৪৪টি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে শত্রুমুক্ত হয় কুষ্টিয়া

Send
কুদরতে খোদা সবুজ, কুষ্টিয়া
প্রকাশিত : ১৩:২৯, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩৫, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৭

ছোট-বড় ৪৪টি যুদ্ধ শেষে শত্রুমুক্ত হয় কুষ্টিয়া শহর। মুক্তিযুদ্ধ শুরু আগে ৭১’ এর ৩ মার্চ কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজ মাঠে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জনসভায় লাল সবুজের ছয়টি তারকা খচিত পতাকা স্বাধীন বাংলার পতাকা হিসাবে উড়িয়ে দেন তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলা স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ও জেলা ছাত্র লীগের সভাপতি আব্দুল জলিল। স্বাধীন বাংলার ইশতেহার পাঠ করেন কুষ্টিয়া জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্বাধীন বাংলা সেলের নেতা শামসুল হাদী। মারফত আলী, আব্দুল মোমেন, শামসুল হাদীর নেতৃত্বে সেদিন গঠিত হয় জয়বাংলা বাহিনী।

ছবি: আব্দুল হান্নানের ‘স্বাধীনতা যুদ্ধে বৃহত্তর কুষ্টিয়া’২৩ মার্চ কুষ্টিয়া হাইস্কুল মাঠে পুনরায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য (এমপিএ) গোলাম কিবরিয়া ও আব্দুর রউফ চৌধুরী জয়বাংলা বাহিনীর অভিবাদন গ্রহণ করেন। যুদ্ধের প্রস্তুতি চলতে থাকে। কুষ্টিয়ার প্রতিটি গ্রামে জয়বাংলা বাহিনী গঠিত হয়। এরমধ্যে ২৫ মার্চ রাতে মেজর শোয়েবের নেতৃত্বে ২৭ বেলুচ রেজিমেন্টের ‘ডি’ এক কোম্পানি সৈন্য এসে কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন, জেলা স্কুল, থানা ও আড়ুয়াপাড়াস্থ ওয়ারলেস অফিস ও টেলিগ্রাফ অফিস দখলে নিয়ে শহরে কারফিউ জারি করে। এরপর পুরো শহর দখলে নিয়ে নিরীহ মানুষের ওপর শুরু হয় পাকিস্তানি বাহিনীর জ্বালাও-পোড়াও নির্যাতন। প্রতিশোধ নিতে স্থানীয় রনি রহমান সহযোদ্ধাদের নিয়ে হাতবোমা তৈরি করেন। তিনি খবর পেয়েছিলেন পাকিস্তানিরা এন.এস. রোড দিয়ে যাতায়াত করে। তাদের আক্রমণ করতে পরদিন ২৭ মার্চ নিজামতুল্লাহ সংসদের ছাদে উঠে বোমা নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন তিনি। হঠাৎ মিউনিসিপ্যালিটি মার্কেটের ছাদ থেকে ৮/১০ বছরের একটি ছেলে পাকিস্তানিদের গাড়ি লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়ে পালিয়ে যায়। কয়েকজন সৈনিক ভবনটির ছাদে উঠে ঢিল নিক্ষেপকারীকে খুঁজতে থাকে। এ সময় তারা বোমা নিক্ষেপে উদ্যত রনি রহমানকে দেখে গুলি ছোড়ে। সৈনিকদের একটি গুলি তার মাথায় বিদ্ধ হলে ঘটনাস্থলেই তিনি শহীদ হন। রনি মুক্তিযুদ্ধে কুষ্টিয়ার প্রথম শহীদ। তবে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কুষ্টিয়ায় চরম প্রতিরোধের মুখে পড়ে। ৩০ মার্চ ভোরে বাংলার দামাল ছেলেরা কুষ্টিয়া জিলা স্কুলে পাকিস্তানি হানাদার ক্যাম্পে হামলা চালান। এ যুদ্ধে নিহত হয় অসংখ্য পাকিস্তানি সেনা। এরপর বংশীতলা, দুর্বাচারা, আড়পাড়া, মঠবাড়িয়া, মিরপুরের কাকিলাদহ, কুমারখালীর ঘাসখালিসহ ৪৪টি যুদ্ধ সংঘটিত হয় কুষ্টিয়া জেলায়। শেষ পর্যন্ত ১ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী কুষ্টিয়া ছেড়ে পালিয়ে যায়। প্রথমবারের মতো মুক্ত হয় কুষ্টিয়া। পরবর্তী সময়ে ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন হয়। এরপর থেকে দফায় দফায় বিমান হামলা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। তারা আবারও কুষ্টিয়া দখলে নিয়ে বাঙালি নিধন আর গণহত্যার উৎসবে মেতে ওঠে। তবে ৬ ডিসেম্বর তিন দিক থেকে মুক্তি ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে বৃহত্তর কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকা হানাদার মুক্ত হতে থাকে। ৯ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া শহর ছাড়া অন্যান্য এলাকা শত্রুমুক্ত হয়। তবে তুমুল যুদ্ধ চলে কুষ্টিয়ায়। অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সাহসী তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা অমিত তেজে যুদ্ধ করে ১১ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া শহরকে শত্রুমুক্ত করেন। হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষের ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে সেদিন কুষ্টিয়ার আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। লাঠি-সড়কি, ঢাল-তলোয়ার নিয়ে উপজেলার হরিপুর-বারখাদা, জুগিয়া, আলামপুর, দহকোলা, জিয়ারুখী, কয়া, সুলতানপুর, পোড়াদহ, বাড়াদিসহ বিভিন্ন গ্রাম থেকে মানুষ ছুটে আসে কুষ্টিয়া শহরে।

ছবি: আব্দুল হান্নানের ‘স্বাধীনতা যুদ্ধে বৃহত্তর কুষ্টিয়া’কুষ্টিয়া মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার নাসিম উদ্দিন আহম্মেদ জানান, কুষ্টিয়া জেলায় মোট ৪৪টি যুদ্ধ হয়। এরমধ্যে ৩৩টি ক্যাজুয়ালি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। দৌলতপুরে ১৯টি, মিরপুরে ৮টি, ভেড়ামারায় ২টি, কুষ্টিয়া সদরে ৮টি, কুমারখালিতে ৬টি এবং খোকসা উপজেলায় ১টি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে শতাধিক শহীদ হন। আহত হন প্রায় আড়াই শতাধিক যোদ্ধা। তাছাড়াও গণহত্যার শিকার হন প্রায় ১২ থেকে ১৫ হাজার মানুষ। কুষ্টিয়ায় খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ১০ জন। তাদের মধ্যে বীর উত্তম দুজন, বীর বিক্রম একজন ও বীর প্রতীক সাত জন।

/বিএল/

লাইভ

টপ