ত্রিমুখী আক্রমণে শত্রুমুক্ত হয় কুমিল্লা

Send
মাসুদ আলম, কুমিল্লা
প্রকাশিত : ২০:৪৫, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪৩, ডিসেম্বর ০৯, ২০১৭

শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নাম সম্বলিত স্মৃতিস্তম্ভ (ছবি- প্রতিনিধি)

ডিসেম্বরের শুরুতেই পাকিস্তানি বাহিনীর কুমিল্লা বিমানবন্দরের ২২ বেলুচ রেজিমেন্টের ঘাঁটিতে ত্রিমুখী আক্রমণে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর দায়িত্বশীলরা। এ সিদ্ধান্ত মোতাবেক ৭ ডিসেম্বর রাত থেকে মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর যোদ্ধারা আক্রমণ শুরু করেন। অভিযানে দিক-নির্দেশনা দেন মিত্রবাহিনীর ১১ গুর্খা রেজিমেন্টের আরকে মজুমদার। তার নির্দেশে সীমান্তবর্তী বিবিরবাজার দিয়ে লে. দিদারুল আলমের নেতৃত্বে একটি দল এবং গোমতী নদী পার হয়ে ভাটপাড়া দিয়ে আরও দু’টি দল পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ করেন। পাল্টা আক্রমণ চালায় পাকিস্তানি হানাদাররাও। তবে মুক্তিসেনাদের মর্টার-আর্টিলারি আক্রমণে শেষমেশ ৮ ডিসেম্বর রাতে পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করে।

কুমিল্লার শত্রুমুক্ত হওয়ার ইতিহাস বলতে গিয়ে জেলা মুক্তিযোদ্ধারা এসব তথ্য জানান। তারা আরও জানান, কুমিল্লাকে শত্রুমুক্ত করতে ৭ ডিসেম্বর রাতে ২৬ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ৮ ডিসেম্বর ভোরে মুক্তিসেনারা শহরের কান্দিরপাড়, চকবাজার, রাজগঞ্জ, টমছমব্রিজ, ভাটপাড়ার বিভিন্ন সড়ক দিয়ে আনন্দ-উল্লাস করতে করতে শহরে প্রবেশ করেন। বিকালে কুমিল্লা টাউন হল মাঠে বীর মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন।

বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর, ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট আহমদ আলী ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সফিউল আহম্মেদ বাবুল জানান, ডিসেম্বরের শুরু থেকে জেলা সদরসহ অন্যান্য উপজেলা হানাদারমুক্ত হতে থাকে। তবে এর জন্য কুমিল্লাবাসীকে হারাতে হয়েছে অনেক। এর আগেই হাজারও মানুষকে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদাররা। গ্রামের পর গ্রাম তারা পুড়িয়ে দেয়। শত শত নারীকে ধর্ষণ করে। স্বাধীনতার পক্ষে কাজ করায় কুমিল্লার জেলা প্রশাসক এ কে এম সামসুল হক খান ও পুলিশ সুপার কবির উদ্দিন আহমদকেও তারা হত্যা করে।

আহমদ আলী ও সফিউল আহম্মেদ বাবুল আরও জানান, মুক্তিযুদ্ধে কুমিল্লা ২নং সেক্টরের অধীনে ছিল। আর কুমিল্লার আওতায় ছিল আখাউড়া থেকে ভৈরব রেললাইন পর্যন্ত সীমানা এবং ফরিদপুর, ঢাকার অংশবিশেষ ও নোয়াখালী। এ সেক্টর ৪নং ইস্টবেঙ্গল এবং কুমিল্লা ও নোয়াখালীর ইপিআর বাহিনী নিয়ে গঠিত হয়। আগরতলার ২০ মাইল দক্ষিণে মেলাঘরে ছিল এ সেক্টরের সদর-দফতর। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন, প্রথমে মেজর খালেদ মোশাররফ (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর) এবং পরে মেজর এটিএম হায়দার (সেপ্টেম্বর-ডিসেম্বর)। সেক্টরের অধীনে প্রায় ৩৫ হাজারের মতো গেরিলা যুদ্ধ করেছেন। নিয়মিত বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ৬ হাজার।

এ দুই মুক্তিযোদ্ধা জানান, এই সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযানে কুমিল্লা ও ফেনীর মধ্যবর্তী ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে পাক-বাহিনী সম্পূর্ণ বিতাড়িত হয় এবং যুদ্ধের পুরো সময় এই এলাকা মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকারে থাকে। এই সেক্টরের বাহিনীর অভিযানের অন্যতম প্রধান সাফল্য হলো বেলোনিয়াকে শক্রুমুক্ত করা।

