কালের ধুলায় ঢাকা পড়েছে খুলনার ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি

Send
মো. হেদায়েৎ হোসেন, খুলনা প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১১:৪৭, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২০, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৮

খুলনার ভাষা সৈনিক আলহাজ লোকমান হাকিম

খুলনায় ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্র ছিল সদর থানার মোড়ে অবস্থিত কেডি ঘোষ রোডের ‘তৃপ্তি নিলয়’ নামের একটি গোলপাতার ঘর। কালের ধুলায় ঢাকা পড়ে গেছে সেই উত্তাল দিনের স্মৃতিময় স্থানটি। সেখানে গড়ে উঠেছে নতুন ভবন, হোটেল-মোটেল, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। অথচ ১৯৫২ সালে সেখানকার ওই ছোট্ট গোলপাতার ঘরে বসেই আন্দোলনের ছক কষা হতো। ভাষার জন্য জীবনও দিয়েছেন খুলনার মানুষ। কিন্তু সেসব স্মৃতি রক্ষা না করায় নতুন প্রজন্ম তাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস প্রসঙ্গে জানতে পারছে না কিছুই। ভাষাসৈনিক আলহাজ লোকমান হাকিমের কণ্ঠে এভাবেই আক্ষেপের সুর।

তিনি আরও বলেন, ‘সেই ১৯৫১ সালের কথা। ঢাকাসহ সারা দেশে যখন বাংলাকে মাতৃভাষা করার দাবিতে উত্তাল আন্দোলন শুরু হয়েছে, সেসময় খুলনার মানুষও জীবন বাজি রেখে মাঠে নেমেছে। পুলিশ গ্রেফতার করেছে অনেককে। গুলি করে হত্যা করেছে তৎকালীন বিএল কলেজের ছাত্রনেতা আনোয়ার হোসেনকে। সেসবেরও কোনও স্মৃতিচিহ্ন নেই।’

খুলনার ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘গোলপাতার তৈরি ‘‘তৃপ্তি নিলয়’’ ঘরটিকে (বর্তমানে বৈশাখী আবাসিক হোটেল) সভা-সেমিনারের রুম হিসেবে ব্যবহার করা হতো। ওইখানে বসেই ভাষা আন্দোলনের সব রূপরেখা চূড়ান্ত করা হতো। ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে তৃপ্তি নিলয়ে গিয়ে জানা যায়, ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলি হয়েছে। এ খবর নিশ্চিত হলাম খুলনা জেলা পুলিশ লাইনের অপারেটরের মাধ্যমে। তখনই আমরা তৃপ্তি নিলয়ে জড়ো হয়ে বাংলা ভাষার দাবিতে ও ছাত্রদের ওপর গুলি করার প্রতিবাদে বেলা ১১টার দিকে মিছিল বের করি। মিছিলে আমি স্লোগান দিই। মিছিলটি সদর থানার সামনে এলে তখনকার বাঘা এসপির নেতৃত্বে মিছিলে বাধা দেয় পুলিশ। মিছিল থেকে পুলিশ বিএল কলেজের ছাত্র ও সাতক্ষীরার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন, মালিক আতাহার, কমরেড নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান লিচু মোল্যাসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে থানায় রেখে নির্মম নির্যাতন করে। পরে তাদের কারাগারে প্রেরণ করা হয়। আমিসহ অন্যরা দৌড়ে পালাতে সক্ষম হই।’

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যারা পালাতে সক্ষম হয়েছিলাম, পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করে। তবে ছাত্রনেতা আনোয়ার হোসেনকে খুলনা কারাগার থেকে স্থানান্তর করা হয় রাজশাহী কারাগারে। তাকে কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে রাখা হয়। মিছিল থেকে সেদিন যারা গ্রেফতার হয়েছিল তার মধ্যে মালিক আতাহার পরে রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। এদিকে একই দিনে খুলনা নগরীর পিটিআই মোড়ে মাজেদা আলীর নেতৃত্বে মিছিল বের করেন নারীরা। মিছিলটি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়। এদিকে পুলিশের হুলিয়া মাথায় নিয়ে আন্দোলনকারীরা আত্মগোপনে থেকে সভা করতে থাকেন। সে সভার সিদ্ধান্ত মতে, পরের দিন অর্থাৎ ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২, বিকাল ৩টায় শহীদ হাদিস (গান্ধী) পার্কে বাংলা ভাষার দাবিতে সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়। ওই দিন দৌলতপুর বিএল কলেজ, মুহসিন কলেজ ও ফুলতলা এলাকায় সমবেত হন সবাই। লিচু মোল্যার সঙ্গে ফুলতলায় গিয়ে ছাত্রদের নিয়ে মিছিল বের করি আমরা। মিছিল করার সময় মুসলীম লীগ নেতা সরোয়ার মোল্যার নেতৃত্বে একদল লোক বাধা দেয়। এ সময় ছাত্রদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মিছিল হয় ও বাজারের দোকানদারদের সহযোগিতায় সকল দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। পরে বিকালে ট্রেন ও বাসযোগে যে যার মতো হাদিস পার্কে সমবেত হন। এ সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সমীর আহমেদ। পুরো হাদিস পার্ক লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। সমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়। সমাবেশে আন্দোলন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়। সে সময় স্থানীয় নেতারা মাওলানা ভাসানীসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরবর্তী কর্মসূচি গ্রহণ করেন।’

