মুসাতেই আটকে আছে মিতু হত্যার তদন্ত, জুলাইয়ে চার্জশিট

হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
০৪ জুন ২০১৭, ২০:০৮আপডেট : ০৪ জুন ২০১৭, ২০:১১

মাহমুদা খানম মিতু হত্যাকাণ্ড

সাবেক এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যাকাণ্ডের এক বছর পূর্ণ হলো আজ। দীর্ঘ এক বছরেও আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উম্মোচিত হয়নি। কে বা কারা, কী কারণে তাকে হত্যা করেছে, তা সাধারণ মানুষের কাছে এখনও রহস্যই থেকে গেছে। যাকে পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের মূলহোতা বলে দাবি করছে এসপি বাবুলের সোর্স সেই কামরুল ইসলাম মুসাকে এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি। তবে পুলিশ জানিয়েছে, আগামী জুলাই মাসের মধ্যে এ ঘটনায় আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে।

পুলিশের দাবি, মুসাকে গ্রেফতার করতে পারলেই আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ জানা যাবে। কার নির্দেশে কেন তাকে হত্যা করা হয়েছে এ তথ্যও বেরিয়ে আসবে।

সিএমপি পুলিশ কমিশনার ইকবাল বাহার বলেন, হত্যাকাণ্ডটি কারা ঘটিয়েছে, কিভাবে তা সংঘটিত হয়েছে এটা সবাই জানেন। মুসার নেতৃত্বেই হত্যার ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছে। আমরা এখন জানার চেষ্টা করছি, মুসা এটি নিজে থেকে করেছে, নাকি অন্য কারো আদেশে হত্যাকান্ডটি ঘটিয়েছে।

তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের সবার পরিচয় আমরা পেয়েছি। জড়িত অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু একটা জায়গায় আমরা কিছুটা হলেও থমকে আছি। তা হচ্ছে মুসাকে এখনও আমরা গ্রেফতার করতে পারিনি। মুসাকে গ্রেফতার করা ছাড়া এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন করা সম্ভব নয়। আমরা তাকে ধরার চেষ্টা করছি।

পুলিশ কমিশনার বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর আমরা সমস্ত সীমান্তে তথ্য পাঠিয়েছি। মুসাকে ধরতে ইতোমধ্যে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছে। তাকে পাওয়া আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজন। তখন পুরোপুরি ঘটনা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

এসময় তিনি আগামী মাসে (জুলাই) মধ্যে আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়ার আশ্বাস দেন।

পুলিশ কমিশনার বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। আগামী জুলাই মাসের মধ্যে মামলাটি শেষ করার চেষ্টা করবো। জুলাই মাসের মধ্যে চার্জশিট দাখিল করবো। ততদিনে মুসা গ্রেফতার না হলে তাকে পলাতক দেখিয়ে চার্জশিট দেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

এদিকে, পুলিশ মুসাকে গ্রেফতার করতে পারেনি বলে এ হত্যাকাণ্ডের শুরু থেকেই দাবি করলেও মুসার স্ত্রী পান্না আক্তার দাবি করেছেন, মুসা পুলিশ হেফাজতেই রয়েছেন! ঘটনার পর গত বছরের ২২ জুন ডিবি পুলিশ মুসাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় বলে তিনি জানান।

পান্না আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার স্বামী (মুসা) পুলিশ হেফাজতে আছে এবং জীবিতই আছে। ঘটনার পর গত বছরের ২২ জুন সকাল ৭টার দিকে ডিবির লোকজন তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। ওই দিন পুলিশ প্রথমে আমার ভাসুরকে গ্রেফতার করে। পরে আমাকে ও আমার দুই সন্তানকে জিম্মি করে মুসাকে ডেকে আনে। সে বাসার নিচ তলায় আসার পরপরই তাকে পুলিশ গ্রেফতার করে।’

তিনি বলেন, ‘‘মুসাকে ডিবি পুলিশের সদস্য নেজাম উদ্দিন গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর উনি কাউকে কল করে বলেছেন, ‘স্যার মুসা গ্রেফতার।’ নেজাম উদ্দিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই মুসা’র বিষয়ে সব তথ্য পাওয়া যাবে।''

মাহমুদা খানম মিতু

পান্না আক্তার আরও বলেন, ‘এ ঘটনায় আমি ৪ জুলাই সংবাদ সম্মেলন করেছি। ২৫ জুলাই আবারও সংবাদ সম্মেলন করতে গেলে পুলিশের পক্ষ থেকে আমাকে সংবাদ সম্মেলন না করতে হুমকি দেওয়া হয়। তারা আমাকে হুমকি দিয়ে বলে যদি সংবাদ সম্মেলন করি, তারা আমার স্বামীকে ক্রসফায়ার দিয়ে দিবে।’

