বন্ধুর পরামর্শে মৌ চাষ, স্বাবলম্বী জানারুল

মেহেদী হাসান, চুয়াডাঙ্গা
২৬ জানুয়ারি ২০১৮, ০৯:৩৪আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০১৮, ০৯:৩৮

সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছেন মৌ চাষি জানারুল ইসলাম অভাবের কারণে বাড়ি ছেড়ে যাওয়া তরুণ জানারুল ইসলামের (৩০) সংসারে এখন আর অভাব নেই। সচ্ছলতা এসেছে। মৌ চাষে হয়েছে ভাগ্য বদল। যারা তাকে ঠাট্টা-মশকরা করতো, তারা এখন অবাক। বন্ধুর পরামর্শে তিনি এখন স্বাবলম্বী। জানারুলের বাড়ি চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার সীমান্তবর্তী কুতুবপুর গ্রামে। তিনি শাহাবুদ্দিন সর্দারের একমাত্র ছেলে।

অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চলাতেন জানারুল। প্রায় বছর দুয়েক আগে বাড়ি থেকে রাগ করে চলে যান গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানি উপজেলায়। সেখানে মাঠে সেচমেশিন চালানোর কাজ নেন। কাশিয়ানিতেই পরিচয় হয় জুয়েল নামের রাজশাহীর এক মৌ চাষির সঙ্গে। তার পরামর্শে জানারুল মাস পাঁচেক আগে গ্রামে ফিরে আসেন। জুয়েলের কাছ থেকে কিনে আনেন ৪০ হাজার টাকায় মৌ চাষের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। তারপর হুদাপাড়া মাঠে মৌ চাষ শুরু করেন। গ্রামবাসী প্রথমে তাকে ঠাট্টা-মশকরা করে। এখন তার পোয়াবারো। প্রতি সপ্তাহে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকার মধু বিক্রি করছেন তিনি। সংসারেও ফিরতে শুরু করেছে সচ্ছলতা।

মা-বাবা, স্ত্রী ও মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস (৭) নিয়ে তার সংসার। দুই বোনের  আগেই বিয়ে হয়ে গেছে।

মৌ চাষি জানারুল বলেন, ‘কাশিয়ানিতে জুয়েল ভাইয়ের মৌ চাষ দেখে আগ্রহ সৃষ্টি হয়। কিছু টাকা জোগাড় করে বাড়ি ফিরে আসি। পরে ওই জুয়েল ভাইয়ের সঙ্গে রাজশাহী থেকে ৪০ হাজার টাকায় ৭টি বক্স, মৌমাছিসহ ৩৫ টি চাক এবং চাক থেকে মধু ছাড়ানো মেশিন কিনে নিয়ে আসি। পরে আরও একটি বক্স এবং ১০টি চাক বাড়িয়েছি। বর্তমানে মোট ৮টি বক্সে ৪৫টি চাক আছে। ২ মাসে প্রায় ১শ ৩০ কেজির মতো মধু বিক্রি করেছি। প্রতি কেজি ৩শ টাকা করে বিক্রি করি। এলাকায় নির্ভেজাল মধুর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। তাই বাড়ি থেকেই বিক্রি হয়ে যায়। প্রতি সপ্তাহে ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা লাভ থাকে।’

 বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি মুচকি হেসে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অভাবের তাড়নায় গিয়েছিলাম।’

জানারুল বলেন, ‘একটি বক্সে একটি মাত্র রানি মৌমাছি থাকে, আর পুরুষ মৌমাছি থাকে ৪-৫টি। বাকিরা সবাই শ্রমিক। তারা ফুল থেকে মধু সংগ্রহের কাজে ব্যস্ত থাকে।’ রানি মৌমাছি না থাকলে চাকে মধু হবে না বলে জানালেন মৌ চাষি জানারুল।

মৌ চাষি জানারুল ইসলাম দামুড়হুদা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আবু হেনা মোহাম্মদ জামাল শুভ বলেন, ‘মধু মহান সৃষ্টিকর্তার দেওয়া প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়েটিক ওষুধ। যা সহজেই হাতের কাছে পাওয়া যায়। মধুর গুণের কথা বলে শেষ করা যাবে না। শিশুদের ঠাণ্ডা ও কাশি সারাতে খুবই ভাল কাজ করে। বড়দের ক্ষেত্রেও মধুর রয়েছে বিশেষ কিছু গুণাবলি। ওজন ও চর্বি  কমাতেও মধু কাজে লাগে। দেহে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে মধু খেলে ভাল ঘুম হতে সাহায্য করে। চর্বি কমানোর মধ্যদিয়ে হার্ট ভালো থাকে। মধু ডায়াবেটিক রোগীরাও খেতে পারেন। কারণ এতে ডায়াবেটিক বাড়ে না। বরং ডায়াবেটিকের কারণে যারা চিনি খেতে পারেন না, তারা মধু খাওয়ার মধ্য দিয়ে চিনির স্বাদ পাবেন। এছাড়া চামড়ার উজ্জ্বলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ত্বকের সৌন্দর্য্য বৃদ্ধিতে মধুর জুড়ি নেই।’

চুয়াডাঙ্গায় এটাই বাণিজ্যিকভাবে প্রথম মৌ চাষ উল্লেখ করে দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি অফিসার সুফি রফিকুজ্জামান বলেন, ‘মৌমাছি ফুলে বসার মধ্যদিয়ে পরাগায়ন হয়। যে মাঠে যত বেশি মৌমাছি থাকবে, সেই মাঠে তত বেশি পরাগায়ন হবে। স্বাভাবিকভাবে একবিঘা জমিতে ৪-৫ মণ সরিষা হয়। মৌমাছি বেশি হলে প্রায় ২৫ ভাগ উৎপাদন বেড়ে যায়। এই মৌসুমে দামুড়হুদা উপজেলায় প্রায় আড়াইশ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদ হয়েছে। বিচ্ছিন্নভাবে না করে কমিউনিটি আকারে সরিষার আবাদ করাটাই উত্তম। এতে  উৎপাদন ভালো হবে এবং মৌ চাষও এগিয়ে নেওয়াটা সহজ হবে।’

সরকারি এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘শুধু সরিষার মৌসুমেই নয়, সারা বছরই মৌ চাষ করা যাবে। কারণ আমাদের দেশে সারা বছরই কোনও না কোন ফুল থাকে। ফলে সরিষা শেষে আম বাগান, লিচু বাগানেও মৌ চাষ করা যাবে। মৌ চাষে বিনিয়োগের তুলনায় মুনাফা বেশি। কেউ যদি বাণিজ্যিকভাবে মৌ চাষ করতে চান, আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে প্রয়োজনীয় পরামর্শসহ সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।’

আরও পড়তে পারেন:

টার্কির খামার গড়ে স্বাবলম্বী

 

/এনআই/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
কারামুক্ত স্বামীকে জড়িয়ে কাঁদলেন স্ত্রী, আবার ধরে নিয়ে গেলো ডিবি পুলিশ
কারামুক্ত স্বামীকে জড়িয়ে কাঁদলেন স্ত্রী, আবার ধরে নিয়ে গেলো ডিবি পুলিশ
বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ
বিশ্ব পরিবেশ দিবস আজ
সোভিয়েত ভূমিতে জসীম উদ্‌দীন
সোভিয়েত ভূমিতে জসীম উদ্‌দীন
কেন্দ্র ও তৃণমূলের মাঝে দূরত্ব বাড়ছে বিএনপিতে?
কেন্দ্র ও তৃণমূলের মাঝে দূরত্ব বাড়ছে বিএনপিতে?
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি