গ্রাম্য সালিশে আড়াই লাখ টাকায় ধর্ষণ চেষ্টা মামলার মীমাংসা

Send
মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৮:৩০, নভেম্বর ১৫, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৩৩, নভেম্বর ১৫, ২০১৭

মানিকগঞ্জ

মানিকগঞ্জে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টায় করা মামলা গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে আড়াই লাখ টাকায় মিমাংসা করা হয়েছে। এ ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা হলেও চেয়ারম্যান, মেম্বার ও সমাজপতিরা গ্রাম্য সালিশ করে অভিযুক্তকে আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ব্যাপারে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, ভুক্তভোগী পরিবারের ক্ষতিপূরণসহ মামলা তুলে নেওয়ার খরচ বাবদ এই জরিমানা করা হয়েছেন।

এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি এ কে এম নুরুল হুদা রুবেল  বলেছেন, ‘এ ধরনের বিচার সালিশের এখতিয়ার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সমাজপতি বা ইউনিয়ন পরিষদের নেই। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে দায়ের করা মামলা আপোস অযোগ্য। যদি কেউ তা করে থাকে তা হলে তারা আইনবিরোধী কাজ করেছেন।’

ঘটনাটি ঘটেছে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দিঘী ইউনিয়নে। ভুক্তভোগী পরিবার এবং মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, দিঘী ইউনিয়নের সপ্তম শ্রেণীর এক ছাত্রীকে গত ৩১ অক্টোবর ধর্ষণের চেষ্টা করে একই ইউনিয়নের ভাটবাউর গ্রামের আনছার উদ্দিনের ছেলে নবীন হোসেন। সে মেয়েটিকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে রাস্তাঘাটে উত্যক্ত করতো। কিন্তু মেয়েটি এবং তার পরিবার বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়নি। ঘটনার দিন ভোরে মেয়েটি ওজু করার জন্য ঘরের বাইরে বের হলে নবীন তার ওপর হামলা চালায়। এসময় মেয়েটির চিৎকারে বাড়ির অন্যরা এগিয়ে এসে নবীনকে হাতেনাতে ধরে ফেলে। মারধর করে নবীনকে বাড়ির উঠানে বেঁধে রাখা হয়। পরে এলাকার চেয়ারম্যান, মেম্বারদের বিষয়টি জানানো হলে তারা বিচারের আশ্বাস দিয়ে নবীনকে ছেড়ে দিতে বলেন। তাদের কথায় তারা নবীনকে ছেড়ে দেয়।

মেয়েটির দাদা মো.আকবর আলী জানান, স্থানীয় চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন মোল্লার আশ্বাসে তারা আইনের আশ্রয় না নিয়ে নবীনকে ছেড়ে দেন। কিন্তু সাত দিনেও তারা নবিনের বিচার  না করায় বাধ্য হয়ে গত ৬ নভেম্বর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন। তিনি নিজে বাদী হয়ে মামলার করেন। মামলায় নবীন হোসেন, তার বাবা আনছার উদ্দিন ও ছোট ভাই কলেজ ছাত্র রাকিব হোসেনকে আসামি করা হয়।

তিনি আরও জানান, আদালত মামলা আমলে নিয়ে তদন্তের জন্য সদর থানাকে নির্দেশ দেন। কিন্তু ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের নির্দেশে সাবেক ইউপি সদস্য জহির উদ্দিনের বাড়িতে শুক্রবার বিকেল চারটা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সালিশ হয়। সালিশে সভাপতিত্ব করেন দিঘী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন মোল্লা। নবীন সালিশে দোষ স্বীকার করেছে। সাত সদস্যের জুড়ি বোর্ড নবীনকে আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করেছে।

এই টাকা তারা নিবে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘চেয়ারম্যান মেম্বার ও সমাজপতিদের অনুরোধ উপেক্ষা করতে না পারায় আমি সালিশের কথা মেনে নিয়েছি। 

জুড়ি বোর্ডের সদস্যরা হলেন, দিঘী ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের সদস্য আবু জাফর, ৭নং ওয়ার্ডের সদস্য নাছির উদ্দিন, আ.সামাদ মাস্টার, সাবেক ইউপি সদস্য জহির উদ্দিন, মানিকগঞ্জ পৌরসভার কাউন্সিলর আবুল কালাম আজাদ, আব্দুল ওহাব ও রফিক মেম্বরা।

এ ব্যাপারে জুড়ি বোর্ডের সদস্য নাছির উদ্দিন ও জহির উদ্দিনের সঙ্গে কথা বললে সলিশের বিষয়টি স্বীকার করে তারা জানান, চেয়ারম্যান মতিন মোল্লার নির্দেশে তারা জুড়ি বোর্ডের সদস্য হয়েছেন। আড়াই লাখ টাকা জরিমানার কথাও তারা স্বীকার করেছেন। জরিমানার একটি অংশ মেয়েটির পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসাব দেওয়া হবে। বাকি টাকায় মামলা তুলে নেওয়া হবে। নাছির উদ্দিনের কাছে টাকা জমা দেওয়া হবে। তবে অভিযুক্তরা এখনও কোনও টাকা জমা দেয়নি।

অভিযুক্ত নবীনের বাবা আনছার উদ্দিনও সালিশে আড়াই লাখ টাকা জরিমানার কথা স্বীকার করে জানান, ‘ তাকে জমি বিক্রি করে এই জরিমানার টাকা দিতে হবে। এখন পর্যন্ত টাকা যোগার করা সম্ভব হয়নি। মামলা থেকে উদ্ধার পাওয়ার আশায় এই সালিশ মেনে নিয়েছি। আমার ছেলে মানসিক প্রতিবন্ধী। তাকে মিথ্যা অভিযোগে ফাসিয়ে দেওয়া হয়েছে।

দিঘী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন মোল্লা সালিশ এবং আড়াই লাখ টাকা জরিমানার কথা স্বীকার করেন  বলেন, ‘বাদী-বিবাদী রাজি থাকলে মামলা করার পরও ইউনিয়ন পরিষদ এ ধরনের অভিযোগের সালিশ বিচার করতে পারে।’

মানিকগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাবিবুল্লাহ সরকারের জানান, আদালত থেকে মামলার কপি হাতে পেয়েছেন। নির্দেশনা অনুযায়ী মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 আরও পড়ুন: মিঠামইনে পাঁচ জনকে হত্যা: ১২৮ জনকে আসামি করে মামলা

/জেবি/

লাইভ

টপ