কুষ্টিয়ার দৌলতপুর, মিরপুর ও ভেড়ামারা মুক্ত দিবস আজ

Send
কুদরতে খোদা সবুজ, কুষ্টিয়া
প্রকাশিত : ১১:৫৩, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:০৩, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৭

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর-মিরপুর ও ভেড়ামারা মুক্ত দিবস আজকুষ্টিয়ার দৌলতপুর, মিরপুর ও ভেড়ামারা উপজেলা হানাদারমুক্ত দিবস ৮ডিসেম্বর। দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র সংগ্রামের পর এই দিনে হানাদার মুক্ত হয় এই তিন উপজেলা। মুক্ত দিবস পালনে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সহযোগীতায় র‌্যালি, স্মৃতিসৌধে পুষ্পমাল্য অর্পণ ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।

১৯৭১ সালের এই দিনে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানা শক্রমুক্ত করে থানা চত্বরে বিজয় পতাকা উদিয়ে দেন মুক্তিকামী বীর সূর্য সন্তানেরা। দৌলতপুরকে হানাদারমুক্ত করতে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের সম্মুখ যুদ্ধসহ ছোট-বড় ১৬টি যুদ্ধ হয়। এসব যুদ্ধে ৩৫ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ কয়েকশ নারী-পুরুষ শহীদ হন। ৮ ডিসেম্বর সকালে উপজেলার আল্লারদর্গা এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে শহীদ হন বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিক। মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে টিকতে না পেরে পিছু হটতে বাধ্য হয় হানাদাররা। এরপর দৌলতপুরকে হানাদারমুক্ত ঘোষণা করেন তৎকালীন মুক্তিযোদ্ধা ৮নং সেক্টরের সাব-সেক্টর কমান্ডার মেজর নুরুন্নবী।

একই দিন কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলাও পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত হয়েছিল। ৪৬ বছর আগে এই দিনে বহু ত্যাগ তিতীক্ষার বিনিময়ে মিরপুর উপজেলা মুক্তির স্বাদ পায়। ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি আফতাব উদ্দিন খানের নেতৃত্বে শতাধিক মুক্তিকামী ছাত্রজনতা বর্তমান মাহমুদা চৌধুরী কলেজ রোডে পোস্ট অফিস সংলগ্ন মসজিদে শপথ নেন। ৩০ মার্চ শেষ রাতে কুষ্টিয়া পুলিশ লাইনে প্রতিরোধ যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর জিলা স্কুলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শুরু হয়। পাকিস্তানি বাহিনী নিশ্চিত পরাজয় বুঝতে পেরে যশোর সেনানিবাসের সাহায্য চায়। কিন্তু সেখান থেকে কোনও সাহায্য না পাঠানোর সংকেত দিলে হানাদার বাহিনী রাতের অন্ধকারে তিনটি গাড়িতে করে গুলিবর্ষণ করতে করতে যশোর সেনানিবাসের দিকে পালিয়ে যায়। এ সময় পাকিস্তানি সেনাদের দুটি গাড়ি ঝিনাইদহ জেলার গাড়াগঞ্জের কাছে রাস্তায় মুক্তিবাহিনীর ফাঁদে পড়ে যায়। সে সময় মুক্তিবাহিনীর হাতে নিহত হয় তারা।পাকিস্তানি বাহিনীর অপর ছয় জন সদস্য ভোরে জিলা স্কুল থেকে মিরপুরের দিকে পালিয়ে আসতে থাকে। প্রথম তারা উপজেলার বারুইপাড়া ইউপির মশান বাজার সংলগ্ন মাঠে তীব্র প্রতিরোধের মধ্যে পড়ে। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে মশানের ডা. আব্দুর রশিদ হিলম্যান, গোলাপ শেখ, আশরাফ আলী ও সোনাউল্লাহ শহীদ হন।একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদারদের হামলায় হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ভেঙে যাওয়া অংশ

মিরপুর থানার কামারপাড়ায় বিচ্ছিন্ন তিন হানাদারের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের আবারও যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে মিরপুর থানার সিপাহী মহিউদ্দিন শহীদ হন। পাকিস্তানি বাহিনীর ওই তিন সদস্যও নিহত হয়। ৮ ডিসেম্বর ভোরে ই-৯ এর গ্রুপ কমান্ডার আফতাব উদ্দিন খান ১৭০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে মিরপুর থানায় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা গান স্যালুটের মাধ্যমে উত্তোলন করেন। এরপর ৬৫ জন হানাদার ও তাদের দোসর রাজাকার পাহাড়পুর মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে আত্মসমর্পণ করে। মিরপুর হানাদার মুক্ত হওয়ার সংবাদ এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে ১৯৭১ সালের এই দিনে বিভিন্ন বয়সের হাজারও নারী-পুরুষ রাস্তায় নেমে আনন্দ উল্লাসে মেতে উঠে।

মিরপুর উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নজরুল করিম জানান, মুক্ত দিবস উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সহযোগিতায় বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এরমধ্যে সকাল ৯টায় স্মৃতিসৌধে পুষ্পমাল্য অর্পণ, সকাল সাড়ে ৯টায় র‌্যালি এবং সকাল সাড়ে ১০টায় আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে তথ্যমন্ত্রী ও কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা) আসনের সংসদ সদস্য হাসানুল হক ইনু উপস্থিত থাকবেন বলে তিনি জানিয়েছেন।

একই দিন মুক্ত হয় কুষ্টিয়ার ভেড়ামারাও। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভেড়ামারা হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ১২নং স্প্যান পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হামলায় বিধ্বস্ত হয়। ১৯৭১ সালের এই দিনে হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে মিত্র বাহিনীর সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধারা কুষ্টিয়ার ভেড়ামারাকে শত্রুমুক্ত করেন। এই দিন ৮নং সেক্টরের কমান্ডার মেজর আবুল মুনছুরের নেতৃত্বে জেলা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা রাশেদুল আলমের নেতৃত্বে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে ভোর ৭টার সময় ভেড়ামারা ফারাকপুরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। প্রায় ৭ ঘণ্টাব্যাপী এই যুদ্ধে ৮ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। যুদ্ধের পরপরই মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে প্রায় ৫০/৬০ জন বিহারি নিহত হয়। এই ঘটনার সংবাদ পেয়ে ভেড়ামারায় অবস্থানরত পাকিস্তানি বাহিনীর অন্যান্য সদস্যদের মনোবল ভেঙে যায়। তারা সন্ধ্যার আগেই ভেড়ামারা থেকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দিয়ে পালিয়ে যায়। এই দিন রাতে মুক্তিপাগল মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধারা দলে দলে ভেড়ামারায় প্রবেশ করতে থাকেন। বিজয়ের আনন্দে মেতে ওঠেন তারা।

 

/এফএস/

লাইভ

টপ