চাল মজুদে অভিযুক্ত রশিদ ও লায়েকের বিষয়ে যা জানা গেলো

Send
কুদরতে খোদা সবুজ, কুষ্টিয়া ও আলমগীর চৌধূরী, জয়পুরহাট
প্রকাশিত : ২২:০৫, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৪৫, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৭

আব্দুর রশিদ (বাঁয়ে) ও লায়েক আলীগুদামে অতিরিক্ত চাল মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে বাংলাদেশ রাইস মিল অ্যাসেসিয়েশনের চেয়ারম্যান আব্দুর রশিদ ও সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলীকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। কুষ্টিয়ায় আবদুর রশিদের ১৩টি গোডাউনে মাসের পর মাস বিপুল পরিমাণ চাল মজুদ থাকার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। আর জয়পুরহাটের চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে ব্যবসায়ীদের নেতা নির্বাচিত হলেও লায়েক আলীর ব্যবসার পরিধি তত বড় নয়। গ্রেফতারের নির্দেশ আসার পর আব্দুর রশিদকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আর লায়েক আলী তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

কুষ্টিয়ায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের বৃহত্তম চালের মোকাম কুষ্টিয়ার খাজা নগরে বাংলাদেশ চালকল মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুর রশিদের মালিকানাধীন গোডাউনে বিপুল পরিমাণ ধান মজুদের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি বেশি দামে চাল বিক্রির অভিযোগে তার চাল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান রশিদ অ্যাগ্রোকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানাও করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

সর্বশেষ রবিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বিকালে কুষ্টিয়ার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান ও পুলিশ সুপার এসএম মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে বিপুল সংখ্যক পুলিশ রশিদ অ্যাগ্রো ফুড লিমিটেডে অভিযান চালায়। তবে তার গুদামে সন্দেহজনক কিছু খুঁজে পাওয়া যায়নি।

জানা যায়, খাজানগর চালকল মোকাম এলাকার আইলচারায় রশিদ অ্যাগ্রো ফুডের চারটি স্বয়ংক্রিয় চালকল ও অফিসে প্রতিদিন ৫০০টন চাল উৎপাদিত হয়। যাতে ধান লাগে ৮০০ মেট্রিক টন।

গত ১১ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত আব্দুর রশিদের মিলের ১৩টি গোডাউনে অভিযান চালায়। অভিযান শেষে কর্মকর্তারা জানান, এসব গোডাউনে হাজার হাজার বস্তা ধান মজুদ করে রাখা হয়েছে। কতদিন আগে এসব ধান কেনা হয়েছে তা মিলের কর্মকর্তারা জানাতে পারেননি।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সাইফুল ইসলাম জানান, ‘চার থেকে পাঁচ মাস বা তারও বেশি সময় আগে এসব ধান কিনে গোডাউনে রাখা হয়েছে। আব্দুর রশিদের একেকটি গোডাউনে তিন থেকে চার হাজার বস্তা পর্যন্ত ধান মজুদ আছে। আর প্রতি বস্তায় ৭১ কেজি করে ধান রয়েছে।’

এই কর্মকর্তা আরও জানান, ‘মিলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিদিন ৫০০টন চাল উৎপাদন হয় রশিদের মিলে। প্রতিকেজিতে ৫ টাকার ওপরে মুনাফা করায় প্রতিদিনই অতিরিক্ত লাভ হয়েছে ২৫ লাখ টাকা। এক মাসেই আব্দুর রশিদ চাল বিক্রি করে অতিরিক্ত মুনাফা করেছেন সাড়ে ৭ কোটি টাকা। অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত এক মাসের ব্যবধানেই এই মোকামে মিনিকেট চালের দাম বেড়েছে কেজি প্রতি ৫টাকা।’

কুষ্টিয়া চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি হাজি রবিউল ইসলাম বলেন, ‘কিছু অসাধু মিলার সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে ইচ্ছামতো ধান-চাল মজুদ করে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এসব মিল মালিকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না। ’

অভিযোগের বিষয়ে চালকল মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুর রশিদের মুঠোফনে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার বাসায় গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।

আব্দুর রশিদের কোনও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা আছে কিনা, এ বিষয়ে খোঁজ নিলে কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সিনিয়র এক নেতা জানান, ‘রশিদ আগে বিএনপির সদস্য ছিলেন। এখন আর বিএনপি করেন না। এখন নিষ্ক্রিয়।’

তবে জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ মেহেদি আহমেদ রুমি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আব্দুর রশিদ বিএনপি করেন না। তার ভাই আগে বিএনপি করতেন। এখন আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছেন।’ 

আব্দুর রশিদকে গ্রেফতারের নির্দেশ পাওয়া গেছে কিনা, এ বিষয়ে জানতে কুষ্টিয়ার ডিসি (ভারপ্রাপ্ত) হাবিবুর রহমান ও এসপি মেহেদী হাসানকে একাধিক বার ফোন করলেও তারা রিসিভ করেননি।  

