কিশোরগঞ্জের আকাশে লাল-সবুজের পতাকা ওঠে ১৭ ডিসেম্বর

Send
বিজয় রায় খোকা, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশিত : ০৬:০৩, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ০৬:১৩, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৭

অযত্নে মুছে গেছে স্মৃতিস্তম্ভে লেখা শহীদদের নামএকাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর সারাদেশের মানুষ বিজয়ের আনন্দ উপভোগ করলেও কিশোরগঞ্জবাসী সেদিনের আনন্দে শরিক হতে পারেনি।  কারণ, কিশোরগঞ্জের  বীর মুক্তিযোদ্ধারা তখনও পাকিস্তানি-হানাদারদের শেকল ভাঙতে যুদ্ধ করেছে।
শহরের চারদিক থেকে আক্রমণ করে অবশেষে ১৭ ডিসেম্বর সকাল ৮টার দিকে বীর মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি হানাদারদের হটিয়ে মুক্ত করে কিশোরগঞ্জকে।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, কিশোরগঞ্জে ১৬ ডিসেম্বর গভীর রাতেও পাকিস্তানি বাহিনীর দোসরদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচণ্ড লড়াই হয়েছে এবং রক্ত ঝরেছে।

প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের জন্মভূমি এই কিশোরগঞ্জ, বীর প্রতীক সেতারা বেগম, বীর প্রতীক কর্নেল হায়দার, বীর প্রতীক নূরুল ইসলাম খান পাঠানের বাড়ি এই কিশোরগঞ্জে।  এ জেলার মানুষেরা এই  বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গর্বিত।

শহর থেকে চার কিলোমিটার দক্ষিণে সৈয়দ নজরুল ইসলামের বাড়ি যশোদল ইউনিয়নে। আর এ জন্যই হয়তো একাত্তরে ঘাতকের দল ওই এলাকার মানুষদের বিশেষভাবে টার্গেট করেছিল। ১৩ অক্টোবর স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে (তাদের রক্ষা করবে বলে) আশপাশের গ্রাম থেকে প্রায় ছয় শতাধিক মানুষকে  আলোচনার কথা বলে বড়ইতলায় এনে জড়ো করে। এরপর গুলি চালিয়ে ও বেয়নেট চার্জ করে একসঙ্গে ৩৬৫ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। সেখান থেকে বেঁচে যাওয়া সেদিনের কিশোর সিরাজুল ইসলাম মানিক সেই ঘটনায় তার বাবাসহ অনেক আত্মীয়-স্বজনকে হারানোর মর্মন্তুদ বর্ণনা দিয়েছেন।

ওই দিন বেয়নেটের আঘাতে গুরুতর আহত হয়েও ভাগ্যের জোরে বেঁচে গিয়েছিলেন চিকনিরচর গ্রামের শরাফত উদ্দিন ও তার বড় ভাই মোমতাজ উদ্দিন।  আজও তারা সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। যশোদল ইউনিয়নের নয়টি গ্রামের মানুষ এই হত্যাযজ্ঞের শিকার হলেও তারা আজও পাননি শহীদের মর্যাদা। স্বজনহারাদের দেওয়া হয়নি কোনও সান্ত্বনা।

শহীদদের স্মরণে এলাকায় নির্মিত স্মৃতিসৌধটি অযত্ন- অবহেলায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এসব শহীদের নাম দুটি স্তম্ভে লেখা হলেও তা মুছে গেছে অনেক আগেই।

মুছে গেছে স্মৃতি স্তম্ভে লেখা শহীদদের নামশহীদদের স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে নিজের জমি দিয়েছেন আরেক স্বজনহারা আব্দুর সাত্তার। সেই জমির ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে বর্তমান স্মৃতি সৌধটি।

আব্দুস সাত্তার বলেন, ‘বর্তমান সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছে। কিন্তু ইতিহাসের নৃশংসতম এই গণহত্যার পেছনে যেসব স্থানীয় রাজাকারের ইন্ধন ছিল, তাদের বিচারে কোনও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। আমি জোরালোভাবে সরকারের কাছে আবেদন জানাই, যেন এ গণহত্যায় জড়িতদের বিচার করা হয়।’