ভাষা আন্দোলনের সময় আন্দোলন করে পুলিশের গুলিতে নিহত ছাত্রনেতা আনোয়ার হোসেনের ব্যাপারে লোকমান হাকিম আরও বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের সময় খুলনায় প্রথম শহীদ হন বিএল কলেজের ছাত্রনেতা আনোয়ার হোসেন। তাকে খুলনা থেকে গ্রেফতার করে রাজশাহী কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। কৃষক নেতা আব্দুল হকসহ অন্যান্য ভাষা আন্দোলনকারী নেতাদের সঙ্গে তাকেও কারাগারের খাপড়া ওয়ার্ডে রাখা হয়। ওই ওয়ার্ডের কারাবন্দিরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার দাবিতে অনশন শুরু করেন। এ সময় পুলিশ তাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এতে ছাত্রনেতা আনোয়ার হোসেন শহীদ হন এবং কৃষক নেতা আব্দুল হকসহ অনেকে গুলিবিদ্ধ হন। কিন্তু তাদের স্মৃতি রক্ষায় খুলনায় কোনও উদ্যোগ নেই।’

ভাষাসৈনিক লোকমান হাকিমের অভিযোগ, ‘ভাষা আন্দোলনের সিঁড়ি বেয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন। কিন্তু এখন মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করা হলেও ভাষাসৈনিকদের উপেক্ষা করা হচ্ছে। মৃত্যুর পর ভাষাসৈনিকদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হচ্ছে না। রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতির মাধ্যমে তাদের মর্যাদা দেওয়া প্রয়োজন।’ এছাড়া ভাষা আন্দোলনে খুলনার প্রথম শহীদ ভাষাবীর আনোয়ার হোসেনের স্মৃতিরক্ষার দাবিও জানিয়েছেন তিনি।

এ ভাষাসৈনিক আরও বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের মূল চেতনা এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলন হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় এখনও সর্বত্র বাংলা ভাষার প্রচলন হয়নি। আন্তর্জাতিকভাবে ১৯৯৬ সালে বাংলা ভাষার জন্য ১৯৫২ সালের মহান ত্যাগের স্বীকৃতি হলেও আমাদের উচ্চ আদালত, বিশ্ববিদ্যালয়সহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে বাংলা ভাষা চালু হয়নি।’ শুদ্ধভাবে বাংলা ভাষা চর্চা ও এর ব্যবহার নিশ্চিত করতে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।  

উল্লেখ্য, ভাষাসৈনিক আলহাজ লোকমান হাকিম ১৯৪০ সালে খুলনার ফুলতলা উপজেলার দামোদর গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মৃত. ইউনুস আলী মোল্লা, মাতা- মৃত. রহিমা বেগম। তার চার ভাই ও পাঁচ বোন। তিনি দৌলতপুর হাজী মুহাম্মদ মুহসিন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাস করেন। এরপর তিনি দৌলতপুর বিএল কলেজে এইচএসসি ভর্তি হন। লেখাপড়া করা অবস্থায় তিনি ১৯৬০ সালে খুলনার বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফুটবল খেলোয়াড় হিসেবে যোগদান করেন। পরে তিনি বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্টোর কিপার হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাশনাল আওয়ামী লীগের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। বর্তমানে তিনি খালিশপুর বিদ্যুৎ উন্নয়ন কেন্দ্রের (পাওয়ার হাউজগেট) বিপরীত পাশে বিআইডিসি সড়কের নিজ বাসভবনে আছেন। ভাষা আন্দোলনে বিশেষ অবদান রাখায় তিনি মাওলানা ভাসানী ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। বর্তমানে তার বয়স ৭৮ বছর।

জানা যায়, লোকমান হাকিম ছোটবেলা থেকেই রাজনৈতিক পরিবেশে বড় হয়েছেন। সেখান থেকেই তিনি দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে মানবতার পাশে দাঁড়ান। তিনি খুলনা হিরোজ ক্লাবে শৈশব ও কৈশোর কাটিয়েছেন। ক্লাবটি পরিচালনা করতেন ফেরদৌস আহমেদ, আব্দুল জলিল, আবু চেয়ারম্যানসহ অন্যরা। তিনি খেলাধুলার ফাঁকে রাজনীতিবিদদের সঙ্গে তৎকালীন তৃপ্তি নিলয় নামে গোলপাতার ঘরে ভাষা আন্দোলন নিয়ে আলোচনায় যুক্ত হতেন। সেই আলোচনা থেকেই তিনি ভাষা আন্দলনের সময় রাজপথে নেমে আসেন। তিনি আন্দোলনের সময় একাধিকবার গ্রেফতার ও পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং কারাবরণ করেছেন।

 

 

/এএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