গণহত্যার পর পুরুষশূন্য হয়ে যায় তারাপুর চা বাগান

Send
তুহিনুল হক তুহিন, সিলেট
প্রকাশিত : ১৫:২১, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৬, ডিসেম্বর ১৬, ২০১৭

তারাপুর চা বাগানে স্মৃতিসৌধ১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল।সিলেটের তারাপুর চা বাগানের নাম তখন ছিল ‘দ্য স্টার টি গার্ডেন’। ৬০-৭০ জন পাকিস্তানি হানাদার সেদিন সকালে এসে প্রবেশ করে ওই চা বাগানে। সেখানে কর্মরত শতাধিক পুরুষকে ধরে নিয়ে যায় তারা। মালনিছড়া চা বাগান হয়ে ক্যাম্পে যাওয়ার পথে টিলার ওপর একে একে গুলি করে হত্যা করে সবাইকে। ছলছল চোখে এভাবেই একাত্তরের ওই দিনটির কথা বলছিলেন তখনকার চা বাগানের সেবায়েত শহীদ রাজেন্দ্র লাল গুপ্তের ছেলে পঙ্কজ কুমার গুপ্ত।

বাংলা ট্রিবিউনকে পঙ্কজ কুমার গুপ্ত জানান, হানাদার বাহিনী যখন সবাইকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল তখন বাগানের নারীদেরে দেখে রাখার জন্য পাকিস্তানিদের অনুরোধ করেন তার বাবা। তখন তিনি ১৭ বছরের তরুণ। বয়স কম হওয়ায় ও পাকিস্তানিরা রেখে যেতে রাজি হওয়ায় প্রাণে বেঁচে যান তিনি।পঙ্কজ গুপ্ত

সেদিনের গণহত্যার কথা স্মরণ করতে গিয়ে পঙ্কজ কুমার গুপ্ত বলেন, ‘যুদ্ধের সময় পুরো সিলেট জুড়ে কারফিউ (জরুরি অবস্থা) চলছিল। ১৮ এপ্রিল সকাল ১১টায় ৬০-৭০ জন পাকিস্তানি সেনা বাগানে এসে (বাংলোয়) প্রবেশ করে আমাদের পরিবারের সব পুরুষসহ বাগানের শ্রমিকদের এক জায়গায় জড়ো করে। ডান্ডি কার্ড (নিরাপদে চলাফেরা করতে পারার জন্য পাকিস্তানিদের দেওয়া কার্ড) দেওয়ার কথা বলে সবাইকে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। এসময় আমার বাবা মহিলাদের দেখে রাখার জন্য আমাকে বাড়িতে রেখে যাওয়ার অনুরোধ করেন। পরে তারা আমাকে রেহাই দেয়। অন্য সবাইকে তিন ভাগে ভাগ করে মালনিছড়ার টিলার ওপর নিয়ে হত্যা করে। তবে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান বাগানের শ্রমিক সদানন্দ ও গণেশ হালদার। সদানন্দের হাঁটুতে গুলি লাগে। আর গণেশ অক্ষত অবস্থায় ফিরে আসে। বাগানে ফিরে এসে তারা জানান, সবাইকে মালনিছড়া টিলার ওপরে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। সেদিন আমার বাবা, তিন কাকা ও ভাইসহ পরিবারের সব পুরুষ সদস্যকে হত্যা করা হয়।’

তিনি বলেন, ‘গণহত্যার পর পুরো বাগান পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে। ১৯ এপ্রিল ভোরে মা-কাকি, বোনসহ ১৫-২০ জনকে ছাতকের ভোলাগঞ্জ দিয়ে এবং অন্যদের করীমগঞ্জ ও বিয়ানীবাজারের সুতারকান্দি সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাঠিয়ে আবার বাগানে চলে আসি। ওই দিন সকাল ১০টায় আবার বাগানে আসে পাকিস্তানিরা। এসময় তারা বাগানের নারীদের খোঁজ করে। কাউকে না পেয়ে তারা আক্রোশে গুলি করে হত্যা করে বাংলোর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা নেপালি নবীরামকে। সেই সঙ্গে বন্দি করে নিয়ে যায় আমাকে এবং নরেশ চক্রবর্তী ও তার ছেলে নারায়ণ চক্রবর্তী, শ্রমিক দুর্গেশ দাস ও মহেন্দ্র পালকে।’তারাপুর চা বাগানের শহীদদের তালিকা

তিনি জানান, তারাপুর বাগানের পাশের এলাকা ঘোষপাড়ার একটি ছনের ঘরে একে একে হত্যা করা হয় সবাইকে। তবে একবারও প্রাণে বেঁচে যান পঙ্কজ গুপ্ত। পরে ওই ছনের তৈরি ঘরসহই পুড়িয়ে দেওয়া হয় লাশগুলো। পঙ্কজকে নিয়ে যাওয়া হয় সিলেট নগরের বাগবাড়ি মদিনা মার্কেটের ক্যাম্পে। তিনি নিজেকে চা বাগানের চাকর হিসেবে পরিচয় দেন। বেধড়ক পিটিয়ে পাকিস্তানিরা তাকে আখালিয়া ক্যাম্পে নিয়ে যায়।

সেসময়ের দুর্বিষহ এক তথ্য জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানিরা আমাকে ধর্মান্তরিত হওয়ার শর্ত দিয়ে সিলেট নগরের দর্জিপাড়ার মুসলিম পরিবার মতিন মিয়ার কাছে নিয়ে যায়। আমার নাম রাখা হয় ‘আমানত আলী’। পরে দেশে তুমুল যুদ্ধ শুরু হলে আমি ওই বাড়ি থেকে পালিয়ে সিলেট নগরে আশ্রয় নেই।’

তারাপুর চা বাগানের কেন্দ্রস্থলে শহীদদের স্মরণে ১৯৮৮ সালে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা করা হয় বলেও জানান পঙ্কজ।

সিলেট মহানগর মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডার ভবতোষ রায় বর্মণ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সিলেটের তারাপুর চা বাগান ছাড়াও পাকিস্তানি সেনারা দুই দিনের ব্যবধানে শহরতলীর খাদিমপাড়ায় ৬১জনকে হত্যা করে। এছাড়াও পাকিস্তানিরা শহরতলীর দলদলি চা বাগান এবং নগরীর হাওয়াপাড়ার ভূজবাড়িতেও গণহত্যা চালিয়ে অর্ধশতাধিক নারী-পুরুষকে হত্যা করে। পাকিস্তানি সেনারা সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে লোকজন ধরে নিয়ে এসে সবচেয়ে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে দক্ষিণ সুরমার ফেঞ্চুগঞ্জ রোডের লালমাটিয়া এলাকায়। এখানে কয়েক হাজার লোকের বধ্যভূমি রয়েছে।’

 

/এসএসএ/এফএস/

লাইভ

টপ