মাগুরায় মুক্তিযুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলেন আনসাররা

Send
মাজহারুল হক লিপু, মাগুরা
প্রকাশিত : ১২:৪৯, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:৪৯, ডিসেম্বর ১৫, ২০১৭

সারা দেশের মতো একাত্তরের মার্চেই উত্তাল হয়ে উঠেছিল মাগুরা। এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে পাকবাহিনী মাগুরায় প্রবেশ করতে শুরু করে। তারা সীমাখালী ও আলমখালী দিয়ে মাগুরায় প্রবেশ করে। পাকবাহিনী মাগুরা প্রবেশের সময়ই প্রতিরোধ গড়ে তোলেন স্থানীয় আনসাররা, তবে তারা পাকবাহিনীকে প্রতিহত করতে পারেননি। প্রথম ওই প্রতিরোধ যুদ্ধে নিহত হন বেশ কয়েকজন আনসার সদস্য।

মাগুরার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভমাগুরা-ঝিনাইদহ মহাসড়ক দিয়ে ২৩ এপ্রিল সকালে পাক বাহিনী তৎকালীন মাগুরা মহকুমা সদরে প্রবেশ করে। ওই এলাকার প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আজিজের মতে, পাকবাহিনী স্থানীয় আলমখালি বাজার এলাকায় পৌঁছেই বাজারের অদূরে মহাসড়কের উত্তরপাশে ডেকে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেন নিরীহ সুরেনকে। ওইদিনই মহকুমা শহর মাগুরা প্রবেশের পর শহর থেকে প্রায় এক কিলেমিটার দূরবর্তী পারনান্দুয়ালি এলাকায় অবস্থিত কছুন্দি ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের সামনে পাকবাহিনীর সাঁজোয়া বহর পৌঁছায়।

তখন বর্তমান সদর উপজেলার বগিয়া ইউনিয়নের বাগবাড়িয়া গ্রামের লালু পাগলা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে ঘাতকদের গাড়িবহরের সামনে দাঁড়ায়। সঙ্গে সঙ্গেই পাকবাহিনীর গুলি করে তার বুকে। সুরেন বিশ্বাস এবং লালু পাগলার এই আত্মদান সেদিন মাগুরাবাসীকে প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছিল, বলেও জানান এই মুক্তিযোদ্ধা।

পাকবাহিনী রাজাকারদের সহযোগিতায় তৎকালীন নতুন কোর্ট পুলিশ ব্যারাক অর্থাৎ বর্তমান জেলা প্রশাসকের কার্যালয় এলাকা, বর্তমান প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই) ভবন, মাইক্রোওয়েভ কেন্দ্র, বর্তমান ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট (ভিটিআই), সদর হাসপাতালসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ক্যাম্প স্থাপন করে। পাকিস্তানি অফিসাররা অবস্থান নেয় স্থানীয় নোমানী ময়দান এলাকায় অবস্থিত বর্তমান পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডাক বাংলোয়।

এদিকে রাজাকররা ক্যাম্প করে বর্তমান সৈয়দ আতর আলী সড়কের দত্ত বিল্ডিং, তৎকালীন গোল্ডেন ফার্মেসি (বর্তমান আমজেদিয়া ফার্মেসির বিপরীতে), সদর থানার হাজীপুর, শত্রুজিৎপুর, ইছাখাদা, আলমখালী, তৎকালীন শালিখা থানার আড়পাড়া এলাকা, একই থানার শতখালী, তৎকালীন শ্রীপুর থানার কাদিরপাড়া, নাকোল, লাঙ্গলবাঁধ এবং তৎকালীন মহম্মদপুর থানার টিটিডিসি বিল্ডিং, নহাটাসহ আরও কয়েকটি জায়গায়।

হানাদার বাহিনী এবং রাজাকারদের সহযোগিতায় জেলার নিরীহ জনগণের ওপর নির্যাতন চালায়। বিভিন্ন এলাকায় চলতে থাকে হত্যাকাণ্ডসহ অগ্নিসংযোগের ঘটনা।

মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ১৯৭১ সালে ৮ নম্বর সেক্টরের অধীনে মাগুরার রণাঙ্গন ছিল মোটামুটি তিন ভাগে বিভক্ত। যার উত্তরে ছিল শ্রীপুর বাহিনী। এ বাহিনীর শিবির ছিল শ্রীপুর থানার শ্রীকোল ইউনিয়নের খামারপাড়া এলাকায়। আকবর হোসেন মিয়ার নেতৃত্বে ৬টি ৩০৩ রাইফেল, ১টি চাইনিজ রাইফেল, ১টি ওয়ারলেস সেট ও সামান্য গুলি নিয়ে এই বাহিনীর যাত্রা শুরু হয়। বাহিনীতে প্রায় ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।

এ অঞ্চলে মুজিব বাহিনীর প্রধান ছিলেন হাজীপুরের অবুল খায়ের। তৎকালীন সদর থানার আড়ুয়াকান্দি ব্রিজের কাছে স্থলমাইন স্থাপন করে পাক-বাহিনীকে প্রতিরোধসহ বিভিন্ন জায়গায় সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন তিনি। মাগুরার দক্ষিণ-পূর্বভাগে মহকুমার মুহম্মদপুর অঞ্চলে বীরপ্রতীক গোলাম ইয়াকুবের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী বাহিনী গড়ে ওঠে। এই বাহিনীর কোনও স্থায়ী শিবির ছিল না। এই বাহিনীর ১৬০ জন যোদ্ধা ছিলেন।

মাগুরা সদর উপজেলার হাজীপুর এলাকায় গঠিত হয় আরও একটি বাহিনী যার প্রধান ছিলেন কাজী আবু ইউসুফ ও খন্দকার আব্দুল মাজেদ। পরবর্তীতে এর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩০ জনে। এছাড়া তৎকালীন সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন পরবর্তীতে মেজর জেনারেল (বর্তমানে মাগুরা-১ আসনের সংসদ সদস্য) বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওহাব শ্রীপুরের পাশে ঝিনাইদহের শৈলকুপা এলাকায় ‘ঈগল বাহিনী’ নামে একটি বাহিনী পরিচালনা করেন।

নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলাকালে মুক্তিযোদ্ধাদের অবিরত হামলায় পাক হানাদার বাহিনী আর তাদের দোসরদের কোনঠাসা করে ফেলে। একপর্যায়ে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর আকাশ ও স্থলপথে আক্রমণ দিশেহারা শত্রুবাহিনী ১৯৭১ সালের ৭ ডিসেম্বর মাগুরা থেকে পালিয়ে যায়।

মাগুরা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার মোল্লা নবুওয়ত হোসেন বলেন, ‘৮ নম্বর সেক্টরের অধীনে মাগুরায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ মুক্তিযোদ্ধা অংশ নেয়। বর্তমানে জীবিত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ১ হাজার ৬৭৮ জন। মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা ১ হাজারের ঊর্ধ্বে।’

/এমও/

লাইভ

টপ