৪৬ বছরেও কোনও বধ্যভূমি সংরক্ষিত হয়নি চট্টগ্রামে

Send
হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত : ১৫:৫০, ডিসেম্বর ১০, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৪, ডিসেম্বর ১০, ২০১৭

ডালিম হোটেল১৯৭১ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর এই ৯ মাসে চট্টগ্রামের পূর্ব পাহাড়তলীর বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয় অন্তত পাঁচ হাজার বাঙালিকে। ১০ নভেম্বর একদিনেই সেখানে হত্যা করা হয় ১২৪ জন নিরীহ মানুষকে। জল্লাদখানা নামে পরিচিতি পায় স্থানটি। পাশেই টিএনটির রেস্ট হাউজে পাকিস্তানি বাহিনীর ধর্ষণের শিকার হয়েছেন শত শত নারী। 

দক্ষিণ কাট্টলির নাথ পাড়া বধ্যভূমিতে ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ হত্যা করা ৪২ জনকে। পাকিস্তানি বাহিনী চট্টগ্রাম শহরে প্রবেশের পরপরই বিহারীদের সঙ্গে হত্যা করে স্থানীয় বাঙালিদের।

মহামায়া ডালিম হোটেলকে কেন্দ্র করেই একাত্তরে চালানো হয়েছে সব ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ, যার তত্ত্বাবধানে ছিলেন আলবদর নেতা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী মীর কাশেম আলী। তার নেতৃত্বে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকা থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ বাঙালিকে ধরে এনে এই ভবনে তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হতো। একাত্তরে এই ভবনেই ধর্ষণ করা হয়েছে শত শত নারীকে।

পাহাড়তলী বধ্যভূমি, নাথ পাড়া আর ডালিম হোটেলই নয়, চট্টগ্রাম নগরীতে একাত্তরের স্মৃতি বিজড়িত এরকম প্রায় ৭৭টি স্থান আছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলার অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ মানুষদের ওপর চালানো নির্যাতন-হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী হয়ে আছে এই স্থানগুলো। মুক্তিযুদ্ধের পরে এসব স্থানে মিলেছে সেইসব মানুষদের কঙ্কাল, নিপীড়নের দাগ। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদদের স্বজনদের দাবির পরও ৪৬ বছরেও এসব বধ্যভূমির একটিও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

‘প্রামাণ্য দলিল: মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম’ শিরোনামের বইতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মুক্তিযোদ্ধা ড. গাজী সালেহ উদ্দিন পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের ব্যবহৃত বধ্যভূমির সুনির্দিষ্ট তথ্য উপস্থাপন করেছেন। বইটিতে উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রাম নগরীর ভেতরেই ৭৭টি বধ্যভূমি আছে। যেখানে পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দোসরারা মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ বাঙালিদের হত্যা করেছে।

মুক্তিযোদ্ধা ড. গাজী সালেহ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘স্বাধীনতা লাভের পর ৪৬ বছর পার হতে চলেছে। দীর্ঘ এই সময়ে চট্টগ্রামে একটি বধ্যভূমিও সংরক্ষণ করা হয়নি। ১৯৯৮ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমরা আবেদন করলে তিনি পাহাড়তলী বধ্যভূমি সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। তিন দফায় নোটিশও দেওয়া হয়। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার এসে সেই প্রকল্পটি বন্ধ করে দেয়। আমরা উচ্চ আদালতে রিট করার পর ২০১৪ সালে আদালত এটি সংরক্ষণের পক্ষে রায় দেন। আদালতের রায়ের পর তিন বছর পার হতে চলেছে, এখনও কোনও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।’পাহাড়তলী বধ্যভূমি

তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘আমার জীবদ্দশায় বধ্যভূমি সংরক্ষণের বিষয়টি দেখে যেতে পারবো কিনা আল্লাহই ভালো জানেন। তবে আমি আশাবাদী হয়তো সরকার শিগগিরই বধ্যভূমি সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।’

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ চট্টগ্রাম মহানগর ইউনিট কমান্ডার মোজাফ্ফর আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য যে স্বাধীনতার এত বছর পরও চট্টগ্রামে কোনও বধ্যভূমি সংরক্ষণ করা হয়নি। আমরা অসংখ্য চিঠি চালাচালি করেছি। বার বার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনও পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সরকার পাহাড়তলী বধ্যভূমি সংরক্ষণে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই বধ্যভূমি সংরক্ষণে সরকার ১৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করতে যাচ্ছে বলে শুনেছি। আমরা চাই এই সরকার ক্ষমতায় থাকতে থাকতে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হোক। কারণ এর আগে ২০০০ সালে জোট সরকার এ প্রকল্পটি একবার বন্ধ করে দিয়েছে।’ শুধু পাহাড়তলী নয়, তিনি চট্টগ্রামের প্রধান প্রধান বধ্যভূমির সবগুলোই সংরক্ষণের দাবি জানান।

