সেদিন লক্ষ্মীপুরে এডিসি ও চিকিৎসকের মধ্যে যা ঘটেছিল

Send
সাইফুল ইসলাম স্বপন, লক্ষ্মীপুর
প্রকাশিত : ২০:১৭, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৫, ডিসেম্বর ০৭, ২০১৭

এডিসি শেখ মুর্শিদুল ইসলাম ও সাবেক সিভিল সার্জন ডা. সালাহ উদ্দিন শরীফলক্ষ্মীপুরে স্কুল গেট দিয়ে ঢোকাকে কেন্দ্র করে গত সোমবার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি জেনারেল) শেখ মুর্শিদুল ইসলাম ও সাবেক সিভিল সার্জন ডা. সালাহ উদ্দিন শরীফের মধ্যে ঘটা অপ্রীতিকর ঘটনাটি এখনও সারাদেশে আলোচনা-সমালোচনার খোরাক জোগাচ্ছে। সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তুচ্ছ ঘটনায় রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে গায়ে হাত তোলাসহ ক্ষমতার অপব্যবহার করে মোবাইল কোর্ট বসানো এবং শেষ পর্যন্ত এডিসি জেনারেলকে ওএসডি করার ঘটনা নিয়ে জনমনে অনেক কৌতুহল। সবাই জানতে চান প্রকৃত ঘটনা। আসলেই কী ঘটেছিল সেদিন?

গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যানুয়ায়ী, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিসি জেনারেল) শেখ মুর্শিদুল ইসলাম ও সাবেক সিভিল সার্জন ডা. সালাহ উদ্দিন শরীফের মধ্যে সেদিনের বাকবিতণ্ডা গড়ায় বহুদূর। ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ডা. সালাহ উদ্দিনের তিন মাসের জেলের ব্যবস্থা করেন এডিসি। আর তড়িঘড়ি এ রকম বিচারের জেরে এডিসি মুর্শিদুল ইসলামকে জেলা থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ওএসডি করে সরকার। আর হাইকোর্ট আগামী ১৩ ডিসেম্বর মুর্শিদুল ইসলাম ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. নুরুজ্জামানকে তলব করেছেন।

এ পরিস্থিতিতে আসলেই সেদিন কী ঘটেছিল ওই স্কুল গেটে তা জানার চেষ্টা করেছে বাংলা ট্রিবিউন। বুধবার (৬ ডিসেম্বর) দুপুরে লক্ষ্মীপুর কাকলি শিশু অঙ্গনে গিয়ে এই প্রতিবেদকের কথা হয় স্কুলের শিক্ষক, অভিভাবকসহ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে।

কাকলি শিশু অঙ্গনের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক লাইলী বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্কুলে বাচ্চা নিয়ে আসার পর দেখি স্কুলের মাঠের মধ্যে এডিসি ও সাবেক সিভিল সার্জনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হচ্ছে। এক পর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। এর আগে ডাক্তারের ছেলের সঙ্গে এডিসির কথা উত্তপ্ত বাকবিতণ্ডা হয়।’

একই স্কুলের আরেক শিক্ষার্থীর অভিভাবক আব্দুল মান্নান জানান, ঘটনার সময় তিনি স্কুলের মাঠে ছিলেন। তিনি শুনেছেন সাবেক সিভিল সার্জন এডিসিকে থাপ্পড় দিয়েছেন। আর তিনি দেখেছেন, এডিসি সাবেক সিভিল সার্জনকে থাপ্পড় দিচ্ছেন। আব্দুল মান্নান বলেন, ‘এ ঘটনা দেখার পর আমার খুব খারাপ লাগে। কারণ, তারা দুজনই সম্মানিত লোক। এর মধ্যেই এডিসি জেনারেল কাকে যেন মোবাইলে কল করেন এবং একটি মোবাইল টিম  কাকলি স্কুলে পাঠানোর জন্য বলেন। এরপর তিনি মাঠের বাইরে চলে যান। কিছুক্ষণ পরে লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক আসেন, পুলিশের গাড়িও আসে। তখন পুলিশের গাড়িতে করে সিভিল সার্জনকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নিয়ে যান।’

