behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

চাঁদা তোলা হলেও ২৭ বছর ধরে অচল রাকসু

সিরাজুচ ছালেকীন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়০৯:৫২, মে ১৯, ২০১৭

রাকসুকমিটি না থাকায় ২৭ বছর ধরে অচল হয়ে আছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)। অথচ এই খাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়মিতভাবেই চাঁদা আদায় করে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ফলে গণতান্ত্রিক পন্থায় অধিকার আদায়সহ শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে বিভিন্ন কার্যক্রম থমকে আছে। রাকসু সচল না থাকায় শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে কথা বলারও কেউ নেই। আবার ছাত্র সংসদ না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বও গড়ে উঠছে না বলে অভিমত শিক্ষক ও ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতাদের।

১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর প্রথম রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৬-৫৭ মেয়াদে। ওই সময় এর নাম ছিল রাজশাহী ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (রাসু)। মাঝখানে আইয়ুব খানের শাসনামলে এর কার্যক্রম বন্ধ থাকার পর ১৯৬২ সালে এটি যাত্রা শুরু করে রাকসু নামে। এখন পর্যন্ত ১৪ বার রাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় রাকসুর ১৯৮৯-৯০ মেয়াদের জন্য। এর মধ্যে ১৯৭০ থেকে ১৯৭২ সাল কোনও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। পরে সামরিক শাসনামলে ১৯৭৫ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত এবং ১৯৮১ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত বন্ধ ছিল এই ছাত্র সংসদের নির্বাচন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্রে বলা আছে, বাস্তব জীবনে কর্মদক্ষতা, যোগ্য নাগরিক ও নেতৃত্ব গড়ে তুলতে, দেশ-বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও অনুমোদিত কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া, বক্তৃতা, লিখন, বিতর্ক ইত্যাদিতে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ানোর জন্য এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে সর্বাধিক সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করার জন্য শিক্ষার্থীদের উজ্জীবিত করতে কাজ করবে রাকসু। এছাড়া মানবিক-সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ড আয়োজনও ছিল রাকসুর কর্মসূচিতে।

কিন্তু গত ২৭ বছর ধরে রাকসু অচলই বলা চলে। এর বিকল্প কোনও সংগঠনও দাঁড়ায়নি। ফলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যত থমকে আছে শিক্ষার্থীদের মানবিক-সামাজিক করে গড়ে তোলার মাধ্যমে জাতীয় নেতৃত্ব তৈরির কাজ। একইসঙ্গে বন্ধ হয়ে গেছে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া আদায়ের সুযোগ।

এদিকে, দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে রাকসু বন্ধ থাকলেও থেমে নেই রাকসুর চাঁদা আদায়। প্রতিবছরই ভর্তির সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ১৫ টাকা হারে চাঁদা আদায় করা হয় রাকসুর নামে। রাকসুর কোনও কার্যক্রমই যেখানে নেই, সেখানে প্রতিবছর প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে এ বাবদ চাঁদা আদায় নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা বিভাগের শিক্ষার্থী আতিক রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রাকসুর কার্যক্রম তো বন্ধ। তাহলে আমাদের কাছ থেকে কেন টাকা নেওয়া হচ্ছে? এই টাকাগুলো কোথায় যাচ্ছে? রাকসুর নির্বাচন-ই যদি না হয়, ভবিষ্যতেই বা এই টাকা দিয়ে কী করা হবে?’

