Vision  ad on bangla Tribune

‘ভালো ছেলে’ আলমগীরের জঙ্গি হওয়া মানতে পারছেন না স্বজনরা

হিমাদ্রি শেখর ভদ্র, সুনামগঞ্জ০৪:০০, জুলাই ১৮, ২০১৭

আশুলিয়ায় র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হওয়া রাশেদসহ ৪ জঙ্গিঢাকার আশুলিয়ায় র‌্যাবের অভিযানে আটক জঙ্গী আলমগীর হোসেন (২১) সিলেট ও সুনামগঞ্জের অন্তত ৫টি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছে। গত বছর সংসারে অনটনের কারণে পড়াশোনা বাদ দিয়ে নরসিংদীর একটি সুতার কারখানায় কাজ শুরু করে সে। চলতি বছরের মার্চ মাসে বাড়িতে গেলেও গত দুই মাস ধরে সে কোনও যোগাযোগ করেনি। এমনকি কোনও টাকা-পয়সাও পাঠায়নি। আলমগীরের আত্মীয় ও এলাকাবাসীরা তাকে ধার্মিক, ভদ্র ও ভালো ছেলে হিসেবে জানতেন। তার জঙ্গি হওয়ার ঘটনাটি অবাক করেছে অনেককেই। আলমগীরের সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার ভীমখালী ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর গ্রামে তার আত্মীয় ও লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

কৃষ্ণনগর গ্রামটিতে মোট জনসংখ্যা ৪০০ জনের মতো। গ্রামটিতে বসবাসরত ৩৩টি পরিবারের মধ্যে ২৯টিই ভূমিহীন। হাওরে মাছ ধরা আর কৃষিকাজ করেই জীবন চলে গ্রামের মানুষের। পিয়াই নদী ও দীঘার হাওর বেস্টিত গ্রামটির বেশির ভাগ মানুষই বাস করেন দারিদ্রসীমার নিচে। যাতায়াতের একমাত্র উপায় নৌকা। গ্রামজুড়েই তীব্র অভাবে ছাপ চোখে পড়ার মতো। এমনই একটি পরিবারের সন্তান আলমগীর।

সোমবার গ্রামটিতে পৌঁছার পর সাংবাদিক পরিচয়ের কথা ছড়িয়ে পড়ে গ্রামে। ভীড় জমে যায় আলমগীরের বাড়ির ছোট্ট আঙিনায়। তার পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কৃষক আব্দুল হান্নান ও আকলিমা দম্পতির তিন ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে আলমগীর বড়। তার ছোট দুই ভাই পড়াশোনা করছে আর একমাত্র বোন ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে।

আলমগীরের বাড়ি

জানা গেলো, আলমগীরের বাবা সাত বছর আগে সিলেটের মাছিমপুর এলাকায় হকার হিসেবে কাজ করতেন। ব্যবসায় লোকসান হওয়ায় তিনি গ্রামে ফিরে এসে সরকারি জায়গায় ঘর করে বসবাস শুরু করেন। কিন্তু তেমন আয়-রোজগার না থাকায় সংসারের স্বাচ্ছন্দ্য আসেনি। অভাব-অনটনের কারণে দীর্ঘদিন আলমগীর বিভিন্ন মানুষের সহযোগিতায় একাধিক মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছে। এসব মাদ্রাসার মধ্যে রয়েছে, মাছিমপুর জামেয়া ইসলামিয়া, জামলাবাজ মাদ্রাসা, কামরুপদলং মাদ্রাসা, গাজীনগর মাদ্রাসা ও হায়দরপুর মাদ্রাসা একসময় বাবার কথায় লেখাপড়া ছেড়ে রোজগারের পথে নামে সে। এক আত্মীয়ের সহযোগিতায় নরসিংদীর একটি সুতার কারখানায় কাজের ব্যবস্থা করে দেন তার বাবা। চার মাস আগে বাড়িতে গেলেও গত দুই মাস ধরে কোনও যোগাযোগ ও টাকা-পয়সা পাঠায়নি বলে জানালেন তার পরিবারের লোকজন।