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাসউদ জানান, সেদিন যাদের নিমর্মভাবে হত্যা করা হয়েছিল, তাদের পরিপূর্ণ তালিকা তৈরির জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তালিকা তৈরির পর ইউনিয়ন পরিষদ অথবা জেলা পরিষদের মাধ্যমে সেখানে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটির সংস্কার এবং আধুনিকায়নের প্রয়াস চালাবো।একই সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধের যে স্মৃতি সেটিকে সমুন্বত রাখার চেষ্টা করবো।

একাত্তরের ২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর  ১৯ এপ্রিল (শুক্রবার) ট্রেনে করে হানাদার বাহিনী প্রথম কিশোরগঞ্জে প্রবেশ করে। ৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী কিশোরগঞ্জ ছেড়ে চলে গেলেও তাদের দোসররা কিশোরগঞ্জে শক্ত অবস্থান ধরে রাখে। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি আর্মিদের আত্মসমর্পণের খবরে উজ্জীবিত মুক্তিযোদ্ধারা কিশোরগঞ্জকে মুক্ত করতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ওইদিন রাতে মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন দল কিশোরগঞ্জ শহরের চারপাশে সশস্ত্র অবস্থান নেয়।

পরদিন ১৭ ডিসেম্বর সকাল নয়টার দিকে শহরের পূর্ব দিক দিয়ে কমান্ডার কবীর উদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে প্রথমে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল কিশোরগঞ্জ শহরে প্রবেশ করে। এর পরপরই অন্যান্য প্রবেশ পথ দিয়েও মুক্তিযোদ্ধারা দলে দলে শহরে প্রবেশ করতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযানের খবরে মুক্তিকামী জনতাও উল্লাস করে স্বাধীনতার স্লোগান দিয়ে রাস্তায় নেমে আসে। সামান্য প্রতিরোধের পরই পাকিস্তানি বাহিনীর এদেশীয় দোসররা আত্মসমর্পণ করে। শহরের শহীদি মসজিদ প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে অস্ত্র সমর্পণ করে হানাদার বাহিনীর দোসররা। এভাবেই বিজয় দিবসের একদিন পর ১৭ ডিসেম্বর কিশোরগঞ্জের আকাশে ওঠে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।

মুক্তিযোদ্ধা কবীর উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এখনও সেদিনের ঘটনা আমার চোখে ভেসে ওঠে। সকাল থেকে জিপে চড়ে যখন শহীদি মসজিদের সামনে আসি, তখনও অনেক পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার অস্ত্র নিয়ে ঘোরাঘুরি করছিল । তারা আত্মসমর্পণ করার পর আমরা খুব সচেতনভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের বুঝাচ্ছিলাম, আর কোনও রক্ত যেন না ঝড়ে। ইসলামিয়া বোর্ডিংয়ের একটি ঘরে সব অস্ত্র রাখা হয়েছিল। সবাই আনন্দে আপ্লুত ছিলাম। আমরা আনন্দে সবাই সেদিন কেঁদেছি। ছাত্রলীগ শহরজুড়ে মিছিল করলো- জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে। সবার আতঙ্ক কেটে গেল। জিপে চড়ে  সারা শহরে ঘুরলাম। কিশোরগঞ্জ শত্রুমুক্ত হলো।’

দেশ স্বাধীন হবার পর এই বড়ইতলার নামকরণ করা হয় শহীদ নগর। স্বাধীনতার পর শহীদদের স্মরণে এখানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম উদ্যোগে একটি স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ করা হয়। সিদ্বেশরী, মনিপুরী ঘাট, শোলমারা পুল, শোলাকিয়া, বত্রিশ, বড়পুল, ভাস্করখিলাসহ একাধিক জায়গায় অগণিত নর-নারীকে হত্যা করেছিল হানাদাররা।

 

 

 

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