বিজয় আনন্দ শেষ না হতেই দিনাজপুরে নেমে আসে শোক

Send
দিনাজপুর প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২০:৫৬, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:৩০, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৭

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিস্তম্ভ
একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হয়েছিল বাংলাদেশ। বিজয়ের আনন্দে মেতেছিলেন দেশবাসী। কিন্তু তখনও অবরুদ্ধ দিনাজপুর। অপেক্ষা করতে হয় আরও দুই দিন। ১৮ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয় এই জেলায়। তবে বিজয় আনন্দ শেষ হতে না হতেই সেখানে নেমে আসে শোক। ১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি মাইন বিস্ফোরণে পাঁচ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা প্রাণ হারান। দিনাজপুর জেলা সেক্টর কমান্ডার ফোরামের আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

আবুল কালাম আজাদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘১৬ ডিসেম্বর দেশ মুক্ত হলেও দিনাজপুর জেলার আশেপাশে পাকিস্তানি সেনারা রয়ে গিয়েছিল। ১৭ ডিসেম্বরেও মুক্তিযোদ্ধারা গঙ্গারামপুর থেকে দিনাজপুরে প্রবেশ করতে পারেননি। ১৮ ডিসেম্বর দিনাজপুর থেকে পাকিস্তানি সেনারা চলে যাওয়ার পর তারা প্রবেশ করেছেন। আনুষ্ঠানিকভাবে ওই দিন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন ও প্রশাসন চালু হয়েছিল।’

দিনাজপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার সিদ্দিক গজনবী জানান, ১৬ ডিসেম্বর তিনিসহ তার সঙ্গীরা দিনাজপুরে প্রবেশ করেন। সকালে তারা দেখতে পান পাকিস্তানি সেনারা কারাবন্দিদের মুক্ত করে দিয়ে চলে গেছে। ১৮ ডিসেম্বর দিনাজপুরে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়।

৬ জানুয়ারি স্মৃতি পরিষদের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা সফিকুল হক ছুটু বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে দিনাজপুরে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে বিজয়ের পরের মাসে। মুক্তিযুদ্ধ শেষে দিনাজপুর শহরের উত্তর বালুবাড়ীর মহারাজা স্কুলে স্থাপন করা হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধা ট্রানজিট ক্যাম্প। সেখানে অবস্থান করে প্রায় ৮শ’ মুক্তিযোদ্ধা উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন স্থান থেকে মাইন অপসারণ করে জড়ো করেছিলেন। ১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি ঠিক মাগরিবের নামাজের পর দুটি ট্রাক থেকে মাইন নামানোর সময় হঠাৎ এক মুক্তিযোদ্ধার হাত থেকে একটি মাইন ফসকে পড়ে যায় জড়ো করা মাইনের ওপর। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ ঘটে জড়ো করা হাজারো মাইনের। প্রাণ হারান সেখানে অবস্থান নেওয়া পাঁচ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা। আহত হন শত শত মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধাদের শরীরের ছিন্নভিন্ন অংশ ছিটকে পড়ে আশেপাশে এবং গাছের ডালে। মুক্তিযোদ্ধাদের এসব অংশ জড়ো করে সমাহিত করা হয় সদর উপজেলার চেহেলগাজী মাজারে। সেখানে তাদের গণকবর দেওয়া হয়।’

সফিকুল হক ছুটু বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের ঠিক পরপর বাংলাদেশে এত বড় দুঃখজনক ঘটনা আর নেই। অথচ এই ইতিহাস এখনও অনেকেই জানেন না। নতুন প্রজন্মকে বিষয়টি জানানোর জন্য দীর্ঘদিন যাবত এই ঘটনা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছি আমরা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ৪৬ বছরেও আমাদের দাবি বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শহীদদের স্মৃতি বাস্তবায়নে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। কিন্তু সেটি বাস্তবায়িত হয়নি। ১৯৯৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি গোরে শহীদ ময়দানে এক জনসভায় তিনি এ প্রতিশ্রুতি ‍দিয়েছিলেন।’

