এক বাসেই সব!

Send
হুমায়ুন মাসুদ, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত : ১১:৪১, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪০, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৮

শ্যামলী পরিবহনের এই বাসেই ছিল আটক ৫৬ শিক্ষার্থীচট্টগ্রাম আইডিয়াল স্কুলের পটিয়া শাখার এসএসসি পরীক্ষার্থীদের আনা-নেওয়ার জন্য শ্যামলী পরিবহনের একটি বাস ভাড়া করেছিল স্কুল কর্তৃপক্ষ। পরীক্ষার্থীদের তত্ত্বাবধানের জন্য বাসে একজন শিক্ষক থাকতেন। এভাবেই ৮টি পরীক্ষা দিয়েছে তারা। মঙ্গলবারও ৫৬ শিক্ষার্থীকে নিয়ে বাসটি চট্টগ্রামের পরীক্ষাকেন্দ্রে যাচ্ছিল। এ সময় প্রশাসন বাসে অভিযান চালিয়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রসহ ৫৬ শিক্ষার্থী ও একজন শিক্ষককে আটক করে। পরে কঠোর নজরদারিতে তাদের পরীক্ষা দিতে দেওয়া হয়। পরীক্ষা শেষে যাচাই-বাছাই করে ৩২ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আর ২৪ জনকে বহিষ্কার করা হয়। এর মধ্যে ৯ জনকে আটক করা হয়েছে। কারণ, তাদের মোবাইল ফোনে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র পাওয়া যায়। একই ঘটনায় ওই স্কুলের শিক্ষক কহিনুর আক্তারকেও আটক করা হয়। তিনি ওই বাসে করে পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে নিয়ে আসেন।

আটক এক পরীক্ষার্থী জানায়, ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে পরীক্ষা শুরুর এক ঘণ্টা আগে সে প্রশ্নপত্র পায়। অর্থাৎ বাসে থাকা অবস্থায় সে প্রশ্ন পায়। পরে ওই প্রশ্ন সে তার আরও ৭ সহপাঠীকে দেয়। তারা সবাই মিলে প্রশ্নের উত্তর বের করছিল।

ফেসগ্রুপের বার্তাসে বলে, “এসএসসি এইচএসসি ইউনিভারসিটি অল এক্সাম আউট কোয়েশ্চন অ্যান্ড রেজাল্ট চেঞ্জ ইনফরমেশন বিডি’ নামে ম্যাসেঞ্জার গ্রুপের কাছে সে প্রশ্ন চায়। পরে ওই পেজের অ্যাডমিন তাকে জানায়, ‘আমরা সব বোর্ডের প্রশ্ন দিয়ে থাকি। একশ ভাগ কমন আসবে, আপনি যদি মেইন প্রশ্ন পেতে চান। আর তাছাড়া আমরা সব বোর্ডের রেজাল্ট চেঞ্জ করে থাকি। যেকোনও সমস্যার জন্য call me: ০১৭৩০২৩১৯৯৬।”

ওই পরীক্ষার্থী আরও জানায়, ‘‘পরে ‘অল কোয়েশ্চন আউট বিডি’ নামে একটি ম্যাসেঞ্জার গ্রুপের মাধ্যমে পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নপত্র পাই। ওই গ্রুপে প্রশ্নপত্র চাইলে অ্যাডমিন আমার কাছে টাকা দাবি করে। পরে তার কথা মতো ৬০০ টাকা বিকাশ করলে পরীক্ষার এক ঘণ্টা আগে ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে আমাকে প্রশ্নপত্র পাঠায়। আহমেদ সাইয়েম নামে একটি ম্যাসেঞ্জার আইডি থেকে আমাকে প্রশ্নপত্র পাঠানো হয়। প্রশ্নপত্রটি পেয়ে আমি আমার কয়েকজন বন্ধুকে হোয়াটসঅ্যাপে দেই। পরে বন্ধুরা মিলে বাসে বসে ওই প্রশ্নপত্র সমাধান করছিলাম।’

বার্তা

ওই পরীক্ষার্থী জানায়, ‘সিটিজি সেল বাজার, সিএনএনডি, আইডিয়াল স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার্থী গ্রুপসহ বেশ কয়েকটি গ্রুপে প্রশ্নপত্র পাওয়া যাচ্ছে শুনে আমরা প্রশ্নপত্র পাওয়া যায় এরকম একাধিক গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করি। সেখান থেকেই আমরা প্রশ্নপত্র পেয়েছি।’