রাকসুর নামে চাঁদা আদায় প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাকসুর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মীর ইমাম ইবনে ওয়াহেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিবছর আদায় করা টাকাগুলো জমা আছে। রাকসু চালু হলে এই টাকা কাজে লাগানো হবে।’ তবে কত টাকা জমা আছে- সেই প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দিতে চাননি।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অনেকের রাকসু সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই। রাকসুর কার্যক্রম কী, এমনকি রাকসু ভবনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোথায় অবস্থিত— সেটাও জানেন না তারা। তাদের অনেকের কাছেই রাকসু ভবনটি সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। কারণ, রাকসুর নিজস্ব কার্যক্রমের অবর্তমানে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ওই ভবনটিতে কার্যক্রম চালাচ্ছে।রাকসু

এদিকে, স্বায়ত্বশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ঠিক রেখে মেধাবী নেতৃত্ব গড়ে তুলতে দ্রুত রাকসু নির্বাচন দেওয়ার দাবি করছেন ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতারা।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ সৎ, যোগ্য ও মেধাবী নেতৃত্ব গড়ে তুলতে রাকসু নির্বাচনের বিকল্প নেই। এছাড়া, শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দবি আদায়ের জন্যও রাকসু নির্বাচন জরুরি। তাই দ্রুত রাকসু নির্বাচন দিয়ে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে আমরা উপাচার্য বরাবর একটি স্মারকলিপিও দিয়েছি।’

এদিকে, শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনায় না নিয়ে নিজেদের কর্তৃত্ব ধরে রাখতেই রাকসু নির্বাচন দিতে প্রশাসন আগ্রহী নয় বলে মন্তব্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলামের। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন ও দাবির বিষয়ে কথা বলার কোনও জায়গা নেই। রাকসুর নির্বাচন নেই বলে মেধাবী নেতৃত্বও উঠে আসছে না।’

রাকসু সচল না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে সুসংস্কৃতি গড়ে উঠছে না বলে মনে করেন বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রী রাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক দিলীপ রায়। তিনি বলেন, ‘নব্বইয়ের পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ করে দেওয়া হলো। কারণ, এই নির্বাচন দেওয়া হলে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনগুলো সুবিধা করতে পারত না। এতে করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে সংস্কৃতি গড়ে ওঠার কথা, সেটা হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় তো সুনাগরিক গড়ে তোলার কারখানা হিসেবে কাজ করে। সেই কাজটাই হচ্ছে না।’

কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি আব্দুল মজিদ অন্তর বলেন, ‘রাকসু নির্বাচন সবারই দাবি ছিল। কারণ, রাকসু না থাকায় এখানে শিক্ষার্থীদের কোনও অধিকার নেই, তাদের পক্ষে কথা বলার কেউ নেই।’ রাকসু নির্বাচন হলে স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্য বজায় থাকবে বলেও মত দেন তিনি।

রাকসু নিয়ে কথাসাহিত্যিক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক হাসান আজিজুল হক বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের একটা সংগঠন দরকার, যেখানে তারা জাতীয় রাজনীতির লেজুরবৃত্তির বাইরে এসে শিক্ষার্থী হিসেবে সবকিছু তদারকি করবে। আমার মনে হয়, শিক্ষার্থীদের দ্বারা নির্বাচিত রাকসু প্রতিনিধি রাবিতে ছিল সেকথা অনেকেই ভুলে গেছেন। সেটাকে চালু করার কথা বলার মানুষও নেই।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুস সোবহান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একটা শৃঙ্খলার মধ্যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের স্বকীয়তাই আলাদা। তারা শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত হবেন, তাদের সমস্যার কথাই তুলে ধরবেন। এতে যে শক্তি থাকবে, সেটা অন্য কোনও রাজনৈতিক সংগঠনের ব্যানারে হওয়া সম্ভব নয়।’

নির্বাচন দেওয়ার ব্যাপারে উপাচার্য বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা কী চায়, তা দেখে ছাত্র সংসদ নির্বাচন দিতে হবে। এই নির্বাচন দিতে আমার সমস্যা নেই। তবে আগে নির্বাচনের একটা পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আমি আশা করি, ছাত্র সংগঠনগুলো যদি ঠিক থাকে এবং তারা যদি সে পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তাহলে রাকসুতে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই থাকবেন।’

/টিআর/এফএস/টিএন/

আরও পড়ুন-
দুই শিক্ষার্থী ধর্ষণ মামলা: তদন্তে ফাঁক রাখতে চায় না পুলিশ

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