যুদ্ধের শুরুতেই কুমিল্লা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার শহীদ হন

ভাষাসৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা আহমদ আলী জানান, ৭ মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসহযোগ আন্দোলনে সাড়া দিয়ে কুমিল্লার জেলা প্রশাসক এ কে এম সামসুল হক খান (সিএসপি) ও পুলিশ সুপার কবির উদ্দিন আহম্মদ গোপনে হানাদার বাহিনীকে প্রতিহত করার পরিকল্পনা করেন। তৎকালীন অবিভক্ত কুমিল্লর ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমা অস্ত্রাগার থেকে মুক্তিকামী প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে তারা অস্ত্র তুলে দেন। এরপর তাদের নির্দেশে কুমিল্লা সেনানিবাসে অবস্থানরত হানাদার বাহিনীর রেশন, পেট্রোল, পানি ও বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২৫ মার্চ রাত ১২টার পর হানাদার বাহিনী ময়নামতি সেনানিবাস থেকে শহরের পুলিশ লাইনে বর্বরোচিত হামলা চালায়। এরপর তারা কুমিল্লা শহরে তাণ্ডব চালায়। ২৬ মার্চ সকাল ৭টায় কুমিল্লার পুলিশ সুপার কবির উদ্দিন আহম্মদ ও একইদিন সকাল ৮টায় জেলা প্রশাসক এ কে এম সামসুল হক খানকে ধরে ময়নামতি সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া হয়। ২৬ মার্চ কবির উদ্দিন আহম্মদকে ও ৩০ মার্চ একেএম সামসুল হক খানকে গুলি করে হত্যা করে হানাদার বাহিনী।

ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে নির্মমভাবে হত্যা

মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম ও মুক্তিযুদ্ধা মফিজুল ইসলামসহ কয়েকজন জানান, ১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল বিকালে পাকিস্তানের গণপরিষদে বাংলাকে অন্যতম ভাষা হিসেবে সরকারি স্বীকৃতির দাবি উত্থাপনকারী বরেণ্য রাজনীতিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। এর আগে তার ওপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। তারা আরও জানান, ২৯ মার্চ রাতে কুমিল্লা শহরে হামলা চালিয়ে হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুকে হত্যা করে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী।

বধ্যভূমি-গণকবর

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা জানান, লাকসামের রেলওয়ে জংশনসংলগ্ন একটি সিগারেট ফ্যাক্টরিকে মানুষ হত্যার আস্তানা বানিয়েছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। প্র্রতি রাতে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে নিরীহ লোকদের চোখ বেঁধে ধরে এখানে নিয়ে এসে ব্রাশফায়ার করে মাটির নিচে পুঁতে রাখা হতো।

মুক্তিযোদ্ধারা আরও জানান, ওইসব এলাকায় মাটি খুঁড়লে এখনও বেরিয়ে আসে কঙ্কাল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কুমিল্লার ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টসহ বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য গণকবর আবিষ্কৃত হয়। এছাড়া জেলার চৌদ্দগ্রামের বেতিয়ারা, লাকসামের বেলতলী, নাঙ্গলকোটের মৌকরা ও হাসানপুর পুকুরপাড়, সদরের রামমালা সড়কের সার্ভে ইনস্টিটিউটের অভ্যন্তরে, কৃষ্ণপুর ধনাঞ্জয়, দিশাবন্দ, ঘিলাতলা ও রসুলপুর, কোটবাড়ি রূপবানমুড়া, সদর দক্ষিণের বাগমারা দক্ষিণ বাজার, বরুড়ার পয়ালগাছা ও নারায়ণপুর, দাউদকান্দি, হোমনা সদরের কলেজ প্রাঙ্গণ, চান্দিনার হাড়ং, দেবিদ্বার সদরসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে আরও অনেক বধ্যভূমি রয়েছে। কয়েক মুক্তিযোদ্ধার দাবি, জেলায় আরও অনেক গণকবর অনাবিষ্কৃত রয়েছে।

জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সফিউল আহম্মেদ বাবুল জানান, মুক্তিযুদ্ধে কুমিল্লার অনেক বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন। তাদের শ্রদ্ধা জানিয়ে নির্মিত হয়েছে ভাস্কর্য, স্মৃতিফলক। একইসঙ্গে সংরক্ষণ করা হয়েছে বধ্যভূমি ও গণকবরগুলো।

 

/এমএ/

লাইভ

টপ