সে জানায়, এই রকম আরেক পেজের অ্যাডমিনের কাছে পদার্থবিজ্ঞানের প্রশ্নপত্র চাইলে তিনি লিখেন, ‘আমার কাছ থেকে প্রশ্ন নিলে ১০০০ টাকা।  ৫০০ টাকা আগে, তারপর গ্রুপে অ্যাড দেবো। পরীক্ষার পর বাকি ৫০০। কেউ রিকুয়েস্ট করলে লাভ নাই। হাই হ্যালো বলার টাইম নাই।’

প্রসঙ্গত, মঙ্গলবার সকাল ৮টার দিকে শিক্ষার্থীদের নিয়ে পটিয়া থেকে শ্যামলী পরিবহনের বাসটি ছেড়ে আসে। সকাল সোয়া ৯টার দিকে নগরীর জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদের সামনে বাসটি থামিয়ে অভিযান চালিয়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের সন্ধান পায় প্রশাসন। এরপর বাসে থাকা ৫৬ পরীক্ষার্থীকে নজরদারিতে নেয় পুলিশ। পরে পরীক্ষা শেষে যাচাই-বাছাই করে ৩২ জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়। আর ২৪ জনকে বহিষ্কার করা হয়। এর মধ্য থেকে ৯ শিক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশ।

এ সম্পর্কে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মোরাদ আলী বলেন, ‘আমাদের কাছে গোপন সংবাদ ছিল আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষার্থীরা প্রশ্নপত্র পেয়েছে। ওই তথ্যের ভিত্তিতে আমরা বুধবার সকালে পটিয়া থেকে শিক্ষার্থীদের বহন করা বাসটি জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদের সামনে আসলে অভিযান চালাই। এ সময় ৭ শিক্ষার্থীর মোবাইল ফোনে আমরা প্রশ্নপত্র পাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা জানিয়েছে তারা ম্যাসেঞ্জারে প্রশ্নপত্র পেয়েছে। একটি ফেসবুক পেজে যোগাযোগ করে তারা প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে।’

পরীক্ষা শেষে দুপুর ৩টার দিকে ওই বাসে থাকা ৫৬ শিক্ষার্থীর মধ্যে বিজ্ঞান শাখার ২৪ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন জেলা প্রশাসক জিল্লুর রহমান চৌধুরী।

কথপোকথন

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের কাছে আগেই তথ্য ছিল আইডিয়াল স্কুলের পটিয়া শাখার এসএসসি পরীক্ষার্থীরা এ ধরনের একটি অপরাধের সঙ্গে জড়িত হতে যাচ্ছে। যাছাই-বাছাই করে নিশ্চিত হওয়ার পর আমরা অভিযান পরিচালনা করেছি। অভিযানে ৭ পরীক্ষার্থীর মোবাইলে প্রশ্নপত্র পাওয়া গেছে। আরও দুজন প্রশ্নপত্র পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে। তাদের ৯ জনকে আটকের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের নামে আইসিটি আইনে মামলা দায়ের করা হবে।’

এ ঘটনায় বাসে থাকা বিজ্ঞান বিভাগের আটক এই ৯ পরীক্ষার্থীসহ মোট ২৪ জনকে বহিষ্কার করে শিক্ষাবোর্ড কর্তৃপক্ষ। পরীক্ষা শেষে দুপুর ৩টার দিকে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের সচিব শওকত আলম ২৪ পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেন।

তিনি বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস ও অসদুপায় অবলম্বন করায় ২৪ জন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ’

তবে প্রশাসনের এ সিদ্ধান্তে অসন্তুষ্ট অভিভাবকরা। আটক এক নারী পরীক্ষার্থীর বড় ভাই মিজানুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার বোনের কোনও ট্যাব নেই। কিন্তু নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জানিয়েছেন তার কাছে ট্যাব পেয়েছেন। বিষয়টি আমার কাছে রহস্যজনক মনে হয়েছে।’

তার অভিযোগ, ‘যারা প্রশ্নফাঁস করছেন প্রশাসন তাদের কিছুই করতে পারছে না। যারা ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করেছে তাদের বিচার করছে। আমি স্বীকার করি, প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে পরীক্ষার্থীরা অপরাধ করেছে। কিন্তু তাদের চেয়ে বেশি অপরাধী যারা এই প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছে। আমরা প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের বিচার চাই।’

আটক আরেক নারী পরীক্ষার্থীর বাবা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পরীক্ষার আগের দিন আমার মেয়ে অনেক পড়াশুনা করেছে। তার কাছে কোনও মোবাইল ফোন নেই। কিন্তু ওই বাসে ছিল বলে তাকেও আটক করা হয়।’

 

/এআর/এসটি/এমওএফ/

লাইভ

টপ