এদিকে বাংলাদেশ অটো মেজর অ্যান্ড হাস্কিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক কেএম লায়েক আলীকে গ্রেফতারের বিষয়ে কোনও নির্দেশনা আসেনি বলে জানিয়েছেন জয়পুরহাটের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক তোফাজ্জল হোসেন ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বেলায়েত হোসেন।

এ বিষয়ে কে এম লায়েক আলী জয়পুরহাট শহরের মৌসুমী মার্কেটে তার নিজস্ব অফিসে জানান, গ্রেফতারের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘চালের সংকট সমাধানে আমরা সরকারকে সহযোগিতা করতে সব সময় প্রস্তুত।’

লায়েক আলী জানান, ‘জয়পুরহাটের পেঁচুলিয়া মঙ্গলবাড়িতে মদিনা রাইস মিলে ৪০ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন ক্ষমতার তার নিজস্ব চাতাল রয়েছে। আগে জয়পুরহাট শহরে তালেবুল রাইস মিল নামে তার যে চাতাল ছিল, সেটি বর্তমানে চাতাল গুদাম ঘর। সেখানে এক-দেড়শ বস্তা চাল মজুদ আছে।’

বাংলা ট্রিবিউনকে লায়েক বলেন, ‘আইন বহির্ভূতভাবে যদি কোনও মিলার চাল মজুদ করে তাহলে অবশ্যই তাকে শাস্তি পেতে হবে। সরকার ওইসব অসাধু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিলে আমাদের বলার কিছু থাকবে না। তবে কেউ যেন অন্যায়ভাবে শাস্তি না পায় সেটাও দেখা দরকার।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের আন্তরিকতার কোনও ঘাটতি নেই। আন্তরিকতা ছিল বলেই জয়পুরহাটে এবার সরকারি গুদামে সর্বোচ্চ চাল সংগ্রহ হয়েছে।’

জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার ইটাখোলা বাজারের চৌধুরী অটো রাইস মিলের মালিক ও স্থানীয় ব্যবসায়ী রওনকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘নব্বই এর দশকে জয়পুরহাটে চালকল মালিক সমিতি গঠনের প্রথম উদ্যোগ নিয়েছিলেন লায়েক আলী। তখন তিনি জয়পুরহাট শহরের তালেবুল রাইস মিলের মালিক ছিলেন। এরপর উত্তরবঙ্গ চালকল মালিক সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন তিনি। সাংগঠনিক দক্ষতার কারণে বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ অটোমেজর অ্যান্ড হাস্কিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক। তার ভূমিকার কারণেই উত্তরবঙ্গে চালকল মালিক সমিতি গঠিত হয়েছে। তবে যত বড় পদে তিনি রয়েছেন, ব্যবসায়িক পরিধি তার তত বড় নয়। অন্য জেলা তো দূরের কথা জয়পুরহাটেই তার চেয়ে অনেক বড় বড় চাতাল ব্যবসায়ী আছেন।’

জয়পুরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মোজাহার আলী প্রধান বলেন, ‘ব্যবসায়ী নেতা লায়েক আলী বিএনপি’র একজন সমর্থক বলেই জানি। তবে দলের কোনও পদে তার নাম নেই।’

জয়পুরহাট সদর থানার ওসি (তদন্ত) মোমিনুল হক বলেন, ‘কে এম লায়েক আলীর বিরুদ্ধে থানায় কোনও মামলা অথবা কোনও অভিযোগ নেই।’

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ অটো রাইস মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের দুটি গ্রুপ আছে। একটি গ্রুপ সরকারের সমর্থক। এই গ্রুপের নেতৃত্ব দিচ্ছেন একেএম খোরশেদ আলম খান। তিনি এ সংগঠনের চেয়ারম্যান। অপর গ্রুপটি সরকার বিরোধী বলে দাবি করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম। সেই গ্রুপটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন আব্দুর রশীদ ও সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী।

সরকার সমর্থিত গ্রুপটি রবিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে তার সচিবালস্থ কার্যালয়ে দেখা করেন। এসময় অপর গ্রুপের চেয়ারম্যান আব্দুর রশীদকে (মিনিকেট রশীদ নামে পরিচিত) বিএনপির অর্থ যোগানদাতা ও সাধারণ সম্পাদক লায়েক আলী জামাতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ করেছেন তারা। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ ও খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম এ তথ্য জানান। বণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সরকার সমর্থিত গ্রুপটির বৈঠকের সময় খাদ্যমন্ত্রীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। 

আরও পড়ুন: চাল সংকট: মিল মালিক রশিদ ও লায়েক আলীকে গ্রেফতারের নির্দেশ

/এসআই/এসএনএইচ/এফএস/এমএনএইচ/এএইচ/

লাইভ

টপ