চালের দাম কে বাড়ায়?

তৌহিদ জামান, যশোর১৪:২৮, জুন ২০, ২০১৭

গত সপ্তায় যে চাল কিনেছিলাম ৫২ টাকা কেজি আজ  সেই চাল ৬০ টাকা। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে আমাদের কী হবে? কথাগুলো বলছিলেন যশোরের এক খাবারের হোটেলের কর্মচারী মনির হোসেন।

চালের বাজার নিয়ন্ত্রণে প্রতিবার ঈদের আগে ভিজিএফের মাধ্যমে সরকার চাল বিতরণ করে। কিন্তু এবার চালের পরিবর্তে গম দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। যশোরে চালের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে খুচরা বিক্রেতা, পাইকার এবং মিলাররা একে অপরকে এবং রাষ্ট্রীয় পলিসিকে দোষারোপ করছেন। তবে, মূল্য নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনও উদ্যোগ সহসা মিলছে না।

যশোর বড়বাজারের চাল ব্যবসায়ী বিষ্ণু সাহা জানান, তারা মিনিকেট খুচরা বিক্রি করছেন ৫০ থেকে ৫২ টাকায়, বিআর-২৮ বিক্রি হচ্ছে ৪৫ থেকে ৪৭ টাকায়, স্বর্ণা বিক্রি করছেন ৪৪ থেকে ৪৬ টাকায়, তেমনি রত্না ৩৮ থেকে ৪০ টাকা, হিরা ৩৬ থেকে ৩৭ টাকা, জিরা মিনিকেট ৪৭ থেকে ৫০, সুপার মিনিকেট ৫১ থেকে ৫৩ টাকা, মিনিকেট ৪৪ থেকে ৪৮ টাকায় এবং বাংলামতি ৬০ টাকা থেকে ৬৫ টাকা কেজি দরে।

খুচরা চাল বিক্রেতা আইউব আলী সানা বলেন, ‘এখন আমরা চাল বিক্রি করতে ভয় পাচ্ছি। বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হচ্ছে। কেননা মাস ছয়েক আগেও যে মোটা চালের দাম ছিল ৩০ থেকে ৩২ টাকা; তা চার মাস পরে বিক্রি করতে হচ্ছে ৪৭ থেকে ৪৮ টাকা কেজি দরে। মিলার বা আড়ৎদাররা যেভাবে চালের দাম হঠাৎ করে বাড়ায়, খুচরা বিক্রেতারা তা পারেন না। সে কারণে অনেক খুচরা বিক্রেতারা চাল বিক্রি বন্ধ করার কথা ভাবছেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘যশোর অঞ্চলে চালের যে চাহিদা, সে অনুযায়ী যোগান হয় না। এখানে চাহিদার এক তৃতীয়াংশ উৎপাদন হয়। বাকি চাল বা ধান উত্তরাঞ্চল থেকে আসে। কিন্তু প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এবার ধানের উৎপাদন কম হওয়ায় মূলত এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।’

তিনি জানান, চাল মূলত একটি সিন্ডিকেটের দখলে রয়ে গেছে। খুচরা বিক্রেতারা সরাসরি মিলারদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহ করতে পারেন না; তাদের আড়ৎ থেকেই নিতে হয়।

যশোরের অন্যতম চালের পাইকার বিপ্লব চৌধুরী বলেন, ‘চালের দাম অস্বাভাবিক বেড়েছে মূলত আমদানিতে শুল্ক আরোপের কারণে। চালের দাম বাড়লে, যেখানে কম সেখান থেকেই আমদানি করতে হয়। কিন্তু ভারত থেকে চাল আমদানিতে প্রায় ২৮ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, চালের দাম বাড়ানোর আরেকটি কারণ এই অঞ্চলে অধিক অটো রাইস মিলের সংখ্যা। তারা মওসুমের পুরো ধান কিনে স্টক করে; অপরদিকে, ধনী কৃষকরাও দাম বেশি পাওয়ার জন্যে ধান ছাড়ে না। এর ফলে বাজারে চালের সরবরাহ কমে যায় এবং দামও বাড়ে।

তিনি বলেন, ‘সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নিলে চালের দাম কমানো সময়ের ব্যাপার।’

আনিসুর রহমান নামে এক মিলার (পরশ অটো রাইস মিলের মালিক) চালের দাম বৃদ্ধিতে মিলারদের হাত রয়েছে- এমন কথা মানতে নারাজ।

তিনি বলেন, চাহিদা অনুযায়ী যোগান না হলে দাম বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। এবারে ধানের ব্লাস্ট রোগ, অধিক বৃষ্টি, হাওর-বাঁওড়ে ধান ডুবে যাওয়ায় ধানের ফলন খুব কম। চাষিরা তাদের কাক্ষিত ধান পাননি।

তিনি বলেন, সরকার নির্ধারিত ৪৫ দিনের বেশি চাল মজুত করা সম্ভব নয়; যারা এসব অভিযোগ করছেন- তারা ঠিক বলছেন না।

তিনি বলেন, সরকার যদি শুল্ক তুলে দেয়, ‘তাহলে ১০-১৫ দিনের জন্যে চালের দাম কমবে। কেননা এখন ভারতে চালের দাম কম হলেও শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে তারা আবার চালের দাম বাড়িয়ে দেবে।’

বড়বাজার চাল ব্যবসায়ী সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুশীল বিশ্বাস জানান, এ বছর প্রচুর বর্ষার কারণে অধিকাংশ ধানক্ষেত নষ্ট হয়। ধানে চিটাসহ ফলনও কম হয়েছে। তাছাড়া মিলাররা ধান ও চাল স্টক করায়ও এ অবস্থার সৃষ্টি হয়।

তার মতে, সরকার যদি উদ্যোগ গ্রহণ করে তাহলে চালের দাম কমতে পারে। তিনি আশাবাদী ঈদের পরপরই চালের দাম কিছুটা কমবে।

যশোর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নকীব ইসলাম বলেন, যশোরে চালের কোনও চাহিদা নেই; কেননা চাল বিতরণের কোন খাতও নেই। এখন টিআর-কাবিখা সব প্রকল্পে টাকা দেওয়া হয়। আর ঈদের আগে ভিজিএফের প্রায় ৩২শ’ টন গম সুবিধাভোগীদের মাঝে বিতরণ করা হবে।

এ বিষয়ে যশোরের নবাগত জেলা প্রশাসক মো. আশরাফ উদ্দিন বলেন, চালের দাম নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার সচেষ্ট। যশোরের ব্যবসায়ীরা যদি শুল্ক প্রত্যাহারের বিষয়টি ডিমান্ড করেন তবে, আমি বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দফতরে পাঠাতে পারি। কেননা এটি পলিসিগত বিষয়; স্থানীয়ভাবে সমাধান করা যায় না।

/বিএল/

লাইভ

টপ