শরণার্থী রোহিঙ্গাদের ‘মিথ্যাবাদী’ বললো মিয়ানমারের প্রতিনিধি দল

আবদুল আজিজ, কক্সবাজার২০:১৭, মার্চ ২০, ২০১৭

কক্সবাজারে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলকক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে শরণার্থীদের কথা শোনার সময় তাদের ‘মিথ্যাবাদী’ হিসেবে অভিহিত করেছে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দল। ক্ষুব্ধ রোহিঙ্গারা সাংবাদিকদের এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। প্রতিনিধি দলটিকে ‘কথিত’ দাবি করে রোহিঙ্গারা দাবি করেছেন, মিয়ানমার সরকারের রাষ্ট্রীয় পরামর্শক অং সান সুচি গঠিত এই তদন্ত কমিশনের সদস্যরা এখানে কৌশলে প্রতারণা করতে এসেছিলেন।

রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মিয়ানমারের ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দলটি রবিবার (১৯ মার্চ) ও সোমবার (২০ মার্চ) কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। এ সময় রোহিঙ্গাদের কাছে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার কারণ জানতে চেয়েছিলেন তারা।
বালুখালী শরণার্থী ক্যাম্পের বাসিন্দা ফরিদা আকতার বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তারা আমাদের কাছে দেশ ছেড়ে আসার কারণ জানতে চেয়েছিল। এর উত্তরে আমরা আমাদের ওপর সেনাবাহিনীর নানা নির্যাতনের কথা তুলে ধরি। কিন্তু এসব কাহিনী শুনতে গিয়ে প্রতিনিধি দলটির সদস্যরা উষ্মা প্রকাশ করেন এবং তাদের সেনাবাহিনী এসব কাজ করতে পারে না বলতে থাকেন। তারা প্রকাশ্যেই রোহিঙ্গাদের ‘মিথ্যাবাদী’ও বলেন।
একই ক্যাম্পের ইয়াসমিন আকতার জানান, বাংলাদেশে পালিয়ে আসার কারণ হিসেবে তিনি প্রতিনিধিদলকে নারীদের ধর্ষণ, শিশুহত্যাসহ নানান নির্যাতনের কথা বলেছেন। কিন্তু প্রতিনিধিরা রোহিঙ্গাদের প্রতি এসব নির্যাতনের ঘটনা মানতে রাজি হননি। রোহিঙ্গাদের মুখে নির্যাতনের বর্ণনা শুনলেও মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ অস্বীকার করে প্রতিনিধি দলটি।

কক্সবাজারে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলরবিবার মিয়ানমারের ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দলটি কক্সবাজার এসে প্রথমে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে। এরপর শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে নতুন আসা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলাপ করেন দলটির সদস্যরা। সোমবার সকালে উখিয়া উপজেলার বালুখালীর অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে, বিকালে উখিয়া উপজেলার কুতুপালং ক্যাম্প ঘুরে প্রতিনিধি দলটি সন্ধ্যার আগে পর্যন্ত টেকনাফের লেদা ক্যাম্পে ছিল। তবে দিনব্যাপী রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বললেও তাদের অভিযোগগুলোকে তেমন আমলে নিয়েছেন বলে মনে হয়নি ক্যাম্পবাসী রোহিঙ্গাদের।

রোহিঙ্গাদের অনেকেই পরিবেশ সৃষ্টি হলে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেও এ নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া দেখাননি প্রতিনিধিরা। হাফেজ আহমদ নামের একজনের মন্তব্য, মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা কৌশলে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে প্রতারণা করতে এসেছে। তাদের কাছে অনেক রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন। দেশটিতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত হলে তারা ফিরে যেতে ইচ্ছুক। কিন্তু এর কোনও উত্তর দেননি এসব প্রতিনিধি।

এদিকে রোহিঙ্গাদের দাবি, এটি একটি কথিত প্রতিনিধি দল। যারা নির্যাতনের কথা শুনে উল্টো রোহিঙ্গাদের মিথ্যুক, মিথ্যাবাদী বলে মন্তব্য করেছেন। প্রতিনিধিদের একজনকে মিয়ানমারের ভাষায় ‘বাংলাদেশে পালিয়ে এসে রোহিঙ্গারা মিথ্যা গল্প বলছে’ বলে মন্তব্য করতে শোনা গেছে বলে জানান আনোয়ার কামাল নামের এক যুবক।

এদিকে, দুই দিন ধরে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে কী অভিজ্ঞতা হলো তা নিয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেননি ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দলের কেউ। এমনকি প্রতিনিধিদের সঙ্গে থাকা আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার কর্মকর্তারাও এ প্রসঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।

কক্সবাজারে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলপ্রসঙ্গত, গত বছরের ৯ অক্টোবর মিয়ানমারে সংঘাতের পর দেশটির সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য মতে, এ ঘটনায় নতুন করে ৭০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে চলে আসে বাংলাদেশে। তারা আশ্রয় নিয়েছেন কক্সবাজারের কুতুপালং, বালুখালী, টেকনাফের লেদা ও শামলাপুরসহ বিভিন্ন এলাকায়।

এসব ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত হলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে রোহিঙ্গা ক্যাম্প। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের কূটনৈতিক, জাতিসংঘের প্রতিনিধি, মিয়ানমারের কফি আনান কমিশনসহ বিভিন্ন ব্যক্তিরা এসব শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করে তাদের নির্যাতনের কথা শুনেছেন।

সবশেষ রবিবার কক্সবাজারের আসেন মিয়ানমার সরকারের রাষ্ট্রীয় পরামর্শক অং সান সুচি কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিশনের ১০ সদস্য। তারা দুই দিন ধরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। রোহিঙ্গারা তাদের কাছেও নির্যাতনের ভয়াবহতা তুলে ধরেন।

/জেএইচ/টিএন/

লাইভ

টপ