চট্টগ্রামের বধ্যভূমিগুলোর মধ্যে মহামায়া ডালিম হোটেল বধ্যভূমি, গুডসহিল বধ্যভূমি, পূর্ব পাহাড়তলী বধ্যভূমি, পশ্চিম পাহাড়তলী বধ্যভূমি, দক্ষিণ বাকলিয়া মোজাহের উলুম মাদ্রাসা বধ্যভূমি, চাক্তাই খালপাড় বধ্যভূমি, চামড়ার গুদাম চাক্তাই খাল পাড় বধ্যভূমি, তুলশী ধাম সেবায়েত মন্দির বধ্যভূমি, হাইওয়ে প্লাজা ভবন বধ্যভূমি, বাটালী পাহাড়ের রেলওয়ে বাংলো বধ্যভূমি, পাঁচলাইশ সড়কের আল বদর বাহিনী ক্যাম্প বধ্যভূমি, চট্টগ্রাম জেনারেল পোস্ট অফিস বধ্যভূমি, সিআরবি নির্যাতন কেন্দ্র বধ্যভূমি, চন্দনপুরা রাজাকার ক্যাম্প বধ্যভূমি, চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামের পাশের সেনাক্যাম্প বধ্যভূমি, সার্কিট হাউজ বধ্যভূমি, বন্দর আর্মি ক্যাম্প বধ্যভূমি, রেলওয়ে ওয়ার্কশপ বধ্যভূমি, প্রবর্তক সংঘের পাহাড় বধ্যভূমি, সদরঘাট রাজাকার ক্যাম্প বধ্যভূমি, ঝাউতলা বিহারী কলোনী বধ্যভূমি ও সিভিল গোডাউন বধ্যভূমি উল্লেখযোগ্য।

এসব বধ্যভূমির মধ্যে পাহাড়তলী বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছিল আওয়ামী লীগ সরকার। ১৯৯৮ সালে প্রজন্ম-৭১ নামে একটি সংগঠনের আবেদনের পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পাহাড়তলী বধ্যভূমি সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। এরপর ২৫ বছর পার হয়ে গেলেও এখনও ভূমি অধিগ্রহণ করে বধ্যভূমিটি সংরক্ষণ করা হয়নি। ১ দশমিক ৭৫ একর জমি অধিগ্রহণ করে প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ৯৪ লাখ টাকা বরাদ্দও দেওয়া হয়। তবে ২০০৫ সালে চার দলীয় জোট সরকার ওই প্রকল্প বাতিল করে টাকা ফেরতের সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারের ওই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন জাফর ইকবাল, মুনতাসির মামুন, মিলি রহমানসহ আট বিশিষ্ট নাগরিক। ২০১১ সালের ১৬ জানুয়ারি হাইকোর্ট রিট নিষ্পত্তি করে দিলে আবেদনকারীরা এর বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আসেন। ২০১৪ সালের ১৭ মার্চ রিট আবেদনের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে বধ্যভূমিটি সংরক্ষণের আদেশ দেন। এরপর প্রায় তিন বছর পার হতে চললেও ভূমি অধিগ্রহণ করে এখনও বধ্যভূমিটি সংরক্ষণ করা হয়নি।

প্রজন্ম-৭১ এর সভাপতি ড. গাজী সালেহ উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একাত্তরের ১০ নভেম্বর আমার বাবা রেলওয়ের কর্মকর্তা আলী করিমসহ আমাদের পরিবারের চারজনকে পাহাড়তলী বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এছাড়া যুদ্ধচলাকালে বিভিন্ন সময় পাঁচ হাজার নিরীহ বাঙালিকে ধরে এনে এখানে জবাই করা হয়েছিল। আমরা এই স্থানটি সংরক্ষণের জন্য আবেদন জানিয়েছিলাম। এ বিষয়ে আদালতের নির্দেশনাও আছে। তারপরও ভূমি অধিগ্রহণ করে পাহাড়তলী বধ্যভূমিটি এখনও সংরক্ষণ করা হয়নি।’

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মমিনুর রশিদ এ বিষয়ে বলেন, 'পাহাড়তলী বধ্যভূমির জমি অধিগ্রহণ নিয়ে দুটি মামলা হয়েছে। একটিতে আপিল বিভাগ জমি অধিগ্রহণ করে বধ্যভূমি সংরক্ষণের আদেশ দিয়েছেন। তবে হাইকোর্টে এই সংক্রান্ত আরেকটি মামলা রয়েছে। ওই মামলার আদেশ হাতে পেলেই জমি অধিগ্রহণ করবো।' অন্য বধ্যভূমিগুলোর সংরক্ষণ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান, বধ্যভূমি সংরক্ষণের বিষয়ে সরকারের একটা আলাদা প্রকল্পই আছে।  তবে এ চট্টগ্রামে এধরনের কোনও উদ্যোগ নেওয়া হবে কিনা সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারেননি। 

/এফএস/

লাইভ

টপ