নড়াইলের সড়ক-মহাসড়ক যেন খানাখন্দ আর কাঁদার স্তূপ

Send
সুলতান মাহমুদ, নড়াইল
প্রকাশিত : ১৩:৪৬, জুন ২০, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০০, জুন ২০, ২০১৭

ভাঙাচোরা আর খানাখন্দে ভরা নড়াইলের বেশির ভাগ সড়কনড়াইলের বেশির ভাগ সড়ক-মহাসড়ক ভেঙে খানা-খন্দে পরিণত হয়েছে। শুধু পিচ নয়, অনেক সড়কে পাথর, খোয়া ও বালি পর্যন্ত উঠে গেছে। এসব ভাঙাচেরা সড়কে বৃষ্টির পানি জমে একেবারে চলাচলের অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে। সড়কে বড় বড় গর্তের কারণে একদিন বৃষ্টি হলেই প্রায় এক সপ্তাহ পানি জমে থাকে।

এছাড়া বেশির ভাগ সড়কের পাশে প্রয়োজনীয় জায়গা এবং মাটি না থাকায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে গেছে। এ জেলার বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কের বেহাল অবস্থায় ঈদে ঘরমুখো মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হবে বলে জানিয়েছেন বিভিন্ন যানবাহনের চালকসহ ভুক্তভোগীরা।

সড়কের পাশে নেই প্রয়োজনীয় জায়গা ও মাটিগ্রামীণ সড়কগুলোর অবস্থা বেশি খারাপ বলে জানা গেছে। এছাড়া সড়ক-মহাসড়কের গা ঘেঁষে গড়ে ওঠা ইট ভাটাগুলো আরও বিপদজনক হয়ে দেখা দিয়েছে। ভাটার কাঁদামাটি বৃষ্টিতে ধুয়ে প্রতিনিয়ত পড়ছে সড়ক-মহাসড়কের ওপরে। এতে যানবাহন চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন চালকরা। এমনকি পায়ে হেঁটে চলাচল করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। ভাটার কাঁদামাটি মাখা সড়ক-মহাসড়কগুলো দেখে হঠাৎ করে বোঝার উপায় নেই সড়কটি পাকা না কাঁচা!

সড়ক ও জনপথ (সওজ) সূত্রে জানা গেছে, নড়াইলে সওজ বিভাগের অধীনে ১৭০ দশমিক এক কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়ক রয়েছে। এছাড়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের (এলজিআই) আওতায় দুই হাজার ৯৫২ কিলোমিটার গ্রামীণ রাস্তা রয়েছে। এর মধ্যে এলজিইডির ৪৫২ কিলোমিটার এবং এলজিআই’র দুই হাজার ৫০০ কিলোমিটার রাস্তা রয়েছে। এলজিআই হচ্ছে-ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পরিষদ। সেক্ষেত্রে এলজিআই’র রাস্তাগুলোর অবস্থা সবচেয়ে করুণ।

আমাদা আদর্শ কলেজের অধ্যক্ষ আল ফয়সাল খান জানান, নাড়ির টানে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহর থেকে লোকজন গ্রামের বাড়ি নড়াইলে আসতে শুরু করেছেন। দু’তিন দিনের মধ্যে এ সংখ্যা আরও বাড়বে। এক্ষেত্রে গ্রামীণ রাস্তাগুলো বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু, বেশির ভাগ রাস্তায় পিচ ও খোয়া উঠে চলাচল অনুপোযোগী হয়ে পড়েছে। ছোট-বড় গর্তে পানি জমে আছে। ফলে ঈদযাত্রায় মানুষের ভোগান্তি বাড়বে।

গোবরা মিত্র মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ আনোয়ার হোসেন জানান, নড়াইল-গোবরা-ফুলতলা সড়কের অবস্থা খুবই করুণ। এই সড়কের বীড়গ্রাম বটতলা, গোবরা কলেজ ও বাজার এলাকাসহ বিভিন্ন স্থান ভেঙে গেছে। প্রায় চার বছর ধরে এ অবস্থা। একদিন বৃষ্টি হলে এই সড়কের ভাঙাচেরা অংশে সপ্তাহখানেক পানি জমে থাকে।

রূপগঞ্জ বাজারের ব্যবসায়ী খোকন দেবনাথ বলেন, নড়াইল-লোহাগড়া-কালনা-ভাটিয়াপাড়া-যশোর জাতীয় মহাসড়কটি মাঝে-মধ্যে একটু-আধটু সংস্কার করলেও বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সড়কটির দুই পাশে নিচু থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই পানি জমে যায়। মোটরসাইকেলসহ ছোট যানবাহন চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়ে। সড়কের অধিকাংশ জায়গা ভেঙে  চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে আবার অবৈধ দখলে আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নড়াইল-যশোর সড়কের বাসচালক মকতুল হোসেন বলেন, এ সড়কে চরম ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীরা  যাতায়াত করছেন। এছাড়া নড়াইল-মাগুরা-মাইজপাড়া সড়কের প্রবেশমুখে এলজিইডি ও পুলিশ সুপার কার্যালয়ের মাঝামাঝি সড়কের ওপর দীর্ঘদিন ধরে ইট ও বালি কে বা কারা ফেলে রেখেছেন। কিন্তু তা সরাতে কর্তৃপক্ষ কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