আলমগীর জঙ্গি তৎপরতার সঙ্গে জড়িত- বিষয়টি তার স্বজনরা বিশ্বাস করতে পারছেন না। আলমগীরের সৎমা আকলিমা বেগম জানান, সংসারের অভাব দূর করার জন্য তাকে নরসিংদীর একটি সুতার কারখানায় কাজে পাঠিয়ে ছিলেন তারা । কিন্তু সেখানে গিয়ে সে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়েছে এটা তিনি বিশ্বাস করতে পারছেন না। ছেলে যদি জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে তিনি তার শাস্তি চান। কিন্তু কোনও সম্পৃক্ততা না থাকলে ছেলের মুক্তি চান। 

আলমগীরের বাড়িতে মানুষের ভিড়

কৃষ্ণনগর গ্রামের বাসিন্দা ও আলমগীরের এক চাচাতো ভাই বলেন, ‘সে মিশুক প্রকৃতির ছিল। সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকতো। হঠাৎ করে কিভাবে আলমগীর জঙ্গিবাদে জড়ালো তা ভেবে কুল কিনারা পাচ্ছি  না।’ 

আলমগীরের ফুফু তৈয়বুনেচ্ছা বলেন, ‘কামাই কইরা সংসারের হাল ধরবো, ছোটছোট ভাইবোনের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিব। অখন হে কোন পথে গেলো বুঝি না।’

জাকির হোসেন নামের ব্যক্তি বলেন, ‘সে জীবনের শুরুতে মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছে। খুব ধর্মভীরু ছেলে আলমগীর। লেখাপড়ার জন্য ১২ বছর বয়স থেকেই বিভিন্ন মাদ্রাসার হোস্টেলে থাকত।’

গোলাম রব্বানী নামের অপর একজন বলেন, ‘আমরা তাকে ভালো ছেলে বলে জানি। যে তারে মগজধোলাই করে জঙ্গি বানাইছে তারে খুঁজে বের করার দাবি জানাই সরকারের কাছে।’

তোফায়েল আহমদ বলেন, ‘হান্নানের (আলমগীরের বাবা) পরিবারের লোকসংখ্যার তুলনায় আয়-রোজগার করার লোক নাই। সবাই তার কাছে আশা করছিলো ভালো কিছু করবো। অখন হে (সে) কোনডা করলো বুঝলাম না। হে যদি স্বাক্ষী-প্রমাণে দোষী হয় তাহলে শাস্তি পাক, না হলে মুক্তিপাক।’ 

৮নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল কদ্দুছ বলেন, ‘আলমগীর ভালো ছেলে ছিল। হঠাৎ করে সে কেন জঙ্গি সংগঠনে জড়িয়ে পড়লো তা ভেবে দেখা দরকার।’

পুলিশ সুপার মো. বরকতুল্লাহ বলেন, ‘আলমগীর সুনামগঞ্জ ও সিলেটের ৫টি মাদ্রাসায় লেখাপড়া করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের খোঁজ-খবর সংগ্রহ করছে পুলিশ। তাকে কারা, কেন জঙ্গি তৎপরতায় জড়ালো এর শেকড় অনুসন্ধান করতে সুনামগঞ্জ পুলিশ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।’ 

উল্লেখ্য, রবিবার (১৬ জুলাই) আশুলিয়া থানার নয়ারহাট চৌরাপাড়া এলাকার জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে চার জঙ্গি আত্মসমর্পণ করে। পরে তাদের আটক করে র‍্যাব হেফাজতে নেওয়া হয়।  দুপুরে আত্মসমর্পণ করা চার জঙ্গির পরিচয় জানায় র‍্যাব। আলমগীর ছাড়া অন্যরা হলো, ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল থানার সাংকিভাদা গ্রামের মোজাম্মেল হক মাসুদ (১৮), চট্টগ্রাম জেলার রাউজান থানার কদলপুর মিয়াজি গ্রামের রফিকুল ইসলামের ছেলে ইফরানুল ইসলাম ওরফে সুফিয়ান খান (২০), গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি থানার উদাখালী গ্রামের রাশেদুল নবী রাশেদ (২২)।

/এএ/

লাইভ

টপ