মুক্তিযোদ্ধাদের বয়ান ও  মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসভিত্তিক বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে জানা গেছে, ২৫ মার্চ কাল রাতের পর দিন কারফিউ জারি করা হয় দিনাজপুর শহরে। ২৭ মার্চ জেলার দশমাইল এলাকায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করার কারণে মুক্তিযোদ্ধা হবিবর চেয়ারম্যানের ভাই মনু মিয়া, ময়েজউদ্দিন আহমদসহ বেশ কয়েকজনকে ধরে খালখল্লী ব্রিজের পাশে নির্মমভাবে হত্যা করে পাকিস্তানি সেনারা। ওই দিনই শহরে বেশ কয়েকজনকে হত্যা করা হয়। একই দিনে কুঠিবাড়ীর অস্ত্রাগারের প্রহরী ও অবাঙালি সেনাদের হত্যা করে দখলে নেন বাঙালি সেনারা। ওই দিন থেকেই দিনাজপুর শহরে কুঠিবাড়ীসহ যেখানে যেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা ছিলেন তাদের ওপর আক্রমণ করা হয় এবং হত্যা করা হয়। অনেকেই ভয়ে পালিয়ে যান। পালিয়ে যাওয়ার সময় শহর সংলগ্ন পূনর্ভবা নদীর তীরে হানাদার বাহিনীর গুলি ও শেলে অনেক মানুষ মারা যান।
৩০ মার্চের মধ্যেই দিনাজপুর শহর থেকে সব হানাদারকে হটিয়ে দেন বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ বাঙালি যুবকরা। বাঙালি ইপিআর, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের নেতৃত্বে মুক্তি সংগ্রামীদের সমন্বয়ে জেলার বিভিন্ন প্রবেশমুখে ঘাঁটি বসানো হয় যাতে করে পাকিস্তানি সেনারা প্রবেশ করতে না পারে।

১১ এপ্রিল দিনাজপুর জেলখানার সমস্ত তালা ভেঙে কয়েদিদের মুক্ত করা হয়। অস্ত্রাগার থেকে সব অস্ত্র লুট করেন বিক্ষুব্ধ বাঙালিরা। ১৩ এপ্রিল রাতে সৈয়দপুর ঘাঁটি থেকে বিপুল সংখ্যক পাকিস্তানি সেনা তিনটি অংশে বিভক্ত হয়ে দিনাজপুরে সুপরিকল্পিতভাবে আক্রমণ চালায়। এতে করে বিপুল সংখ্যক মুক্তিকামী মানুষ ও যুবক শহীদ হন। পাকিস্তানি বাহিনী দখল করে নেয় পুরো দিনাজপুর জেলা। এরপর থেকেই বিভিন্ন স্থানে মুক্তিকামী মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আক্রমণ চালায় হানাদাররা।

২০ এপ্রিল বিরামপুরের চরকাই এলাকায় মুক্তিযোদ্ধা ও জোয়ানরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালালে যুদ্ধ হয়। পাকিস্তানি সেনারা মারা যায় এবং শহীদ হন অনেক মুক্তিযোদ্ধা।

মহারাজা স্কুল মাইন বিস্ফোরণে শহীদদের গণকবর যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে দেশ ছেড়ে মানুষ ভারতের পশ্চিম দিনাজপুরের কালদিঘী, গঙ্গারামপুর হাইস্কুল, নয়াবাজার হাইস্কুল, শিববাটি জুনিয়র হাইস্কুল, বুলবাড়ী সেন্টার, লস্করহাট পঞ্চায়েত অফিস, খাদিমপুর গার্লস হাইস্কুল, দারিভার, রাসাখোয়া, পতিরাম হাইস্কুল, মুরালিপুর জুনিয়র স্কুল, ডালিমগাও, ধর্মাপুর, মালোন, নাওদা, আটিয়াখোরি, জয়পাইগুড়িসহ বিভিন্ন স্থানের শরনার্থী শিবির ও ক্যাম্পে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

যুদ্ধকালীন দিনাজপুর ও রংপুর জেলাকে নিয়ে পশ্চিমাঞ্চল জোন-১ নামে একটি জোন গঠন করা হয়। স্থানীয় সংসদ সদস্য এম. আব্দুর রহিমকে এই জোনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধকালীন ৬ নম্বর ও ৭ নম্বর সেক্টরের আওতায় আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত এই প্রশাসনিক জোনের আওতায় ১১২টি রিলিফ ক্যাম্প, ১২টি ইয়ুথ রিসিপশন ক্যাম্প, ৬টি ফ্রিডম ফাইটার ক্যাম্প ও একটি মুক্তিযোদ্ধা বাছাই ক্যাম্প করা হয়। যুদ্ধ চলাকালীন এই জোনের আওতায় ছাত্রলীগ কর্মীদের সমন্বয়ে মুজিব বাহিনী, গেরিলা বাহিনী, বামপন্থীদের বাহিনী ও দিনাজপুর কেন্দ্রীয় মুক্তি সংগ্রাম সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়।

যুদ্ধ বড় আকারে শুরু হয় জুন মাস থেকে। ১৮ জুন বিরল থানার ঠনঠনিয়াপাড়ায় মুক্তিবাহিনী বড় ধরনের যুদ্ধ করে। ২ জুলাই দিনাজপুর শহরের একটি পাকিস্তানি ঘাঁটিতে মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা আক্রমণ চালান। যাতে অনেক পাকিস্তানি সেনা মারা যায় এবং সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র আটক করা হয়। ৪ জুলাই কাঞ্চন সেতুর পাশে হানাদারদের ঘাঁটিতে আক্রমণ চালানো হয়। জুন, জুলাই ও আগস্ট মাসজুড়ে বিভিন্ন স্থানে এই ধরনের আক্রমণের ঘটনা ঘটে ও পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যদেরকে হত্যা করে তাদের অস্ত্র লুট করেন মুক্তিযোদ্ধারা। 

