তরুণ প্রজন্মকে সম্পদে পরিণত করতে চান কুড়িগ্রামের প্রথম নারী জেলা প্রশাসক

আরিফুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম
০৮ মার্চ ২০১৮, ১৪:৪৭আপডেট : ০৮ মার্চ ২০১৮, ১৫:৫১

কুড়িগ্রামের প্রথম নারী জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন তরুণ প্রজন্মকে সম্পদে পরিণত করতে চান কুড়িগ্রামের প্রথম নারী জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন। বাংলা ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। জেলার প্রথম নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে কুড়িগ্রাম জেলার আর্থসামাজিক উন্নয়ন, জেলার নারীদের ক্ষমতায়ন, প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে তার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। একান্ত সাক্ষাৎকারে নবাগত এ জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন জেলার নারীদের নিয়ে তার ভাবনার কথা, কুড়িগ্রাম জেলার উন্নয়ন নিয়ে পরিকল্পনার কথা।

প্রসঙ্গত, গত ৩ মার্চ কুড়িগ্রামের প্রথম নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদান করেছেন সুলতানা পারভীন। তিনি শুধু কুড়িগ্রামের প্রথম নারী জেলা প্রশাসক নন, রংপুর বিভাগের প্রথম নারী জেলা প্রশাসক।

কুড়িগ্রামের উন্নয়নে কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেবেন জানতে চাইলে নবাগত এ জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমি নতুন যোগদান করেছি। নর্থবেঙ্গলেই আমার বাড়ি। এ এলাকা সম্পর্কে আমার পরিষ্কার ধারণা রয়েছে। উত্তরবঙ্গ বিশেষ করে রংপুর বিভাগের চিত্র অনেকটা একই রকম। সেক্ষেত্রে কুড়িগ্রাম সম্পর্কে যে ধারণা রয়েছে, এর বাইরেও আমার যে পরিকল্পনা আছে তাতে আমি মনে করি আমাদের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। আর এক্ষেত্রে আমি এলাকার মানবসম্পদ উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে চাই, সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করতে চাই। আমি মনে করি দেশের ইয়াং জেনারেশনের সংখ্যার দিক দিয়ে এখন আমাদের স্বর্ণযুগ চলছে। জনসংখ্যার একটা বড় অংশ এই ইয়াং জেনারেশন। এই ইয়াং জেনারেশনকে আমরা যদি প্রোপার গাইড করতে পারি তাহলে তারা সম্পদে পরিণত হবে। আমি এই দিকটাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করতে চাই।’

নারী ও শিশু ধর্ষণ প্রতিরোধে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কার্যকর প্রয়োগের বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এটা (ধর্ষণ) খুবই ঘৃণ্য একটি কাজ। ধর্ষকদের যাতে সর্বোচ্চ শাস্তির আওতায় আনা যায় আমি সে বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে দেখবো। আর এ ধরনের ঘটনা যেন না ঘটে সেদিকে আমাদের আরও গুরুত্ব দিতে হবে। সেজন্য আমরা সবাই মিলে কাজ করবো।’

চরাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা বিশেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরকারিভাবে নিয়োগকৃত শিক্ষকদের পরিবর্তে স্থানীয় অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন যুবকদের বদলি (প্রক্সি) শিক্ষক হিসেবে কাজ করানো বন্ধে নজরদারি থাকবে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এটা কেন হবে? যিনি শিক্ষক,তাকেই ক্লাস নিতে হবে। ‘প্রক্সি শিক্ষক’ বিষয়টি আমাদের জাদুঘরে পাঠাতে হবে। এরকম ঘটনা ঘটে থাকলে আমি সেটা খুব স্ট্রিকলি দেখবো।’

তিনি বলেন, ‘কুড়িগ্রাম নদীবহুল এলাকা, এখানে অনেক চর আছে, সে অনুযায়ী চরাঞ্চলে অনেক বিদ্যালয়ও আছে। বিশাল একটি এলাকার শিক্ষার্থীরা যদি এভাবে অবহেলিত হয় সেটা অবশ্যই আমাদের দেখতে হবে। আমি বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখবো।’

চরাঞ্চলে বিশেষ করে দ্বীপচরে কৃষির সম্ভাবনা নিয়ে আপনার প্রশাসনের কী পদক্ষেপ থাকবে? জবাবে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এ এলাকায় তেমন কোনও ইন্ডাস্ট্রি নেই, মানুষের আর্থসামাজিক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য আমরা হয়তো খুব বেশি কিছু করতে পারবো না। আমরা হয়তো সফটওয়্যার দিতে পারবো এবং আমি এটা অবশ্যই করবো।’