বিদ্যালয়ের শিক্ষক কাকন সরকার বলেন, ‘আমি দেখতে পাই এডিসি জেনারেল ও সাবেক সিভিল সার্জন দুজনে হাতাহাতি করছেন। তাৎক্ষণিকভাবে  আমি এবং স্কুল ক্যান্টিনের কাজল এসে দু’জনকে দুই দিকে সরিয়ে দেই। এরপর সাবেক সিভিল সার্জনকে স্কুলের ভেতর নিয়ে যান এডিসি জেনারেল। সেখানে  সাবেক সিভিল র্সাজনের ছেলে মিনহাজ এসে এডিসির সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে।’

সাবেক সিভিল সার্জনের মেয়ে  নাদিয়া জাফরিন চাঁদনী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তারা বাবা তাকে ও তার ভাই কাকলি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র আবিরকে গাড়িতে করে নিয়ে যান কাকলি স্কুলে। আবিরকে স্কুলে নামিয়ে তাকেও কলেজে নামিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। তারও কলেজে টেস্ট পরীক্ষা  ৯টার সময় শুরু। চাঁদনী বলেন, ‘বাবা আমার ভাইকে নিয়ে স্কুলের ভেতর যান। তিনি ভুল করে গাড়ির চাবি নিয়ে যান। স্কুলের সামনে যানজট সৃষ্টি হবে এবং আমারও পরীক্ষায় দেরি হয়ে যাবে ভেবে বড় ভাই মিনহাজ বাবার কাছ থেকে গাড়ির চাবি আনতে স্কুল গেটের দিকে যান। ভেতরে ঢোকার সময় এডিসি জেনারেলের সঙ্গে তার (মিনহাজ)  কথাকাটি শুরু হয়। এক পর্যায়ে বাবার সঙ্গেও কথা কাটাকাটি হয়। এর বেশি কিছু আর দেখিনি। আমি গাড়ির ভেতরে ছিলাম।’

এ বিষয়ে লক্ষ্মীপুর সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) এর সভাপতি মাহবুব মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘এরকম ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ব্যক্তিগতভাবে স্কুলের গেটে ঢোকাকে কেন্দ্র করে কোনও সমস্যা হলে এটা আলাপ আলোচনা করে সমাধান করা যেত। একজন এডিসি একজন সাবেক সিভিল সার্জন ও লক্ষ্মীপুর সাহিত্য সংসদের সভাপতির মতো লোকের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ করলেন, পরে তাকে কোর্টে নিয়ে তিন মাসের জেল দিলেন, এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। মোবাইল কোর্টের প্রয়োজন আছে। কিছু ক্ষেত্রে উপস্থিত শাস্তি বিধানের জন্য এটা হতে পারে। কিন্তু ব্যক্তিগত বিষয়ের জন্য নয়।’

আরও পড়ুন- 

খালাস পেলেন সেই দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক সিভিল সার্জন

আমাকে হয়রানি করতে মোবাইল কোর্ট বসানো হয়: ডা. সালাহ উদ্দিন

লক্ষ্মীপুরের সেই এডিসি ওএসডি

চিকিৎসককে জেল: লক্ষ্মীপুরের সেই এডিসি এবং ম্যাজিস্ট্রেটকে হাইকোর্টে তলব

২৪ ঘণ্টা পর জামিনে মুক্ত লক্ষ্মীপুরের সাবেক সিভিল সার্জন

এডিসি’র সঙ্গে ‘অসদাচরণ’, সাবেক সিভিল সার্জনকে কারাদণ্ড

ভ্রাম্যমাণ আদালতের অপব্যবহার!



/এফএস/টিএন/

লাইভ

টপ