সেপ্টেম্বর মাসে দিনাজপুরে পাকিস্তানি বাহিনী নিয়ন্ত্রিত এলাকা ঘুঘুডাঙ্গা, চিরিরবন্দর, ঘোড়াঘাট, হিলি, খানপুর, বিরল, বীরগঞ্জসসহ বিভিন্ন এলাকা দিয়ে কয়েক হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে অস্ত্র ও গ্রেনেডসহ অনুপ্রবেশ করানো হয়। পাকিস্তানি এলাকার ভেতর থেকে গেরিলা আক্রমণ চালিয়ে হানাদারদের সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি করাই ছিল এই অনুপ্রবেশের লক্ষ্য। দিন যত যেতে থাকে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা ততই বেড়ে যায় এবং হানাদার বাহিনী দিনের পর দিন কোনঠাসা হতে থাকে। ১০ অক্টোবর ভোরবেলা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার চড়ারহাট এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা মহিলা, শিশু, বৃদ্ধ, যুবকসহ সবাইকে ধরে নিয়ে এসে নারকীয় হত্যাকাণ্ড চালায়, যাতে ১৫৭ জন মারা যান। ১৮ অক্টোবর মুক্তিবাহিনী গোপালগঞ্জ সড়কে ১৭ পাকিস্তানি সেনাকে হত্যা করেন। এরপর একে একে নবাবগঞ্জ, জগতপুর, পার্বতীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিহত করেন।

ডিসেম্বরের শুরুতেই মুক্তিযোদ্ধাদের হামলার মুখে পাকিস্তানি সেনারা কোনঠাসা হয়ে পড়ে। ৪ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা জেলার ফুলবাড়ী উপজেলা থেকে পাকিস্তানি সেনাদের বিতাড়িত করে ফুলবাড়ী উপজেলা মুক্ত করেন। ৬ ডিসেম্বর বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সম্মুখ লড়াইয়ে টিকতে না পেরে হানাদার বাহিনী এবং তার দোসরেরা বীরগঞ্জ এলাকা ছেড়ে পাশেই সৈয়দপুরে তৎকালীন অবাঙালিদের ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছিল। একই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে টিকতে না পেরে বোচাগঞ্জ উপজেলা ও বিরামপুর উপজেলা থেকে হানাদাররা পালিয়ে যায়। ওই দিনই বীরগঞ্জ, বোচাগঞ্জ ও বিরামপুর উপজেলা মুক্ত হয়।

৮ ডিসেম্বর চিরিরবন্দরে মুক্তিযোদ্ধারা ৫১ জন রাজাকারকে বন্দি করেন। কিছু কিছু দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে দিনাজপুর চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে অগ্রসর হয়। ১০ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা বিরলে পাক সেনাদের ঘাঁটির ওপর হামলা চালায়। ১১ ডিসেম্বর বিরলে পাকিস্তানি সেনারা হামলা চালিয়ে বহু নিরীহ মানুষকে হত্যা করে চলে যায়। ১১ ডিসেম্বর বিরলের অধিকাংশ এলাকা মুক্ত হয়। ১২ ডিসেম্বর চেহেলগাজী ও সুইহারী বাসস্ট্যান্ডের কাছে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে বড় ধরনের যুদ্ধ হয় এবং উভয়পক্ষের অর্ধশতাধিক নিহত হয়। ১৩ ডিসেম্বরের মধ্যে দিনাজপুর জেলার হাকিমপুর, নবাবগঞ্জ, ঘোড়াঘাট, বীরগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে চলে আসে। ১৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনারা বিরলের ৪৩ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে ও কাঞ্চন ব্রিজ বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেয়।

১৪ ডিসেম্বর বিরল উপজেলার মঙ্গলপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে মিত্রবাহিনী যোগ দেয়। এরপর পাকিস্তানি সেনারা দিনাজপুর থেকে সৈয়দপুরের দিকে চলে যায়। ১৪ ডিসেম্বর সকাল বেলাই দিনাজপুর মুক্ত হয়। তবে তারা সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে ওঁৎ পেতে থাকে। তারা নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে যাওয়ার সময় কাঞ্চন নদীর লোহার ব্রিজ, ভুষিরবন্দর ব্রিজ, মোহনপুর ব্রিজ, দিনাজপুর টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ভেঙে দেয়। অবশেষে ১৮ ডিসেম্বর বিজয় পতাকা ওড়ে দিনাজপুরে।

 

/এনআই/এফএস/

লাইভ

টপ