মারা যান।

তিনি আরও বলেন, আমরা এ হত্যার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
মতলব পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর কিশোর কুমার ঘোষ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এ ঘটনার পরে আমি মাদকাসক্ত বিপ্লবকে পুলিশে ধরিয়ে দেই। সে এক সপ্তাহ আগে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছে।
ইমাম নিয়োগ বিষয়ে ঝামেলার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করে বলেন, ওই মসজিদে নামাজ পড়েন মাত্র ১০-১২ জন মুসল্লি। ওইখানে ঝামেলা হওয়ার কারণ নেই।
মতলব দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কুতুবউদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ইমামকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় একজনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু ওইখানে ইমাম নিয়োগ নিয়ে ঝামেলার ছিল বলে জানা গেছে, তাই এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার (৯ ফেব্রুয়ারি) যোহরের নামাজের আযানের পর মতলব পৌরসভার দাসপাড়া এলাকার কাশেম পাগলাবাড়ি জামে মসজিদের ইমামকে পিটিয়ে হত্যা করে বিপ্লব (৩৫)। পরে ওই দিন রাত ১০টার দিকে মতলব দক্ষিণ থানা পুলিশ তাকে আটক করে।
/এআর/

লাইভ

টপ