গত ৫ জুন নগরীর জিইসি মোড় এলাকায় মাহমুদা খানম মিতুকে ছুরিকাঘাত ও গুলি করে হত্যা করে পালিয়ে যায় তিনজন মোটরসাইকেল আরোহী। এ ঘটনায় বাবুল আক্তার নগরীর পাঞ্চলাইশ থানায় অজ্ঞাত তিনজনের নামে একটি মামলা করেন। মামলাটি চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি) তদন্ত করছে।

মামলায় ৯ আসামি মধ্যে মুসা এবং কালু ছাড়া অন্যদের গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গ্রেফতার ৫ আসামি এখন কারাগারে রয়েছেন। নুর নবী ও নুরুল ইসলাম রাশেদ নামে আরও দুই আসামি পুলিশের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুক যুদ্ধে’ মারা যান। 

ঘটনার পর গত বছরের ৬ জুন নগরীর বাদুরতলা এলাকার একটি গ্যারেজ থেকে পুলিশ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে। ১১ জুন মতিঝর্ণা এলাকা থেকে শাহ জামান রবিনকে আটক করে আদালতে হাজির করে।

২৬ জুন হত্যাকারী মোতালেব মিয়া ওয়াসিম এবং আনোয়ারকে আটক করে গোয়েন্দারা। স্বীকারোক্তিতে তারা দাবি করে, ‘মুসা এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করে এবং টাকার বিনিময়ে তাদের ভাড়া করা হয়। ঘটনার দিন মুসা মিতুর মাথায় গুলি করে এবং নবী তাকে ছুরিকাঘাত করে। রাশেদ, শাহজাহান ও কালু তাদের সহযোগিতা করে। অস্ত্র সরবরাহ করে ভোলা।’

২৮ জুন নগরীর বাকালিয়া এলাকা থেকে অস্ত্রসহ এহতেশামুল হক ভোলা ওরফে হানিফুল হক ওরফে ভোলাইয়া এবং তার সহযোগী মনিরকে আটক করে পুলিশ। পরে পুলিশ মোটরসাইকেল সরবরাহ করার অভিযোগে রাঙ্গুনিয়া থেকে মুসার বড় ভাই সাইফুল ইসলাম সাকু এবং শাহজাহানকে আটক করে।

৫ জুলাই গোয়েন্দা বিভাগ জানায়, রানির হাট এলাকায় অভিযান চলাকালে পুলিশের সঙ্গে বন্দুক যুদ্ধে রাশেদ এবং নবী নিহত হয়। যদিও ২ জুলাই রাশেদের বাবা এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ২৩ জুন সাদা পোশাকের পুলিশ বাড়ি থেকে রাশেদ ও নবীকে তুলে নিয়ে যায় এবং তারপর থেকেই তারা নিখোঁজ ছিল।

অন্যদিকে মিতু হত্যার ঘটনায় একাধিকবার জিজ্ঞাসাবাদ করেছে মামলার বাদী সাবেক এসপি বাবুল আক্তারকে। এর মধ্যে ২৫ জুন নাটকীয়ভাবে বাবুল আক্তারকে ঢাকায় তার শ্বশুরবাড়ি থেকে গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে ১৫ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওই দিন তার কাছ থেকে পদত্যাগপত্রে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হয়। গত ৬ সেপ্টেম্বর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। একই ঘটনায় গত ১৭ ডিসেম্বর বাবুল আক্তার সিএমপি কার্যালয়ে এসে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেন।

এ ঘটনায় পুলিশ বাবুল আক্তারের শ্বশুর মোশারফ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলেছে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি এ ঘটনায় বাবুল আক্তারের শ্যালিকা শাহেলা মোশারফকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘তদন্ত কাজে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। প্রধান আসামি কামরুল ইসলাম মুসাকে ধরার চেষ্টা করছি। তার অবস্থান এখনও শনাক্ত করা যায়নি। পরিকল্পনার পেছনে কে বা কারা রয়েছে তাও মোটামুটি জানা হয়েছে। মুসাকে গ্রেফতার করতে পারলেই আদালতে চার্জশিট দিয়ে দেবো।

/টিএন/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
সান মারিনোর বিপক্ষে বাংলাদেশ ম্যাচে প্রথমবার থাকছে ভিএআর 
সান মারিনোর বিপক্ষে বাংলাদেশ ম্যাচে প্রথমবার থাকছে ভিএআর 
বিদুৎ-জ্বালানির দাম কমানোর দাবি এনসিপির
বিদুৎ-জ্বালানির দাম কমানোর দাবি এনসিপির
ভৈরবে রেলপথ অবরোধ: ৫টি ট্রেন মাঝরাস্তায় আটকা, চলাচল ব্যাহত
ভৈরবে রেলপথ অবরোধ: ৫টি ট্রেন মাঝরাস্তায় আটকা, চলাচল ব্যাহত
‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীকে নোবেল দিলে সেটা তারেক রহমান পাবেন’
‘পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রধানমন্ত্রীকে নোবেল দিলে সেটা তারেক রহমান পাবেন’
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি