কষ্টে দিন কাটছে বীরাঙ্গনা রাজিয়ার

Send
মোহাম্মদ নুর উদ্দিন, হবিগঞ্জ
প্রকাশিত : ১৭:০১, ডিসেম্বর ১০, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০১, ডিসেম্বর ১০, ২০১৭

বীরাঙ্গনা রাজিয়া খাতুনসম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন হবিগঞ্জের বীরাঙ্গনা রাজিয়া খাতুন। স্বাধীনতার ৪২ বছর পর ২০১৩ সালে তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পান। সরকারের পক্ষ থেকে ছোট একটি ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হলেও বর্তমানে অনেক কষ্টে সংসার চলছে রাজিয়ার। মুক্তিযোদ্ধা ভাতার টাকা দিয়ে পঙ্গু ছেলেকে নিয়ে কোনও মতে দিন কাটছে তার। স্বামী ‘মুক্তিযোদ্ধা’ আব্দুল হামিদ মহালদার ২১ বছর আগে মারা গেলেও পাননি স্বীকৃতি। বয়সের ভারে অসুস্থ বীরাঙ্গনা রাজিয়া অর্থাভাবে সুচিকিৎসা করাতে পারছেন না।

জেলার শায়েস্তাগঞ্জ পৌরসভার পুরানবাজারস্থ উবাহাটা গ্রামে রাজিয়া খাতুনের বাড়িতে কথা হয় বাংলা ট্রিবিউনের এই প্রতিবেদকের।

রাজিয়া জানান, তার বাবার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায়। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ১৮ বছর। যুদ্ধ চলাকালীন বৈশাখ মাসের ১২ তারিখ দুপুরে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের গ্রামে হানা দেয়। খবর ছড়িয়ে পড়লে বাড়ির পুরুষ সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে যায়। বাড়িতে তিনি আর দাদি ছিলেন। সে সময় হঠাৎ করে রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি বাহিনীর ৬-৭ জন সদস্য তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। তাকে পাকিস্তানি ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যায়। সেখানে চালানো হয় পাশবিক নির্যাতন। এভাবে তিন দিন নির্যাতন ভোগের পর শুক্রবার জুম্মার নামাজের সময় তিনি কৌশলে ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে হেঁটে হেঁটে সীমান্ত দিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। সেখানে তাকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করা হয়।

তিনি বলেন, ‘সুস্থ হওয়ার পর মনে মনে শপথ নেই যুদ্ধে যাবো, দেশ স্বাধীন করবো।’

রাজিয়া জানান, ভারতে প্রশিক্ষণ নিয়ে ৩নং সেক্টরে মেজর শফি উল্লাহ’র অধীনে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সরবরাহ করতেন এবং রান্না করে খাওয়ানোসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেন। যুদ্ধকালে রাজিয়াকে শ্রীমঙ্গলের সাতগাঁওয়ের আবিদ সুবেদা, মৌলভীবাজারের সৈয়দ মহসিন আলী (সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী), আজিজুর রহমান, সরাইলের আব্দুর রউফ, কাশিমনগরের রহিমাসহ অনেকই সহযোগিতা করেন।

তিনি জানান, স্বাধীনতার পর গ্রামে ফিরে আসেন। হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জের উবাহাটা গ্রামের আব্দুল হামিদ মহালদারের সঙ্গে যুদ্ধের সময় তার পরিচয় হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ‘মুক্তিযোদ্ধা’ আব্দুল হামিদ মহালদার তাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর তাদের সংসার ভালোই চলছিল। কিন্তু স্বামী মারা যাওয়ার পর শুরু হয় অভাব অনটন। অভাবের তাড়নায় তিনি গ্রামে গ্রামে কাপড় বিক্রি করে সংসার চালিয়েছেন। অনেক চেষ্টা করেও নিজের কিংবা স্বামীর মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পাননি। পরবর্তীতে স্বাধীনতার ৪২ বছর পর এক অনুষ্ঠানে ৩নং সেক্টর প্রধান মেজর শফি উল্লাহকে দেখে সালাম করেন তিনি। এ সময় রাজিয়াকে চিনতে পেরে তাকে ফুল দিয়ে বরণ করেন মেজর শফি উল্লাহ।

তিনি জানান,এমপি কেয়ার চৌধুরীর আন্তরিক প্রচেষ্টায় মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর তিনিসহ হবিগঞ্জের  ছয় নারীকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তিনি প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা ভাতা পান। কিন্তু এই টাকায় পঙ্গু ছেলেকে নিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে। তিনি প্রায় সময়ই অসুস্থ থাকেন। কিন্তু টাকার অভাবে উন্নত চিকিৎসা নিতে পারছেন না।

রাজিয়া বলেন, ‘একমাত্র ছেলে সাহেদুল প্যারালাইসিস হয়ে পঙ্গু।ঘরে বেকার বসে আছে। মেয়ের বিয়ে হয়েছে। নাতি ও নাতনি রয়েছে। তারা পড়াশোনা করছে। অনেক চেষ্টা করছি নাতিকে সরকারি চাকরি জোগাড় করে দিতে। কিন্তু ব্যর্থ হচ্ছি। আমার শারীরিক অবস্থা দিন দিন অবনতির দিকে যাচ্ছে।’

মৃত্যুর আগে নাতির সরকারি চাকরি আর ছেলের জন্য একটি দোকান তৈরি করে দেওয়ার আকুতি জানিয়েছেন এই বিরাঙ্গনা। এ জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতা কামনা করেছেন।

হবিগঞ্জের সংসদ সদস্য কেয়া চৌধুরী বলেন, ‘হবিগঞ্জ থেকে রাজিয়া খাতুন, হিরামনি সরকার, সাবেথী নায়েক, মালতি রানী, পুষ্প রানী, ফারিজা খাতুনের খোঁজ বের করি। পরবর্তীতে তাদের জেগেটভুক্ত করার আবেদন করি। আমার আবেদনের প্রেক্ষিতে রাজিয়াসহ ছয় নির্যাতিত নারীকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম জেগেটে অন্তর্ভুক্ত করেন। রাজিয়া খাতুনের আবেদনের প্রেক্ষিতে সরকারিভাবে তাকে ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য নারী মুক্তিযোদ্ধাদের সরকার আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করছে।’

তিনি বলেন, ‘তারপরও আমার মনে হয়, তাদের আরও অনেক কিছু পাওয়ার আছে।’

/বিএল/

লাইভ

টপ