পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্তরা কোথায় ফিরবেন

Send
জসিম মজুমদার, খাগড়াছড়ি
প্রকাশিত : ০৭:৪৫, জুলাই ০৪, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৩, জুলাই ০৪, ২০১৭

খাগড়াছড়িতে পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্ত একটি বাড়িখাগড়াছড়ির রামগড় ও লক্ষিছড়ি উপজেলায় মারাত্মক পাহাড় ধসের ২০ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও নিজেদের বসতবাড়িতে ফিরতে সাহস করছেন না পাহাড় ধসের শিকার পরিবারগুলো। চরম অনিশ্চয়তা নিয়ে তারা দিন কাটাচ্ছেন অনাহারে-অর্ধাহারে। কেউ থাকছেন আত্মীয়ের বাড়িতে, কেউ অন্যের জায়গায় অস্থায়ী ঘর তুলে। পাহাড়ে থাকা নিজেদের বসতবাড়িগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার কারণেই তারা অস্থায়ী এসব বাসস্থানে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনও পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে না। যদিও জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন করা হবে।

গত ১৮ জুন ভোর সাড়ে ৫টার দিকে রামগড়ের বুদংছড়ায় পাহাড়চাপা পড়ে বিধ্বস্ত হয় মো. মোস্তফা মিয়ার একটি মাটির ঘর। এ ঘটনায় তার ১৪ বছর বয়সী ছেলে নুরুন্নবী ও ১০ বছর বয়সী ছেলে মো. হোসেন ঘটনাস্থলেই মারা যায়। সেই শোক এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেননি তিনি।

মোস্তফা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওই দিনের পাহাড় ধসের আতঙ্ক থেকে আমরা এখনও বেরিয়ে আসতে পারিনি। নির্ঘুম রাত আর চোখের জলই এখন আমার পুরো পরিবারের সম্বল।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘কষ্ট আরও বেড়ে যায় যখন দেখি রাষ্ট্র, সরকার কেউ আমাদের পাশে নেই।’

পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহয়তা করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে মোস্তফা বলেন, ‘রামগড় উপজেলা থেকে ৪০ হাজার টাকা ও ৬০ কেজি চাল দেওয়া হয়েছে। পরে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি দিয়েছে ১০ হাজার টাকা, খাগড়াছড়ি ব্লাড ডোনার অ্যাসোসিয়েশন দিয়েছে পাঁচ হাজার টাকা আর সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা দিয়েছেন ৫০ হাজার টাকা। কিন্তু আমাদের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সাহস নেই।’

পাহাড় ধসের পর উদ্ধার তৎপরতা

রামগড় উপজেলার নাকাপা এলাকার জয়নাল আবেদীন জানান, পাহাড় ধসে তার ঘরটি বিধ্বস্ত হয়েছেন। এর পর থেকেই তিনি থাকছেন আর এক আত্মীয়ের বাড়িতে। বসতবাড়ির জায়গা ছাড়া আর কোনও জায়গা নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জানি না আমাদের ভবিষ্যৎ কী।’

জয়নাল জানান, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা খাগড়াছড়ি ব্লাড ডোনারস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে তিন হাজার টাকা পেয়েছেন তিনি। এর বাইরে সরকারি কোনও সহযোগিতা পাননি তিনি।

লক্ষিছড়ি উপজেলার যতীন্দ্র কার্বারি পাড়ার দেবব্রত চাকমা বলেন, ‘ওই দিন (১৮ জুন) সকালে আমার ঘরও ধসে পড়ে। আমার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে ইটন চাকমাকেও হারিয়েছি। কোনোকিছু দিয়েই এই ক্ষতি ঢেকে দেওয়া যাবে না। সব হারিয়ে আমরা এখন শরণার্থীদের মতো জীবনযাপন করছি।’

পাহাড়ে নিরাপদে জীবনযাপনের জন্য প্রশাসনের উদ্যোগ না থাকার কথা উল্লেখ করে দেবব্রত বলেন, ‘আমরা নিরাপদ স্থানে ঘরবাড়ি করে বাঁচতে চাই। পাহাড়ের পাদদেশে বাস করা মানেই মৃত্যুর মুখে বাস করা। এ বিষয়ে প্রশাসন থেকে সহয়তা না করলে আমরা কোথায় যাবো?’

লক্ষিছড়ি উপজেলার বর্মাছড়ি এলাকার প্রাণকৃত্য চাকমা বলেন, ‘পাহাড় ধসে আমার ছেলে পরিমল প্রাণ হারিয়েছে। ওই ঘরে আর থাকতে চাই না। নিরাপদ এলাকায় ঘরবাড়ি করে থাকতে চাই। কিন্তু সেই সুযোগ কে দেবে?’

পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে সরকারি উদ্যোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. রাশেদুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘খাগড়াছড়িতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চারটি পরিবার। প্রশাসনের পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাও তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। আমরা এই চার পরিবারকে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছি। এছাড়া, যারা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছে, তাদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী সব পরিবারকে নিরাপদে পুনর্বাসন করা হবে।’

/টিআর/আপ-এমপি/

লাইভ

টপ