ভালো নেই শেরপুরের ভাষাসৈনিক সৈয়দ আব্দুল হান্নান

Send
শাহরিয়ার মিল্টন, শেরপুর
প্রকাশিত : ১৬:৩৪, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৪১, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৮

পরিবারের সঙ্গে ভাষাসৈনিক সৈয়দ আব্দুল হান্নান

ইতোমধ্যে জীবনের ৮৬ বছর অতিক্রম করেছেন বর্ষীয়ান শিক্ষাবিদ ও ভাষাসৈনিক সৈয়দ আব্দুল হান্নান। ভাষা আন্দোলনের পরেও কেটে গেছে ৬৬ বছর। শেরপুরের ভাষাসৈনিকদের মধ্যে এখন শুধু বেঁচে আছেন তিনি। হাতে অফুরান অবসর। অধিকাংশ সময় উদাস দৃষ্টি মেলেই কাটিয়ে দেন তিনি। খোঁজ-খবর নেওয়ার লোকজন কমে গেছে। একা চলাফেরাও করতে পারেন না । কানে কম শোনেন, স্মৃতিশক্তিও লোপ পেয়েছে। মোটের ওপর ভালো নেই ষাটের দশকের অগ্নিসময় পার করে আসা এ অকুতোভয় ভাষাসৈনিক। 

এখন শেরপুর পৌর শহরের মধ্যশেরীপাড়া এলাকার নিজ বাড়িতে স্ত্রী সৈয়দা সালেহা খাতুনকে সঙ্গে নিয়ে শেষ জীবন অতিবাহিত করছেন তিনি।

ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গে সৈয়দ আব্দুল হান্নান বলেন, ‘১৯৫২ সালে বগুড়ার আজিজুল হক কলেজ থেকে আইএসসি পাস করি। সে সময় একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে শেরপুরের বিভিন্ন ছাত্র সমাবেশে ভাষণ দিতাম। ভাষা আন্দোলনকে উদ্বুদ্ধ করতাম আমরা।

তিনি আরও বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনের অনুপ্রেরণা থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন বেগবান হয়েছে। এক কথায় বললে ভাষা আন্দোলন থেকেই স্বাধীনতা আন্দোলনের মাধ্যমে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে আমরা  পৃথিবীর বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পেরেছি।’

ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি প্রসঙ্গে এ ভাষাসৈনিক আরও বলেন, ‘১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় শিক্ষার্থীদের মিছিলে গুলির প্রতিবাদে শেরপুরেও ভাষা আন্দোলন দানা বাঁধে। অবশ্য বাংলা ভাষার দাবিতে ফেব্রুয়ারির ১৮ তারিখ থেকেই ছাত্রদের মিছিল, জনসমাবেশ ও ধর্মঘট চলতে থাকে জেলা শহরে। ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি শেরপুরে ‘সর্বদলীয় ভাষা আন্দোলন কমিটি’ গঠিত হয়। এ কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন আওয়ামী মুসলিম লীগের শেরপুর থানা শাখার সভাপতি নূর মোহাম্মদ উকিল। পরদিন ২৪ ফেব্রুয়ারি নয়আনিবাড়ি মাঠে এই কমিটির উদ্যোগে একটি প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার লোক উপস্থিত ছিলেন। এ ধরনের বেশ কয়েকটি প্রতিবাদ সভা শেরপুর পৌরসভার পার্শ্ববর্তী এলাকার হাটবাজারেও অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৫২ সালের মার্চে সারা দেশে যে হরতাল আহ্বান করা হয়, সেটিও শেরপুরসহ পার্শ্ববর্তী সব থানা ও ইউনিয়নে পালিত হয়।’

সে সময় আন্দোলনের নেতৃত্বে তরুণদের মধ্যে হাবিবুর রহমান, নিজামউদ্দিন আহমদ, আবুল কাশেম, আব্দুর রশীদ, আহসান উল্লাহ, সৈয়দ আবদুস সোবহানসহ সৈয়দ আব্দুল হান্নান নিজেও ছিলেন বলে জানান তিনি। তারা সে সময় ছাত্রদের সমবেত করে জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে উদ্বুদ্ধ করতেন বলেও তিনি জানিয়েছেন।

ভাষাসৈনিক সৈয়দ আব্দুল হান্নান

তরুণ আন্দোলনকারীদের প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন,‘আমাদের রাজনৈতিক পরামর্শ ও সহায়তা দিতেন যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও শেরপুর থানা যুবলীগের সভাপতি খন্দকার মজিবুর রহমান, আওয়ামী মুসলিম লীগের নূর মোহাম্মদ উকিল ও সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান। শেরপুরের  জি কে পি এম ইনস্টিটিউট, ভিক্টোরিয়া একাডেমি, শেরপুর মাদ্রাসা ও কায়দে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ গার্লস হাইস্কুলের ছাত্রছাত্রীরা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন। এছাড়াও আনোয়ারুল ইসলাম ডিম, খন্দকার নুরুল হক, মহসীন আলী,আহমেদ  সালেহ, অরুণ বক্সী, অমিত বক্সী, চিত্ত বক্সী,  সিরাজুল হক, শওকত জাহান লুদু মিয়া, আব্দুল হারুন, সাদেকুর রহমান, শফিউদ্দিন, নাসির উদ্দিন, সৈয়দ আলী, শামসুল হুদা, হিরা মিয়া, জাহানারা বেগম, টিপু সিং, মোহাম্মদ ইউসুফ ও কলিম উদ্দিন  ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন।’  

উল্লেখ্য, ভাষাসৈনিক শিক্ষাবিদ হিসেবে সৈয়দ আব্দুল হান্নান শেরপুরের পরিচিত মুখ। ১৯৩২ সালে ২৫ ডিসেম্বর শেরপুরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা সৈয়দ আব্দুল হালিম ও মা রাবেয়া খাতুন। তিন মেয়ে ও দুই ছেলের জনক তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ১৯৫৬ সালে ইসলামের ইতিহাস  ও সংস্কৃতি বিভাগে এমএ এবং ১৯৬৪ সালে আইন বিষয়ে এলএলবি পাস করেন। ১৯৬৪ সালের ১৬ জুলাই তিনি শেরপুর কলেজে অধ্যক্ষ  হিসেবে যোগ দেন এবং ১৯৯৯ সালের ৩০ জানুয়ারি ওই কলেজ থেকেই অবসর নেন। 

১৯৫২ সালে বগুড়ার আজিজুল হক কলেজে পড়ার সময় তিনি একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে ভাষা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। সে সময় শেরপুরে সকল কর্মকাণ্ডের নেতৃত্বে যে কয়েকজন তরুণ ছিলেন তাদের অন্যতম তিনি। তার বড় ভাই ছাত্রনেতা সৈয়দ আব্দুস সোবহান ভাষা আন্দোলনে অংশ নেওয়ায় শেরপুর থেকে গ্রেফতার হন। ভাষা আন্দোলন ছাড়াও তিনি ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানি হানাদার ও তাদের দেশীয় দোসরদের হাতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হন। ২০০৫ সালে ভাষা-সংগ্রামী হিসেবে তিনি রাষ্ট্রীয় সম্মানে ভূষিত হন।

 

/এএইচ/এমওএফ/

লাইভ

টপ