১৫ ডিসেম্বর বিকাল পর্যন্ত গাজীপুরে হানাদারদের ওপর হামলা চলে

Send
রায়হানুল ইসলাম আকন্দ, গাজীপুর
প্রকাশিত : ১২:১৪, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২৩, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৭

গাজীপুরে মুক্তিযুদ্ধ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পরাজয় মেনে নেওয়ার আগে গাজীপুরে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধের মুখে পড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ১৫ ডিসেম্বর রেল ও সড়কপথে একাধিক সেতু ধ্বংস এবং চারদিক থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ধারাবাহিক আক্রমণে জিম্মি হয়ে পড়ে তারা। বেশিরভাগ পাকিস্তানি সেনা গাজীপুরের সীমা রেখা ছেড়ে পালিয়ে যেতে থাকে। ওই দিনই গাজীপুর শত্রুমুক্ত হয়।

গাজীপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার কাজী মোজাম্মেল হক জানান, যুদ্ধের সময় তিনি ঢাকা উত্তরের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ছিলেন। ১৯৭১ সালের নভেম্বর মাসে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি গাজীপুরে প্রবেশ করেন। গাজীপুর ছাড়াও সাভার, ধামরাই এলাকার মুক্তিযোদ্ধা এবং মিত্রবাহিনীর সমন্বয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন। সে বছর ১৫ ডিসেম্বর গাজীপুর মহানগরের ছয়দানা মালেকের বাড়ি এলাকায় মুখোমুখি যুদ্ধে অংশ নেন।  কাশিমপুর থেকে মিত্র ও কাদেরিয়া বাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর কামান ও মর্টারের শেল নিক্ষেপ করতে থাকে। একইসঙ্গে সড়কের দুই পাশ থেকে মুক্তিবাহিনীর টানা গুলিবর্ষণে হানাদার বাহিনী একেবারে দুর্বল হয়ে পড়ে। ধ্বংস হয় তাদের ট্যাংক, কামান, মর্টার, যানবাহন ও গোলাবারুদ। হতাহত হয় অসংখ্য পাকিস্তানি সেনা। আর সেদিন থেকেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাত থেকে মুক্ত হয় গাজীপুর।

২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালিদের নৃশংস গণহত্যায় মেতে উঠলে গাজীপুরের জনতাও গর্জে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের একবারে প্রথম থেকে যুদ্ধ শুরু হয় এই জেলা, দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ চলে গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায়। স্বাধীনতার স্বাদ নিতে উন্মুখ গাজীপুরবাসী প্রথমে জয়দেবপুর থেকে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। চারদিক থেকে মুক্তিযোদ্ধারা গাজীপুর শহরের জয়দেবপুরের দিকে সমবেত হতে থাকেন। ৩ ডিসেম্বর আক্রমণ আরও জোরদার হয়। ১৩ ও ১৪ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা গাজীপুর সেনানিবাসে সম্মিলিত আক্রমণ চালান। এতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। হানাদাররা গাজীপুর ছেড়ে ঢাকায় পালিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকে। গাজীপুর সমরাস্ত্র কারখানা ও রাজেন্দ্রপুর অর্ডিন্যান্স ডিপো থেকে পাকিস্তানি সেনারা ঢাকার পথে চান্দনা চৌরাস্তায় জড়ো হতে থাকে।

এ ছাড়া ময়মনসিংহ, শেরপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইল থেকেও মুক্তিযোদ্ধা, মিত্র ও কাদেরিয়া বাহিনী গাজীপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর আক্রমণ চালায়। এসব আক্রমণে টিকতে না পেরে ঢাকার দিকে পিছু হটতে থাকে হানাদাররা।পিছু হটার সময় তারা কড্ডা সেতু ধ্বংস করে দেয়। পিছু ধাওয়া করে মিত্র ও কাদেরিয়া বাহিনী কোনাবাড়ী ও কাশিমপুরে অবস্থান নেয়। চান্দনা চৌরাস্তায় জড়ো হওয়া পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরাট একটি টিম ঢাকার দিকে রওনা দেয়। পথে ছয়দানা এলাকায় পৌঁছালে কাশিমপুর থেকে মিত্র ও কাদেরিয়া বাহিনী তাদের ওপর কামান ও মর্টারের শেল নিক্ষেপ করতে থাকে। একইসঙ্গে সড়কের দুই পাশ থেকে মুক্তিবাহিনীর উপর্যুপরি গুলিবর্ষণে পাকিস্তানি বাহিনী একেবারে দুর্বল হয়ে পড়ে। হতাহত হয় তাদের অসংখ্য সেনা। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ঢাকার কাছে এটাই ছিল হানাদার বাহিনীর সবচেয়ে বড় পরাজয়। পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর গোলাবর্ষণ ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যা পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। হানাদার বাহিনীর পর্যুদস্ত হওয়ার ফলে ওইদিনই গাজীপুর মুক্ত হয়।

‘শ্রীপুরের ইতিহাস ও কৃষ্টি’ গ্রন্থে লেখা শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় লিখিত একটি নাম কেওয়া গ্রামের শহীদ সাদির আকন্দ। তার ছেলে ও শ্রীপুর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নূরুন্নবী আকন্দ বলেন, ‘১৯৭১ সনের ২৫ মার্চ কালরাত্রির পর থেকে প্রথমেই শুরু হয় সশস্ত্রবাহিনীর প্রশিক্ষিত অবসরপ্রাপ্ত সৈন্যদের হত্যা করা। আমার বাবা সাদির আকন্দ ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট। সে সময় তিনি টঙ্গীতে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। ২৫ মার্চ কালরাত্রির পর দেশব্যাপী কারফিউ চলাকালীন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমার বাবাকে টঙ্গীতে হত্যা করে মরদেহটিও নিয়ে যায়।’

অধ্যক্ষ দাবী করেন, ২৫ মার্চের পর থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশ মাতৃকার জন্য যারা জীবন দিয়েছেন তারা প্রত্যেকেই মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। স্বাধীনতার ৪৬ বছরে সে সব বীর শহীদদের তালিকা এবং বীরাঙ্গনাদের তালিকা আজও তৈরি হয়নি। দ্রুত তাদের তালিকা তৈরির দাবি জানান তিনি।

 

/এফএস/

লাইভ

টপ