অপর বাসচালক মোফাজ্জল হোসেন জানান, ভাটিয়াপাড়া-কালনা-লোহাগড়া-নড়াইল সড়কের এড়েন্দা, চৌগাছা ও মাদরাসা বাসস্ট্যান্ড এবং লক্ষীপাশা মোল্যার মাঠ এলাকায় বড় বড় গাছের গুড়ি ফেলে রাখা হয়েছে। এ কারণে রাস্তা সরু হয়ে গেছে। এছাড়া সড়কের ওপর ট্রাক দাঁড় করিয়ে প্রায় দিনই ঘণ্টার পর ঘন্টা গাছের গুড়ি উঠানো হয়। এতে যানবাহন চলাচলে সমস্যা হচ্ছে।

বাস, ট্রাক, কার ও মাইক্রোবাসের কয়েকজন চালক জানান, নড়াইল-কালনা-ঢাকা, নড়াইল-যশোর, নড়াইল-মাগুরা, লোহাগড়া-নহাটা-কালিশংকরপুর-মহম্মদপুর, নড়াইল-গোবরা-ফুলতলা, নড়াইল-কালিয়া, লোহাগড়া-নড়াগাতি, নড়াইল-তুলারামপুর-মাইজপাড়া, তেরখাদা-বড়নাল-কালিয়া সড়কের পাশে প্রয়োজনীয় মাটি এবং জায়গা না থাকায় দু’টি যানবাহন পাশ কাটতে গেলে খাদে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। গত ১২ জানুয়ারি নড়াইল-মাগুরা সড়কের ধোন্দা এলাকায় যাত্রীবাহী বাস গর্তে পড়ে দুই যাত্রী নিহত এবং অন্তত ৩০ জন আহত হন। নড়াইল-গোবরা সড়কের কাড়ারবিল এলাকায় বিপদজনক অবস্থায় একটি মরা গাছ দীর্ঘদিন ধরে সড়কের পাশে পড়ে থাকলেও কর্তৃপক্ষ উদাসীন।

এদিকে, জেলা শহরের রূপগঞ্জ মুচিপোল সংযোগ সড়ক এলাকা থেকে ভওয়াখালী যাওয়ার রাস্তাটি দীর্ঘ ৯ মাস পানিতে ডুবে আছে বলে জানিয়েছেন ওই সড়কের বসবাসরত শফিকুল ইসলাম নান্নু। সামান্য বৃষ্টি হলেই নড়াইল পুরাতন বাস টার্মিনাল এলাকায় পানি জমে যাচ্ছে।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) জেলা সভাপতি সৈয়দ খায়রুল আলম জানান, নড়াইল-কালনা মহাসড়কের গা ঘেঁষে পাঁচটি ইটভাটা গড়ে উঠেছে। এছাড়া লোহাগড়ার এড়েন্দা-আমাদা-লুটিয়া সড়কে দু’টি এবং নড়াইল-কালিয়া সড়কের আউড়িয়ায় একটি ইটভাটা সড়কের গা ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে। এসব ভাটার মাটি পাহাড়ের মতো স্তূপ করে রাখা হয়েছে। বৃষ্টিতে ভাটার কাঁদামাটি সড়ক-মহাসড়কের ওপর পড়ে চলাচল অনুপোযোগী হয়ে গেছে। মোটরসাইকেলসহ দুই এবং তিন চাকার গাড়িগুলো ভাটার কাছে প্রায়ই দুর্ঘটনায় পতিত হয়। দুই বছরের ব্যবধানে ভাটা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় এক শিশুসহ তিনজন নিহত হয়েছেন।

নড়াইল জেলা বাস-মিনিবাস, কোচ, মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক এবং বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ছাদেক আহম্মেদ খান বলেন, নড়াইলে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ১৭০ কিলোমিটার পাঁকা রাস্তার মধ্যে ৭৫ ভাগ সড়কের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ। একেবারেই চলাচল অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগ নড়াইলের নির্বাহী প্রকৌশলী তাপসী দাশ দাবি করে বলেন, জেলার সড়ক-মহাসড়কগুলোর অবস্থা ভালো। তেমন কোনও সমস্যা নেই। 

এ ব্যাপারে এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আবু ছায়েদ বলেন, বরাদ্দ পেলে পর্যায়ক্রমে সড়কগুলো সংস্কার করা হবে।

/বিএল/

লাইভ

টপ