তিনি বলেন, ‘কৃষি নিয়ে আমার অনেক ভাবনা রয়েছে। এটা কৃষি-প্রধান এলাকা, এর মূল ভিত্তিটাই কৃষি। কৃষির সম্ভাবনা নিয়ে কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলবো। আমি শুনেছি এ জেলার মিষ্টিকুমড়া বিদেশে রফতানি হয়। এ ধরনের বিষয় থাকলে আমরা তাদের বিশেষ সাপোর্ট দেবো। নদীবহুল এলাকা হওয়ায় বন্যার পরই এখানে অনেক পলি পড়ে। সেখানে যে কৃষকরা আছেন তাদের সম্পর্কে জেনে আমি কৃষির সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করবো।’

কুড়িগ্রাম জেলায় বন্যা মোকাবিলায় প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপের বিষয়ে নবাগত এ জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমি চেষ্টা করবো অল্প সময়ের মধ্যে সব উপজেলা পরিদর্শন করতে। তাতে এসব এলাকার জিওগ্রাফিক্যাল বিষয়গুলো ভালো করে বুঝতে পারবো। আর তখন প্রাকৃতিক দুর্যোগে কী ব্যবস্থা নিতে পারি সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবো।’

জেলার প্রথম নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে বিশেষভাবে কাজ করার বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘দেখুন জেলা প্রশাসক জেলা প্রশাসকই। নারী হওয়ার কারণে আপনাদের আলাদা কোনও বিশেষ প্রত্যাশা থাকতে পারে। কিন্তু আমি মনে করি, শুধু নারী হওয়ার কারণে নয়, এটি আমার (নারীর ক্ষমতায়ন) একটি দায়িত্বও বটে। আমাদের জনসংখ্যার যে অনুপাত তাতে নারী-পুরুষ প্রায় ফিফটি ফিফটি। সবার প্রতি আমাদের সমানভাবে মনোযোগ দিতে হবে। আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো নারীদের কল্যাণের জন্য। এ এলাকার যে বৈশিষ্ট্য সে অনুযায়ী আমি চাইবো এ এলাকার মেয়েরা যেন দেখেও অনুপ্রাণিত হয়। আমি, আমার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, রাজস্ব (তিনিও নারী) এবং অন্য সহকর্মী যারা আছেন তাদের নিয়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে চাই। আমি তাদের দেখাতে চাই যে তোমরাও চাইলে পারো, এটা আলাদা কোনও বিষয় নয়। নারী হওয়ার কারণে তাদের আলাদা কিছু লাগবে বিষয়টা সেরকম নয়। বরং একজন মানুষ হওয়ার কারণে একটি ছেলের যেরকম অধিকার রয়েছে, একটি মেয়েরও একই অধিকার রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এখন বাবা-মা’য়ের তাদের সন্তানদের প্রতি মনোযোগ অনেক বেশি। এক্ষেত্রে আমরা যদি আইডল  হিসেবে তাদের কাছে যেতে পারি তাহলে হয়তো সাপোর্ট আরও বেশি হবে।’

উল্লেখ্য, সুলতানা পারভীনের পৈতৃক নিবাস পঞ্চগড় জেলার সদর উপজেলায়। তার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা। সুলতানা পারভীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ২০তম বিসিএস পরীক্ষায় প্রশাসন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়ে ২০০১ সালে সহকারী কমিশনার হিসেবে লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে যোগদান করেন। কর্মজীবনে তিনি ঠাকুরগাঁও সদর, বগুড়া সদর এবং রংপুরের কাউনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সর্বশেষ তিনি লালমনিরহাট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার শাখার উপ-পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। ব্যক্তিজীবনে তিনি দুই সন্তানের জননী। তার দুই মেয়ে জয়পুরহাট মহিলা ক্যাডেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী। সুলতানা পারভীনের স্বামী একজন সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

/বিএল/এমওএফ/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
আফগানিস্তানের সঙ্গে ড্র করলো বাংলাদেশ 
আফগানিস্তানের সঙ্গে ড্র করলো বাংলাদেশ 
বিশ্বের সেরা ১০০ উপন্যাস : বাছাই ও বির্তক
বিশ্বের সেরা ১০০ উপন্যাস : বাছাই ও বির্তক
ঢাকায় পৌঁছেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান 
ঢাকায় পৌঁছেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান 
পুলিশের নজরবন্দি আইভী
পুলিশের নজরবন্দি আইভী
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি